বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬
নারী

উপকূলীয় শিশুদের ধৈর্য-সহিষ্ণুতা দেশের জন্য জাতীয় ঋণ

WhatsApp Image 2025-10-09 at 13.01.31_044c15c8

প্রতিকূলতার মধ্যে থেকেও শিশুরা যে স্থিতধী হয়ে টিকে আছে, সেটি জাতির জন্য এক অনুপ্রেরণার পাঠ। প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের (পিআইবি) মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ বলেন, আজকের দিনে যদি আমাদের দেশটি ইউরোপের কোনো দেশ হতো তাহলে এসব শিশু বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেত।

বুধবার রাজধানীর পিআইবি সভাকক্ষে ‘সংকটাপন্ন শৈশব: জলবায়ু পরিবর্তন ও উপকূলীয় শিশুদের ওপর এর প্রভাব’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এমন মন্তব্য করেন তিনি। জাগ্রত যুব সংঘ (জেজেএস) ও উপকূলীয় শিশু ফোরাম যৌথভাবে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে।

ফারুক ওয়াসিফ বলেন, আজকের দিনে যদি আমাদের দেশটি ইউরোপের কোনো দেশ হতো, আপনারা হয়ত গ্রেটা থুনবার্গের মতো আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত একটি চরিত্র হতেন। উপকূলীয় অঞ্চলের শিশুরা যে প্রতিকূলতা পেরিয়ে এসেছে; পরিবারের সহায়তায় ঘরের নিরাপত্তা অতিক্রম করে, সমাজের নানা বাধা অতিক্রম করে; তার মানে বোঝা যায়, তাদের সাহস, ধৈর্য ও সক্ষমতা কতটা বিশাল।

তিনি বলেন, বাবা-মা, ভাই-বোনরা সর্বোচ্চ ভালো চায়, কিন্তু বাইরে পরিস্থিতি নিরাপদ নয়—এটি তাদের স্বাভাবিক উদ্বেগ। তবু শিশুরা সেই আশঙ্কা অতিক্রম করে সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে সক্ষম হচ্ছে। তাদের এই সংগ্রাম আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, উপকূলীয় শিশুদের ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা আমাদের দেশের জন্য একটি জাতীয় ঋণ। আমরা বড়রা তাদের জীবন ও আনন্দের অংশ কেড়ে নিচ্ছি প্রকৃতি, পরিবেশ, বন, নদী ও জলাশয়কে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এই ঋণটি আমাদের প্রতিনিয়ত মনে রাখা প্রয়োজন।

অনুষ্ঠানে খুলনার দাকোপের মুন মণ্ডল সংগ্রামের কথা তুলে ধরে বলেন, প্রতিবার ঘূর্ণিঝড় শেষে একই দৃশ্য—ছিন্ন বেড়িবাঁধ, কাদা-মাখা স্কুল, হারানো খাতা। একসময় যে স্কুলে সকালের ঘণ্টা বাজত, সেটা আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়। বই ভিজে যায়, ক্লাস বন্ধ থাকে মাসের পর মাস। অনেকেই আর স্কুলে ফেরে না।

সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলা থেকে আসা শিশু নাওশীন ইসলাম বলেন, দুর্যোগের সময় নারী ও পুরুষের সংখ্যা গোনা হয়, কিন্তু শিশুদের কোনো হিসাব রাখা হয় না। শিশুবান্ধব আশ্রয়কেন্দ্রও নেই। দুর্যোগের সময় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ে শিশুরাই। তাদের হাসি শুকিয়ে যাচ্ছে নোনাজলে, তাদের খেলাঘর ভেসে যাচ্ছে জলোচ্ছ্বাসে।

শিশু তানজিলা আক্তার মুক্তি বলেন, বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের সময় তারা আশ্রয় নেন অস্থায়ী কেন্দ্রে। যেখানে নিরাপদ পানি, শৌচাগার বা আলাদা জায়গার ব্যবস্থা নেই। বাল্যবিয়ের ভয়, নির্যাতনের আশঙ্কা, স্কুলছুট হওয়া— সব মিলিয়ে এক অদৃশ্য ট্রমা তৈরি হচ্ছে শিশুদের মধ্যে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনায় শিশুদের কথা প্রায় অনুপস্থিত। তাদের জন্য কোনো আলাদা বাজেট বা প্রস্তুতি থাকে না। অথচ তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অনুষ্ঠানে শিশু ফোরামের সদস্যরা দুর্যোগের সময়ে বিদ্যালয় বন্ধ থাকা ও পড়াশোনার ক্ষতির বিষয়টি তুলে ধরেন। তারা জলবায়ু ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় শিশুদের মতামত ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দাবি জানান। এছাড়াও সভায় উপকূলীয় অঞ্চলের শিশুরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ১৭ দফা দাবি তুলে ধরেন। এর মধ্যে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, মাল্টিপারপাস স্কুল-শেল্টার, নিরাপদ স্যানিটেশন ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা এবং বাল্যবিয়ে রোধে স্থানীয় তদারকি জোরদার করার মতো বিষয় রয়েছে।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক উম্মে সালমা সুমি, জাপানি এনজিও শাপলা নীরের কান্ট্রি ডিরেক্টর ইউমি ইয়াগাসিতো, জেজেএসের নির্বাহী পরিচালক এটিএম জাকির হোসেন ও শিশু ফোরামের সভাপতি নুর আহমেদ জিদান।

অনুষ্ঠানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পরিচালক নিতাই চন্দ্র বলেন, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার সময় শিক্ষাকার্যক্রম ব্যাহত হয়। তাই ভবিষ্যতে স্কুলগুলোকে মাল্টিপারপাস শেল্টারে রূপান্তর করা হবে। তিনি আরও বলেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে শিশুদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে আমরা কাজ করব।