মনোবল ও পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতায় ক্যান্সার জয় করেছেন রাবেয়া

এক দশক ধরে স্তন ক্যান্সারের সঙ্গে লড়ছেন বগুড়ার ফুলবাড়ীর মধ্যপাড়ার বাসিন্দা রাবেয়া বেগম। ১০ বছর আগে রাজব্যাধির সঙ্গে তার মোকাবেলার শুরু। দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর এখন তিনি সুস্থ, শরীরে নেই কোনো ক্যান্সারের অস্তিত্ব।
সেদিন কেউ বুঝে উঠতে পারেনি যে স্তনের ছোট্ট একটি সিস্ট ভবিষ্যতে ক্যান্সারে রূপ নেবে। রাবেয়া বেগম বলেন, ‘২০১৫ সালের কথা। আমার ডান স্তনে ছোট একটি সিস্টের মতো টের পাচ্ছিলাম। সেই সঙ্গে ছিল প্রচণ্ড ব্যথা, জ্বর। মাঝে মাঝে হাতও ফুলে যেত। লক্ষণগুলোকে তখন সাধারণ কিছুই মনে করেছিলাম। সিরিয়াস কিছু হবে ভাবিনি। এরপর চিকিৎসকের কাছে যাই। তিনি বলেন, সিস্টের আকার ছোট, অপারেশন লাগবে না। ওষুধেই ঠিক হয়ে যাবে। তবে নিয়মিত চেকআপ করাতে হবে।’
এরপর থেকে রাবেয়া নিয়মিত চিকিৎসকের কাছে চেকআপ করাতে যেতেন। কিন্তু করোনাকালে দেখা দেয় বিপত্তি। সেই সময়ের পরিস্থিতি বর্ণনা করে তিনি বলেন, ২০২০-এ করোনা শুরু হলে সেসময় চিকিৎসকরা অত গুরুত্ব সহকারে দেখতেন না। দূর থেকে দেখতেন। মূলত সেই সময়ে আমার এ সিস্ট ক্যান্সারে রূপান্তরিত হয়।’
রাবেয়ার ক্যান্সার শনাক্ত হয় ২০২২ সালে। এ খবরে ভেঙে পড়ে তার পরিবার। তিনি বলেন, ‘হুট করে যখন শারীরিক অসুবিধাগুলো বাড়তে থাকল তখন আবার চিকিৎসকের কাছে গেলাম। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানোর পর জানা গেল আমি স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত। এমন খবরের জন্য আমরা কেউ প্রস্তুত ছিলাম না। নিয়মিত চিকিৎসকের কাছে গিয়েছি, ওষুধ খেয়েছি এবং অন্য সব নিয়ম-কানুন পালন করেছি। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি। সবাই বেশ ভেঙে পড়ি।’
রাবেয়া বেগম প্রথমে ঢাকায় এলেও পরবর্তী সময়ে বগুড়ায় চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বলেন, ‘প্রথমে আমার ছেলে-মেয়েরা বলেছিল ঢাকায় চিকিৎসা করাতে। আমাকে নিয়েও যায় ঢাকায়। কিন্তু আমার মন টিকছিল না। কারণ ঢাকায় আমার কাছের কেউ নেই। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম যা হবে বগুড়াতেই। এরপর আমার পুরো চিকিৎসা এখানেই হয়েছে।’
ক্যান্সার ধরা পড়ার পর প্রথমে তার সার্জারি হয়। এরপর একে একে চলে কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি ও হরমোন থেরাপি। কিন্তু কিছুদিন সুস্থ থাকার পর আবার দেখা দেয় নতুন বিপদ। রাবেয়া বলেন, ‘ক্যান্সার আমার হাড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ডাক্তাররা জানান, ‘এটা এখন ফোর্থ স্টেজ।’ এ সংবাদ ছিল পরিবারের জন্য বজ্রাঘাতের মতো। একে তো শারীরিক কষ্ট, তার সঙ্গে বিপুল খরচ—প্রায় ৩০ লাখ টাকা ততদিনে চিকিৎসায় ব্যয় হয়ে গেছে। চিকিৎসার খরচ চালাতে বড় মেয়ে নিজের স্বর্ণের গহনাও বিক্রি করে দিয়েছে। পরিবারের সবাই যে যেভাবে পারে সাহায্য করেছে।’
যদিও এখনো ওষুধ খেতে হয় তবুও আগের তুলনায় অনেকটাই সুস্থ বোধ করছেন বলে জানালেন রাবেয়া। তিনি বলেন, ‘আমাকে দেখলে কেউ বিশ্বাসই করবে না যে আমি ফোর্থ স্টেজ ক্যান্সার পেশেন্ট। মনোবলটাই আমার সবচেয়ে বড় শক্তি। আমি শুধু চিকিৎসকের দেয়া ওষুধই খাইনি। সঙ্গে কী খেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে—সেসব বিষয়ে স্টাডি করেছি। পাঁচ মাস নিয়মিত চিকিৎসা ও হারবাল থেরাপি চলার পর এক সপ্তাহ আগে করা স্ক্যানে দেখা গেল—শরীরে কোনো ক্যান্সার নেই। এটি আসলে বিস্ময়ের। কারণ ক্যান্সারের ফোর্থ স্টেজ থেকে ফিরে আসা কঠিন। কিন্তু মনোবল ও পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতায় আমি ক্যান্সার জয় করেছি।’



