বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬
স্পটলাইট

শুধু শিশুরা নয়, প্রাপ্তবয়স্করাও ভোগেন এডিএইচডিতে

1-SM547105

অনেকের ধারণা, এডিএইচডি (Attention Deficit Hyperactivity Disorder) শুধুই শিশুদের সমস্যা। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, শৈশবে যাদের এডিএইচডি ধরা পড়ে, তাদের প্রায় ৬০ শতাংশই প্রাপ্তবয়স্ক বয়সেও এই সমস্যার প্রভাব বহন করেন।

মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা, কাজ শেষ না করেই অন্য কাজে চলে যাওয়া, সময় ম্যানেজমেন্টে সমস্যা—এসব শুধু শিশুদের নয়, অনেক প্রাপ্তবয়স্কেরও নিত্যদিনের বাস্তবতা। এর পেছনে থাকতে পারে এক অবহেলিত স্নায়বিক অবস্থা—এডিএইচডি।

এডিএইচডি কীভাবে কাজ করে

এডিএইচডি হলো একটি নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডার, যা মস্তিষ্কের মনোযোগ, নিয়ন্ত্রণ ও আচরণ ব্যবস্থাপনাকে প্রভাবিত করে। শিশুকালে এটি ধরা পড়লে সময়মতো চিকিৎসা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। কিন্তু যাদের ক্ষেত্রে ছোটবেলায় শনাক্ত করা যায় না, প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে তারা নানা জটিলতার মুখে পড়েন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বিশ্বের প্রায় ২.৫ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এডিএইচডিতে আক্রান্ত।

Advertisements

সাধারণ লক্ষণ

  • কাজে মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা
  • পরিকল্পনা ও সময় ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা
  • সহজে ভুলে যাওয়া বা জিনিস হারিয়ে ফেলা
  • স্থির হয়ে বসে থাকতে কষ্ট হওয়া
  • অতিরিক্ত কথা বলা বা না ভেবে কাজ করে ফেলা
  • হঠাৎ আবেগপ্রবণ আচরণ
  • অপেক্ষা করতে না পারা

শিশুদের মধ্যে এডিএইচডি

শিশুদের ক্ষেত্রে এডিএইচডি সাধারণত স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর স্পষ্ট হয়। তারা পড়াশোনায় মনোযোগ হারায়, নির্দেশনা অনুসরণে সমস্যা হয়, নিয়ম মানতে কষ্ট হয়। ফলে অনেক সময় শিক্ষক বা অভিভাবকরা তাদের ‘অমনোযোগী’ বা ‘দুষ্ট’ বলে মনে করেন। কিন্তু বাস্তবে তাদের মস্তিষ্ক কাজ করে ভিন্ন ছন্দে।

বর্তমানে অভিভাবকরা আগের তুলনায় সচেতন হওয়ায় অনেক শিশু স্কুলে যাওয়ার আগেই চিকিৎসকের মাধ্যমে সমস্যাটি শনাক্ত করতে পারে।

প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে এডিএইচডি

দুই-তিন দশক আগেও অভিভাবকদের সচেতনতা কম থাকায় অনেক শিশুর এডিএইচডি অচিহ্নিত থেকে যেত। সেই শিশুরাই এখন প্রাপ্তবয়স্ক, এবং তাদের জীবনে এর প্রভাব রয়ে গেছে।

প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে লক্ষণ কিছুটা আলাদা হয়। তারা হয়তো সবসময় চঞ্চল না, কিন্তু ভিতরে থাকে এক ধরনের অস্থিরতা ও মনোযোগহীনতা।

সাধারণত দেখা যায়—

  • কাজ বা প্রজেক্ট শেষ করতে দেরি হয়
  • সময়মতো দায়িত্ব পালন কঠিন হয়ে পড়ে
  • ভুলোমন ও বিশৃঙ্খল চিন্তাভাবনা
  • আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্ত, সম্পর্কের টানাপোড়েন
  • সহজে মনোযোগ হারিয়ে ফেলা

ফলে অফিস, পড়াশোনা এমনকি ব্যক্তিগত সম্পর্কেও এর প্রভাব পড়ে। অনেক সময় উদ্বেগ ও বিষণ্নতার সঙ্গে মিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক প্রাপ্তবয়স্কের ক্ষেত্রেই এডিএইচডি জীবনের পরের দিকে গিয়ে শনাক্ত হয়—যখন তারা কর্মক্ষেত্রের চাপ, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি বা সম্পর্কের ভাঙনের মুখে পড়েন।

কারণ ও প্রভাব

এডিএইচডি সাধারণত জিনগত; পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যেও এটি দেখা যেতে পারে। এছাড়া গর্ভাবস্থায় অপুষ্টি, ধূমপান, অ্যালকোহল সেবন, অকালে জন্ম বা পরিবেশে বিষাক্ত পদার্থের সংস্পর্শ এ ঝুঁকি বাড়ায়।

মস্তিষ্কের যেসব অংশ মনোযোগ, পরিকল্পনা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ নিয়ন্ত্রণ করে, এডিএইচডি আক্রান্তদের ক্ষেত্রে সেসব অংশ তুলনামূলকভাবে কম সক্রিয় থাকে।

চিকিৎসা ও সহায়তা

এডিএইচডি পুরোপুরি সেরে যায় না, তবে সঠিক চিকিৎসা ও সহায়তায় এটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য। চিকিৎসার তিনটি মূল ধাপ হলো—

  1. আচরণগত থেরাপি: মনোযোগ, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সময় ব্যবস্থাপনা শেখানো।
  2. ওষুধ: মস্তিষ্কের ডোপামিন ভারসাম্য ঠিক রাখতে স্টিমুল্যান্ট জাতীয় ওষুধ দেওয়া হয়।
  3. সহায়ক পরিবেশ: পরিবার, কর্মস্থল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহমর্মিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য কাউন্সেলিং, রুটিন প্ল্যানার, ডিজিটাল অ্যালার্ম ও মাইন্ডফুলনেস টেকনিক ব্যবহার কার্যকর হতে পারে।

বাংলাদেশে এডিএইচডি নিয়ে সচেতনতা এখনও সীমিত। স্কুলে প্রশিক্ষিত শিক্ষক ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার অভাবের কারণে অনেক সময় শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক—দু’য়ের ক্ষেত্রেই রোগ শনাক্তে দেরি হয়।

Advertisements