বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবুধবার, ২০ মে, ২০২৬
নারী

চা–শ্রমজীবী নারীদের অধিকার আদায়ে লড়ছেন গীতা রানী কানু

WhatsApp Image 2025-10-19 at 8.25.39 AM

দেশের চা–বাগানের শ্রমজীবী কর্মীদের বেশিরভাগই নারী। তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমেই এগিয়ে চলছে দেশের চা শিল্প। কিন্তু এই শিল্পে মূল চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করেও অধিকাংশ নারী শ্রমিক রয়ে গেছেন বঞ্চিত। অন্যরা চা শিল্পের সুযোগ–সুবিধা ও ব্যবসা থেকে লাভবান হলেও, শ্রমজীবী নারীরা রয়ে গেছে প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত।

এই নারীদের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের কুরমা চা–বাগানের বাসিন্দা গীতা রানী কানু। তিনি নিজেও চা জনগোষ্ঠীর একজন সদস্য। তেতাল্লিশ বছর বয়সী গীতা আজও বিয়ে করেননি—কারণ, তিনি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে উৎসর্গ করেছেন সমাজসেবা ও চা–শ্রমিক নারীদের অধিকার রক্ষার আন্দোলনে।

গীতা কখনো অসুস্থ-দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, কখনো অভাবী পরিবারের জন্য খাবার জুগিয়েছেন। আবার কখনো চা–শ্রমিক নারীদের ন্যায্য মজুরি ও অধিকার আদায়ে রাস্তায় নেমেছেন। তার নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে ‘বাংলাদেশ চা–শ্রমিক নারী ফোরাম’, যেখানে যুক্ত আছেন পাঁচ হাজারেরও বেশি নারী শ্রমিক।

গীতা রানী বলেন, “শৈশবে দেখেছি আমার বাবা কীভাবে মানবসেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। তিনি কোম্পানির রেশন ডিলার ছিলেন, আর গোপনে সেই খাদ্য অনাহারী মানুষদের মধ্যে বিলিয়ে দিতেন। বাবার সেই ত্যাগ আর মায়ের রাজনৈতিক চেতনা আমাকে আজকের গীতা করে তুলেছে।”

তিনি জানান, কিশোরী বয়স থেকে প্রায় ১৭ বছর দোকানদারির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেই সময় থেকেই মানুষের অভাব ও কষ্ট বুঝতে শেখেন। পরে অনাহারীদের ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছে দেওয়া ও অসুস্থদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতেন।

গীতার ভাষায়, “যখন দেখলাম চা–শ্রমিক নারীরা এত পরিশ্রম করেও ন্যায্য মজুরি পাচ্ছে না, তখন এলাকার মানুষের সঙ্গে পরামর্শ করে সংগঠন গঠন করি। ‘বাংলাদেশ চা–শ্রমিক নারী ফোরাম’ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আমরা নারীদের প্রশিক্ষণ, অধিকার সচেতনতা ও স্বনির্ভর কর্মসংস্থানের ওপর কাজ করছি।”

তিনি আরও জানান, “২০১৪ সালে আমি উপজেলা ভাইস–চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করে ৪১ হাজার ভোট পেয়েছিলাম, কিন্তু ষড়যন্ত্রে পরাজিত হই। ২০২৪ সালেও আবার নির্বাচন করেছি, কিন্তু সেখানেও একই অভিজ্ঞতা হয়েছে।”

এর আগেই, ২০০৭–২০০৮ সালে তিনি চা–শ্রমিক নারীদের নিয়ে “থালা–বাসনের হরতাল” ডাকেন, যার ফলে সরকারিভাবে প্রায় ৭০–৮০ কেজি চাল বরাদ্দ হয়েছিল। এই আন্দোলনের পর থেকে প্রতিকূলতা শুরু হয়—অনেকে বলেন “নারী নেতৃত্ব মানি না।” তবুও দমে যাননি গীতা।

২০১৮ সালে তিনি দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো চা–শ্রমিক সম্প্রদায়ের নির্বাচনে অংশ নেন এবং বাংলাদেশ চা–শ্রমিক সংগঠনের সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন।

গীতা রানী এখনো আশাবাদী, “আমি চাই, চা–শ্রমিক নারীরা যেন নিজেদের অধিকার বুঝতে শেখে, নিজের পায়ে দাঁড়ায়। ভবিষ্যতে আমি নারীদের নিয়ে তাঁতশিল্পভিত্তিক কর্মসংস্থান গড়ে তুলতে চাই।”

শেষে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “চা শিল্পের নাম ভাঙিয়ে বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান অর্থ কামাচ্ছে, রেমিট্যান্স আসছে। অথচ এই শিল্পের মূল রক্ত–ঘাম ঝরানো শ্রমিকরা কিছুই পাচ্ছে না। আমরা কি আজীবন শূন্য হাতে থাকব? তাই আবারও নির্বাচনে অংশ নেব, শুধু ওদের জন্য—চা–শ্রমিক নারীদের জন্য।”