বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬
নারী

“নারীদের জন্য লড়ছি, সবার জন্য কাজ করতে চাই” — তাসনিম জাহান শ্রাবণ

WhatsApp Image 2025-10-13 at 7.22.55 PM

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে নতুন একটি পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছেন চৌধুরী তাসনিম জাহান শ্রাবণ। ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের পদার্থবিদ্যা বিভাগের এই ছাত্রী এবারের চাকসু (চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ) নির্বাচনে ‘বিনির্মাণ শিক্ষার্থী ঐক্য’ প্যানেল থেকে সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

তার দৃষ্টি শুধু নেতৃত্বে নয়, নেতৃত্বের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের অবহেলিত সমস্যাগুলোর বাস্তব সমাধান খোঁজার দিকে। গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তাসনিম বলেন, “দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই আমি প্রার্থী হয়েছি। এত বছর ধরে জনগণের টাকায় আমরা পড়ছি—এখন সময় বিশ্ববিদ্যালয়কে কিছু ফিরিয়ে দেওয়ার।”

‘লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি নয়, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা চাই’

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত থাকা উচিত—এ বিশ্বাস থেকেই তার লক্ষ্য চাকসুকে একাডেমিক ক্যালেন্ডারে সংযুক্ত করা। “চাকসুকে নিয়মিত ও কার্যকর করা গেলে ক্যাম্পাসের রাজনীতিতে লেজুড়বৃত্তিক আচরণ অনেকটাই কমে আসবে,” বলেন তিনি।

শুধু রাজনৈতিক সংস্কার নয়, শ্রাবণের পরিকল্পনায় রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের বিভিন্ন কাঠামোগত সংকটের সমাধান।

আবাসন সংকটে দুই ধাপে সমাধান

বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সংকট নিয়ে সুস্পষ্ট ও বাস্তবভিত্তিক দুই ধাপের পরিকল্পনা রয়েছে তার।
“স্বল্পমেয়াদে বিশ্ববিদ্যালয় আশপাশের কটেজ ও ফ্ল্যাটগুলো ভাড়া নিয়ে শিক্ষার্থীদের থাকার ব্যবস্থা করতে পারে। আর দীর্ঘমেয়াদে পরিত্যক্ত ভবন ও জমিগুলো পুনঃব্যবহার করে স্থায়ী সমাধান সম্ভব,” বলেন তাসনিম।

‘পরিবহন ব্যবস্থা সহজ হবে, মেডিকেল সেবা নিশ্চিত করব’

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন ব্যবস্থাকে আরও সহজ ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক করার অঙ্গীকার করেছেন তিনি। পাশাপাশি মৌলিক সেবাগুলোর ঘাটতিও তার নজরে রয়েছে।
“মেডিকেল সার্ভিস, ওষুধ, খাবার—এই মৌলিক বিষয়গুলোর সংকট দূর করতে কাজ করব। এগুলো ছাড়া শিক্ষার সঠিক পরিবেশ নিশ্চিত করা যায় না,” জানান তিনি।

নারীদের জন্য আলাদা অঙ্গীকার: নারীবান্ধব ক্যাম্পাস গড়ার প্রতিশ্রুতি

তাসনিম শ্রাবণের নির্বাচনী অঙ্গীকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ সম্ভবত নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও সহায়ক ক্যাম্পাস গড়ে তোলা।

তিনি বলেন, “নারী শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো কার্যকর ডে-কেয়ার নেই। শিক্ষকের ডে-কেয়ার ব্যবহারে অনেক সমস্যা হয়। যেসব নারী শিক্ষার্থীর সন্তান রয়েছে, তাদের শিক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রতিটি ফ্যাকাল্টিতে আলাদা ডে-কেয়ার স্থাপন করতে হবে।”

