ঐতিহ্য সংরক্ষণে আজীবন সোচ্চার ছিলেন ডায়ান কিটন

ডায়ান কিটন মারা গেলেন শনিবার। সিনেমায় অভিনয়ের জন্যই তিনি বিখ্যাত। কিন্তু এর বাইরেও কিটন করেছেন সেবামূলক কাজ।
শনিবার মারা গেলেন কিংবদন্তি অভিনেত্রী ডায়ান কিটন। সিনেমায় অসাধারণ অভিনয়ের জন্য তিনি যেমন পরিচিত ছিলেন, তেমনি মানবসেবা ও ঐতিহ্য সংরক্ষণেও রেখেছেন বিশেষ অবদান।
‘অ্যানি হল’, ‘দ্য গডফাদার’, ‘ফাদার অব দ্য ব্রাইড’-এর মতো চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু রুপালি পর্দার বাইরেও কিটন ছিলেন একজন সক্রিয় সংরক্ষণবাদী। বিশেষ করে লস অ্যাঞ্জেলেসের ঐতিহাসিক স্থাপত্য সংরক্ষণে তিনি ছিলেন দৃঢ় কণ্ঠস্বর।
শহরের পুরোনো ভবন, ঐতিহ্যবাহী ঘরবাড়ি ও সংস্কৃতির নিদর্শন রক্ষায় কিটনের ভালোবাসা ছিল গভীর। প্রায় দুই দশক ধরে তিনি এলএ কনজারভেন্সি নামের সংগঠনের বোর্ড সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন। সংস্থার নানা প্রচারণায় অংশ নিয়ে তিনি লস অ্যাঞ্জেলেসের স্থাপত্য ঐতিহ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
রুপালি পর্দায় যেমন ছিলেন উজ্জ্বল, তেমনি শহরের ইতিহাস ও সৌন্দর্য রক্ষায়ও তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক প্রেরণাদায়ী মুখ—ডায়ান কিটন, যিনি বিশ্বাস করতেন, “একটি শহরের আত্মা বেঁচে থাকে তার পুরোনো স্থাপত্যে।”
কনজারভেন্সির সাবেক প্রেসিডেন্ট লিন্ডা ডিশম্যান বলেন, ‘তাকে যত জানতাম, ততই বুঝতে পারতাম আবেগটা কোথা থেকে এসেছে। এটা অনেকটাই এসেছে তার পরিবার থেকে এবং লস অ্যাঞ্জেলেসে বেড়ে ওঠা থেকে। শহরের ইতিহাস আর স্থানের সঙ্গে একটা গভীর সংযোগ ছিল তার। তিনি কেবল ভবন নয়, ঐতিহাসিক ল্যান্ডস্কেপগুলো এবং মানুষের জীবনে এর অর্থও বোঝাতে পারতেন।’
ডায়ান কিটনের এ যাত্রা শুরু হয় ঐতিহাসিক বাড়ির প্রতি আগ্রহ থেকে। এর মধ্যে খ্যাতনামা স্থপতি লয়েড রাইট নির্মিত একটি বাড়ি তিনি কিনেছিলেন নিজে থাকার জন্য। তিনি প্রথম কনজারভেন্সির সংস্পর্শে আসেন, যখন একজন বোর্ড সদস্যের মালিকানাধীন একটি স্প্যানিশ ঘর তাকে আকৃষ্ট করে। এরপর থেকেই তিনি সংগঠনটির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েন, একটি অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেন এবং পরে বোর্ডেও যোগ দেন।
ডিশম্যান বলেন, ‘তিনি ছিলেন অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং তার সঙ্গে সময় কাটানো ছিল দারুণ। আমাদের দুজনেরই ঐতিহাসিক স্থানের প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল। বাড়িই ছিল তার প্রথম ভালোবাসা এবং তিনি সেগুলো কিনে মেরামত করতেন, যেমন লয়েড রাইটের বাড়িটি। তবে তিনি পুরো শহরের স্থাপত্য সৌন্দর্য ও গুরুত্ব বুঝতেন। যে লড়াইয়ে তিনি সবচেয়ে বেশি সময় ও আবেগ দিয়েছেন, সেটি ছিল অ্যাম্বাসেডর হোটেল রক্ষার লড়াই।’
লস অ্যাঞ্জেলেসের অ্যাম্বাসেডর হোটেলটি স্থপতি মায়রন হান্টের নকশায় ১৯২১ সালে নির্মিত হয়েছিল। তখন মিড-উইলশায়ার ছিল শহরের প্রান্ত। খুব অল্প সময়েই এটি ধনী ও বিখ্যাতদের একটি গ্ল্যামারাস গন্তব্য হয়ে ওঠে। পরে খ্যাতনামা স্থপতি পল উইলিয়ামস নিজের ছোঁয়া যোগ করেন, তৈরি করেন বিখ্যাত কফি শপ এবং কোকোনাট গ্রোভ নাইটক্লাব। হোটেলটিতে হুভার থেকে নিক্সন পর্যন্ত সব মার্কিন প্রেসিডেন্টই এসেছিলেন। কিন্তু ১৯৬৮ সালে এখানে রবার্ট এফ কেনেডির হত্যাকাণ্ডের পর এর অবনতি শুরু হয়। অবশেষে ১৯৮৯ সালে হোটেলটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর এটি সিনেমা ও টিভি শুটিংয়ের লোকেশন হিসেবে ব্যবহার হতো। ২০০১ সালে লস অ্যাঞ্জেলেস ইউনিফায়েড স্কুল ডিস্ট্রিক্ট এ জমি কিনে নেয় এবং কনজারভেন্সির দীর্ঘ লড়াই সত্ত্বেও ২০০৫ সালে তারা হোটেলটি ভেঙে ফেলার অনুমতি পায়। বর্তমানে এ জায়গায় রবার্ট এফ কেনেডি কমিউনিটি স্কুলস অবস্থিত।
কিন্তু হোটেলটি ভাঙার বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন ডায়ান কিটন। ২০০৬ সালে এ নিয়ে অ্যাম্বাসেডর হোটেলে একটি অনুষ্ঠান হয়েছিল। সেখানে কিটন বলেন, ‘আমি যখন আমাদের একসময়কার গৌরবময় অ্যাম্বাসেডরের ছায়ার দিকে তাকালাম, যেন একটি প্রেমিককে হারানোর মতো অনুভূতি হলো। আমার হৃদয় আবারো দ্রুত স্পন্দিত হতে লাগল এবং আমি তার শেষ দৃঢ় অবস্থানে একাকিত্ব অনুভব করলাম। আমি একটি প্রতিধ্বনি শুনতে পেলাম হয়তো সেটি ছিল অ্যাম্বাসেডরেরই কণ্ঠ, যেন সে আমাকে বলছিল, ‘‘বিদায়, ডায়ান। আমাকে তোমার হৃদয়ে রেখো এবং আগামীবার একটু বেশি চেষ্টা করো’’।’



