১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | বুধবারবাংলা: ১ আশ্বিন ১৪৩৩
স্পটলাইট

শান্তি নয়, সহিংসতাই পাহাড়ের নিয়তি?

960px-Cakchiquel_family

পার্বত্য চট্টগ্রাম যেন কখনোই দীর্ঘ সময় শান্ত থাকে না। সর্বশেষ খাগড়াছড়িতে ঘটে যাওয়া ঘটনা আমাদের সেই পুরোনো বাস্তবতায় ফিরিয়ে নিয়ে গেছে, যেখানে অধিকারবঞ্চিত জনগোষ্ঠী আবারও রাষ্ট্রের নিষ্ক্রিয়তা ও সহিংস চক্রের শিকার।

২৩ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ি শহরের এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগের জেরে রাস্তায় নামে জনতা। এর জেরে তিনজনের প্রাণহানি ঘটে, আগুন দেওয়া হয় আদিবাসীদের দোকান ও বাড়িঘরে, চলে লুটপাট। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১৪৪ ধারা জারি করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা হলেও সহিংসতা ঠেকানো যায়নি।

বিচারহীনতার সংস্কৃতিই উৎসাহ দেয় ধর্ষকদের

খাগড়াছড়ি মহিলা কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে সেখানে সাতজন পাহাড়ি নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, তিনটি ধর্ষণচেষ্টার ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই ধর্ষণের বেশিরভাগই সংঘবদ্ধ ধর্ষণ।কিন্তু এর কোনোটিরই নেই প্রশংসনীয় বিচারপ্রক্রিয়া। আসামিদের কেউ কেউ ধরা পড়লেও জামিনে মুক্ত হয়ে যায়। ডাক্তারি পরীক্ষায় দেরি করা হয় এমনভাবে, যাতে আলামত নষ্ট হয়ে যায়। পুলিশের ভূমিকা নিয়েও আছে প্রশ্ন—ধর্ষণের মামলা না নিতে নিরুৎসাহিত করা, মীমাংসার জন্য চাপ দেওয়া কিংবা আর্থিক লেনদেনে জড়িয়ে পড়া–এগুলো সাধারণ অভিযোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পুরোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি, কিন্তু বিচার নেই

Advertisements

এটা প্রথম ঘটনা নয়। চলতি বছরের জুন মাসেও এক পাহাড়ি নারী ধর্ষণের শিকার হন—সেটিরও বিচার হয়নি।

গত বছর সেপ্টেম্বরে মোটরসাইকেল চুরি ও এক বাঙালির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে তিন আদিবাসী নিহত হন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে। সেই ঘটনারও কোনো স্বচ্ছ তদন্ত হয়নি।

এখন প্রশ্ন হলো—প্রতিবার কেন সহিংসতায় ভিক্টিম হয় আদিবাসীরাই?

শান্তিচুক্তি ছিল আশার আলো, বাস্তবায়ন আজও প্রশ্নবিদ্ধ

১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তি পার্বত্য চট্টগ্রামে সহিংসতার অবসান ঘটানোর আশাবাদ নিয়ে এসেছিল।কিন্তু প্রায় তিন দশক পেরিয়ে গেলেও চুক্তির মূল বিষয়গুলো আজও অনুপস্থিত।

চুক্তিতে বলা হয়েছিল:

পাহাড়িদের ভূমি অধিকার রক্ষা করতে হবে

ঐতিহ্যগত সুরক্ষা আইন মানা হবে

আদিবাসীদের উচ্ছেদ বা ভূমি দখল করা যাবে না

নারী নির্যাতনে সরকারের সদিচ্ছাই যথেষ্ট

আদিবাসীদের অন্যান্য দাবির বাস্তবায়নে প্রশাসনিক জটিলতা থাকলেও নারী নির্যাতন প্রতিরোধে শুধুই সরকারের সদিচ্ছা প্রয়োজন।

রাষ্ট্র যদি চায়, আজই বন্ধ করা সম্ভব ধর্ষণের এই চক্র।

আমরা যদি আগের ঘটনাগুলোর উপযুক্ত বিচার নিশ্চিত করতাম, তবে হয়তো নতুন করে কাউকে ধর্ষণের সাহস দেখাত না কেউ।

সহিংসতা কি রাজনৈতিক ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ?

২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থান ও সরকারের পরিবর্তনের পরে আশা করা হয়েছিল, নতুন নেতৃত্বে পাহাড়ে শান্তি ফিরে আসবে।

আদিবাসী নেতারা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠকেও বসেছিলেন।তবুও, কেন শান্তি ফিরছে না? নতুন সরকারের আমলেও আদিবাসীদের ওপর সহিংসতা, বৈষম্য, অবহেলা চলতেই থাকছে।

এখনই সময়, নয়তো ইতিহাস ফিরে আসবে

আজ যদি রাষ্ট্র উদ্যোগ না নেয়, তবে অচিরেই পুরোনো ক্ষত নতুন করে ফেটে পড়বে। আমরা চাই না পার্বত্য চট্টগ্রাম আবার অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠুক।

ধর্ষণ, হত্যাকাণ্ড, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ—এসবের চক্র থেকে মুক্তির একমাত্র পথ অংশগ্রহণমূলক, সম্মানজনক, মানবিক এবং রাজনৈতিক সমাধান।

Advertisements