এছাড়াও তিনি উল্লেখ করেন, মসজিদে নারীদের জন্য ওজুর ব্যবস্থা, প্রতিটি ফ্যাকাল্টিতে স্যানিটারি প্যাড রাখার ব্যবস্থা, এবং নারী চিকিৎসা সহজীকরণ—এই বিষয়গুলোকেও তিনি অগ্রাধিকার দেবেন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়ে তিনি বলেন, “নারী শিক্ষার্থীদের জন্য কার্যকর যৌন নিপীড়ন-বিরোধী সেল গঠন করব। নিরাপত্তা যেন একটি বাস্তব বিষয় হয়ে ওঠে, কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে।”

‘আমি নেতা না, একাডেমিক মানুষ’

নিজেকে রাজনৈতিক চেহারা হিসেবে উপস্থাপন করতে নারাজ তাসনিম। তার ভাষায়, “আমি কোনো রাজনীতিবিদ না, একাডেমিক মানুষ। আমি জানি শিক্ষার পরিবেশ কেমন হওয়া উচিত। আমি ‘রাষ্ট্রচিন্তা’সহ বেশ কিছু সংগঠনে কাজ করেছি। ফলে সাংগঠনিক দক্ষতা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা দুটোই আছে আমার।”

তিনি মনে করেন, চাকসু গঠনতন্ত্র ও বিশ্ববিদ্যালয় আইনেই অনেক সমস্যা লুকিয়ে আছে, যেগুলোকে আগে শনাক্ত করতে হবে। তার ভাষায়, “পলিসি যদি না বদলানো যায়, তাহলে মূল সমস্যাগুলো থেকেই যাবে। আমি সেই জায়গা থেকেই কাজ করব।”

‘জিএস মানে শুধু দায়িত্ব নয়, তদারকিও’

শুধু দায়িত্ব নেওয়া নয়, দায়িত্ব পালন হচ্ছে আসল চ্যালেঞ্জ—এমনটাই মনে করেন এই প্রার্থী।
“আমি নিজের হাতে সব করব না, বরং কাজ করিয়ে নেব। কিন্তু কাজটা যেন ঠিকভাবে হয়, সেখানে কেউ ফাঁকি না দেয়—তা নিশ্চিত করাই হবে আমার মূল কাজ,” বলেন তিনি।

নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়েও স্পষ্ট অবস্থান

শুধু নির্বাচিত হওয়ার লড়াই নয়, নির্বাচন যেন স্বচ্ছ হয়—সেই দাবি জানিয়েছেন তাসনিম।
“ভোট গণনার সময়টা লাইভ টেলিকাস্ট করতে হবে, এবং সেটা যেন এক মুহূর্তের জন্যও বন্ধ না হয়। ১০ মিনিটের জন্যেও যদি বন্ধ থাকে, অনেক কিছু ঘটে যেতে পারে,” বলেন তিনি।

আরেকটি কার্যকরী প্রস্তাবও দিয়েছেন তিনি:
“ভোটকক্ষে প্রিসাইডিং অফিসার ও পোলিং এজেন্ট যেন দুই পাশে থাকেন এবং মাঝখানে ভোটার ভোট দেন—তাহলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে।”

‘আমার কোনো ব্লক ভোট নেই, আস্থা আছে শিক্ষার্থীদের বিবেচনায়’

তাসনিম নিজে রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসেননি, ফলে তার কোনও নির্দিষ্ট ‘ভোট ব্যাংক’ নেই। তবে তিনি আস্থা রাখেন শিক্ষার্থীদের সচেতনতায়।
“শিক্ষার্থীরা আমাকে চেনেন, জানেন আমি কেমন। আমি তাদের কাছে যাচ্ছি, কথা বলছি। আমার বিশ্বাস, তারা যোগ্য প্রার্থীকেই নির্বাচিত করবেন,” আত্মবিশ্বাসের সুরে বলেন তাসনিম জাহান শ্রাবণ।

এই তরুণ প্রার্থী যেভাবে স্বপ্ন দেখছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে, তাতে স্পষ্ট—তিনি শুধু নেতৃত্ব দিতে চান না, বদলও আনতে চান। শিক্ষা, অধিকার ও নিরাপত্তার মিশেলে তার স্বপ্ন যেন হয়ে ওঠে আজকের শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের ভিত্তি।