খেতে ভয়, রোগা হওয়ার নেশা- প্রা’ণঘাতী অ্যানোরেক্সিয়ায় কীভাবে মৃ’ত্যু পর্যন্ত হয়?

একজন মানুষ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখছেন। চারপাশের সবাই বলছে তিনি খুবই রোগা। কিন্তু তার নিজের চোখে তিনি এখনও “মোটা”। তাই খাবার কমিয়ে দেন, ক্যালোরি গোনেন, ক্ষুধা পেলেও খান না। ধীরে ধীরে শরীর ভেঙে পড়ে, কিন্তু ওজন বাড়ার ভয় তাকে ছাড়ে না। এই ভয়, এই বিকৃত আত্ম-ধারণাই জন্ম দেয় অ্যানোরেক্সিয়া নারভোসা নামের এক ভয়াবহ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার।
অ্যানোরেক্সিয়া নারভোসা (Anorexia Nervosa) হলো একটি খাদ্যাভ্যাসজনিত মানসিক ব্যাধি, যেখানে ব্যক্তি নিজের ওজন ও শরীরের গঠন নিয়ে অস্বাভাবিক উদ্বেগে ভোগেন। ওজন বাড়ার তীব্র ভয়ের কারণে তারা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম খাবার খান, কখনও কখনও একেবারেই না খেয়ে থাকেন। ফলে শরীরের ওজন বিপজ্জনকভাবে কমে যায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু খাদ্যসংক্রান্ত সমস্যা নয়; বরং আত্মপরিচয়, আত্মসম্মান, সামাজিক চাপ এবং মানসিক স্বাস্থ্যের জটিল সমন্বয়ে তৈরি একটি রোগ। বিশেষ করে কিশোরী ও তরুণীদের মধ্যে এটি বেশি দেখা গেলেও বর্তমানে পুরুষদের মধ্যেও এর হার বাড়ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি, ‘পারফেক্ট বডি’ সংস্কৃতি এবং অবাস্তব সৌন্দর্যের মানদণ্ড অনেক ক্ষেত্রে এই রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। যখন একজন মানুষ মনে করেন তার মূল্য নির্ভর করছে শরীরের ওজন বা চেহারার ওপর, তখন ধীরে ধীরে তিনি বিপজ্জনক খাদ্যনিয়ন্ত্রণের পথে হাঁটতে পারেন।
অ্যানোরেক্সিয়ার লক্ষণগুলো শুরুতে খুব সাধারণ মনে হতে পারে। কেউ হয়তো ডায়েট করছেন, নিয়মিত ব্যায়াম করছেন বা স্বাস্থ্য সচেতন হয়েছেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে দেখা যায়, তিনি খাবার এড়িয়ে চলছেন, পরিবারের সঙ্গে খেতে বসছেন না, ওজন নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করছেন, আয়নায় বারবার নিজেকে দেখছেন কিংবা নিজের শরীর নিয়ে অসন্তুষ্ট থাকছেন।

শারীরিকভাবে এর প্রভাব ভয়াবহ। অপুষ্টি, দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, রক্তচাপ কমে যাওয়া, চুল পড়া, হাড় ক্ষয়, হৃদযন্ত্রের সমস্যা এবং হরমোনজনিত জটিলতা দেখা দিতে পারে। নারীদের ক্ষেত্রে মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি সাধারণ লক্ষণ। দীর্ঘদিন চিকিৎসাহীন থাকলে এটি প্রাণঘাতীও হতে পারে।
বিশ্বজুড়ে অনেক পরিচিত ব্যক্তিত্বও এই রোগের সঙ্গে লড়াই করেছেন। হলিউড অভিনেত্রী Lily Collins প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, কৈশোরে তিনি অ্যানোরেক্সিয়ায় ভুগেছিলেন। পরে সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তিনি অভিনয় করেন To the Bone চলচ্চিত্রে, যেখানে খাওয়াদাওয়ার ব্যাধির ভয়াবহতা তুলে ধরা হয়েছে। গায়িকা Demi Lovato-ও দীর্ঘদিন খাদ্যাভ্যাসজনিত সমস্যার সঙ্গে লড়াই করেছেন। এছাড়া Princess Diana নিজের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা কথা বলতে গিয়ে খাদ্যসংক্রান্ত ব্যাধির অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছিলেন। তবে সবাই এই লড়াইয়ে জয়ী হতে পারেননি। ব্রাজিলের মডেল Ana Carolina Reston মাত্র ২১ বছর বয়সে অ্যানোরেক্সিয়ার জটিলতায় মারা যান। তার মৃত্যুর সময় ওজন এতটাই কমে গিয়েছিল যে ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে। চিকিৎসকরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন যে অ্যানোরেক্সিয়া নারভোসা মানসিক রোগগুলোর মধ্যে মৃত্যুহারের দিক থেকে সবচেয়ে বিপজ্জনক রোগগুলোর একটি।
তাহলে কি এর চিকিৎসা সম্ভব?
বিশেষজ্ঞদের উত্তর-হ্যাঁ, সম্ভব। তবে যত দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা যায়, তত ভালো ফল পাওয়া যায়। অ্যানোরেক্সিয়ার চিকিৎসা সাধারণত কয়েকটি ধাপে করা হয়। প্রথমত, রোগীর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল করতে পুষ্টি পুনরুদ্ধার জরুরি। দ্বিতীয়ত, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীর সহায়তায় কাউন্সেলিং বা সাইকোথেরাপি দেওয়া হয়। বিশেষ করে কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (CBT) রোগীর বিকৃত চিন্তাভাবনা পরিবর্তনে কার্যকর বলে বিবেচিত।

পরিবারের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগীকে জোর করে খাওয়ানোর চেষ্টা, অপমান করা বা ওজন নিয়ে মন্তব্য করা পরিস্থিতি আরও খারাপ করতে পারে। বরং সহানুভূতি, ধৈর্য এবং পেশাদার সহায়তা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে কার্যকর পথ।
বর্তমান সময়ে অ্যানোরেক্সিয়া নিয়ে সচেতনতা বাড়লেও অনেক মানুষ এখনও এটিকে শুধু ‘ডায়েটিংয়ের সমস্যা’ বলে মনে করেন। বাস্তবে এটি একটি গুরুতর মানসিক স্বাস্থ্য ব্যাধি, যা মানুষের শরীর, মন এবং জীবন-তিনটিকেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিতে পারে।
সুস্থ শরীর মানেই নির্দিষ্ট একটি ওজন নয়, আর সৌন্দর্যও কোনো নির্দিষ্ট মাপের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অ্যানোরেক্সিয়া নারভোসা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কখনও কখনও সবচেয়ে বড় যুদ্ধটি ক্ষুধার বিরুদ্ধে নয়-নিজের ভেতরের ভয়, অনিরাপত্তা এবং বিকৃত আত্ম-ধারণার বিরুদ্ধে। আর সেই যুদ্ধ জেতার জন্য প্রয়োজন সচেতনতা, সহমর্মিতা এবং সময়মতো চিকিৎসা।



