মা হওয়ার পথে দুর্বিষহ যাত্রা—হাইপারইমেসিস গ্রাভিডারাম

গর্ভধারণের শুরুর দিকে হালকা বমিভাব বা খাবারে অরুচি একটি স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে কিছু নারীর ক্ষেত্রে এই বমিভাব শুধুমাত্র ‘সকালবেলার বমি’ নয়—এটি রূপ নেয় এক জটিল ও দুর্বল করে দেওয়া রোগে, যার নাম হাইপারইমেসিস গ্রাভিডারাম (Hyperemesis Gravidarum বা HG)।
এই রোগে আক্রান্ত নারীদের প্রায় সারাদিনই প্রবল বমি বা বমিভাব হয়। এতটাই তীব্র হয় এই সমস্যা যে তারা কখনোই স্বাভাবিক খাবার বা পানি শরীরে রাখতে পারেন না। ফলে দ্রুত দেখা দেয় পানিশূন্যতা, শরীরের ওজন কমে যায়, পুষ্টিহীনতা তৈরি হয় এবং গর্ভবতী নারী শারীরিকভাবে চরম দুর্বল হয়ে পড়েন।
মনিং সিকনেস নয়, এটি ভয়াবহ শারীরিক অসুস্থতা
অনেকেই হাইপারইমেসিস গ্রাভিডারামকে ভুল করে মনে করেন এটি গর্ভাবস্থার সাধারণ বমিভাব বা ‘মনিং সিকনেস’। কিন্তু এটি একটি গুরুতর মেডিকেল কন্ডিশন। দিনের মধ্যে যদি ৮–১০ বার বা তার বেশি বমি হয়, কিংবা খাবার ও তরল কিছুই শরীরে না থাকে, তবে এটি সহজেই মনিং সিকনেসের সীমা ছাড়িয়ে যায়।
কোন সময় দেখা দেয়, কতটা বিস্তার?
বিশ্বজুড়ে প্রতি ১০০ জন গর্ভবতী নারীর মধ্যে ১ থেকে ৩ জন এই রোগে আক্রান্ত হন। সাধারণত গর্ভাবস্থার ৫ থেকে ১২ সপ্তাহের মধ্যে এই সমস্যা দেখা দেয়, তবে কারও কারও ক্ষেত্রে এটি আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়।
কেন হয় এইচজি?
এই রোগের পেছনে নির্দিষ্ট কোনো একক কারণ নেই, তবে বেশ কয়েকটি কারণ একত্রে কাজ করতে পারে:
- হরমোনের পরিবর্তন: গর্ভাবস্থায় হিউম্যান কোরিওনিক গোনাডোট্রপিন (hCG) ও ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় এটি হতে পারে।
- বংশগত ঝুঁকি: পরিবারের কোনো সদস্য আগে এইচজি-তে আক্রান্ত হয়ে থাকলে ঝুঁকি বাড়ে।
- ঘ্রাণ সংবেদনশীলতা ও মানসিক চাপ: কিছু নারীর ক্ষেত্রে গন্ধ বা মানসিক চাপও এই সমস্যা ট্রিগার করতে পারে।
একবার যিনি এই রোগে আক্রান্ত হয়েছেন, পরবর্তী গর্ভধারণেও তার একই সমস্যায় পড়ার সম্ভাবনা ২০–২৫%।
সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও ভুল ধারণা
এইচজি নিয়ে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এটি নিয়ে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি। পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন এমনকি অনেক চিকিৎসকও এটিকে গুরুত্ব না দিয়ে বলেন, ‘সব মায়েরই এমন হয়’, ‘মা হতে গেলে একটু কষ্ট পেতেই হয়’।
এই ধারণা শুধু মানসিক আঘাতই বাড়ায় না, বরং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণেও বিলম্ব ঘটায়। এতে করে মা ও গর্ভস্থ শিশুর উভয়ের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়। এই অবহেলার পরিবেশই তৈরি করে ‘সহ্য করার সংস্কৃতি’, যেখানে নারীর যন্ত্রণা মূল্যায়নের বদলে তাকে নীরবে সহ্য করতে শেখানো হয়।
চিকিৎসা কীভাবে হয়?
হাইপারইমেসিস গ্রাভিডারামের চিকিৎসা নির্ভর করে রোগের তীব্রতা ও শারীরিক অবস্থার উপর। সাধারণত চিকিৎসার ধাপগুলো এমন:
- হাসপাতালে ভর্তি ও স্যালাইন: রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করে প্রথমে স্যালাইন দিয়ে পানিশূন্যতা দূর করা হয়।
- ওষুধ প্রয়োগ: বমি কমানোর জন্য নির্দিষ্ট ওষুধ দেওয়া হয়।
- পুষ্টি সরবরাহ: প্রয়োজন হলে খাবার খাওয়ার বদলে নল (nasogastric tube) দিয়ে পুষ্টি সরবরাহ করা হয়।
- মানসিক সহায়তা: অবসাদ বা উদ্বেগ থাকলে কাউন্সেলিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চিকিৎসকরা বলেন, এ সময় পরিবারের মানসিক সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগী যদি বোঝেন যে তার কষ্টটিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, তবে তার সুস্থতার পথ অনেকটাই সহজ হয়।
অতীতের ভুল ধারণা থেকে বর্তমানের সচেতনতা
১৯ শতকে হাইপারইমেসিস গ্রাভিডারাম নিয়ে চিকিৎসকদের অনেক ভুল ধারণা ছিল। একসময় এর চিকিৎসায় মরফিন, পারদ এমনকি ইলেকট্রিক শকও ব্যবহার করা হতো। অনেকে এটিকে নারীদের ‘হিস্টেরিয়া’ বা মানসিক দুর্বলতা বলে মনে করতেন।
এই অবস্থার বিষয়ে বিশ্বজুড়ে সচেতনতা বাড়ে ২০১২ সালে, যখন ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য ডাচেস অব কেমব্রিজ কেট মিডলটন (প্রিন্স উইলিয়ামের স্ত্রী) এই রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। তখন বিষয়টি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আসে এবং এইচজি নিয়ে আলোচনার সূচনা হয়।
মায়েদের অভিজ্ঞতা ও সমাজের দায়
এই রোগে আক্রান্ত নারীরা বলেন, এটি এমন এক অভিজ্ঞতা, যেখানে শরীর নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। সন্তান জন্মের স্বপ্নের মাঝে থাকে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক ভয়ানক লড়াই। তবে সন্তান জন্মের পর সবাই নবজাতকের খোঁজ নেয়, অথচ মা কী ভয়াবহ কষ্ট সহ্য করেছেন, তা অদেখাই থেকে যায়।
চিকিৎসক ও সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, হাইপারইমেসিস গ্রাভিডারাম আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মাতৃত্বকে যতটা সম্মান দেওয়া হয়, ততটা গুরুত্ব মায়ের শারীরিক ও মানসিক কষ্টকেও দেওয়া উচিত।



