১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | বৃহস্পতিবারবাংলা: ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩
সাহিত্য-সংস্কৃতি

স্তব্ধ

স্তব্ধ

ঢাকার আবহাওয়া শরীরে লাগার সাথে সাথেই একটা বড় দম নিলাম। দীর্ঘ চার বছর পর আমার দেশে ফেরা। প্লেন ল্যান্ড করার সাথে সাথেই আমার মনে হল গত তিনটা বছর আমি এই দিনটার অপেক্ষা করেছি। নিজের অজান্তেই বারবার চোখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। ইমিগ্রেশন শেষ করে লাগেজ বেল্টের সামনে আসতেই এতো অস্থির লাগছিলো, মনে হচ্ছিল সবকিছু ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে এক দৌড়ে এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে যাই। আমি জানি আমার জন্য এয়ারপোর্টের মূল ফটক পেরিয়া গেলেই করছে সৌরভকে আমি কাছে পাবো। গত চারবছর ধরে সেও নিশ্চই আমার মতই এভাবে আজকের দিনটারই অপেক্ষায় ছিল। 

আমি রুপা।সৌরভ আর আমি শুধু একই স্কুল কিংবা কলেজ নয় একই এলাকায় একসাথেই বড় হয়েছি।ছোটবেলায় একসাথে খেলতে খেলতেই , নাকি শৈশব পার হয়ে কৈশোরেই মনের খুব গোপনে আমরা দু’জন কখন যে বন্ধুর চেয়ে একটু বেশিই হয়ে গেলাম বুঝতেই পারলাম না। আমি তখন ক্লাশ টেনে পড়ি আর সৌরভ কলেজে। সামনে আমার এসএসসি পরিক্ষা। সৌরভের সেই কি চিন্তা যেন আমার রেজাল্ট ভালো হয়। সে প্রায় প্রতিদিন এই স্যারের নোট, সেই স্যারের সাজেসন এনে বাড়িতে আম্মার কাছে দিয়ে যেতো। যেকরেই হোক তার কলেজে এডিমিশনটা নাকি নিতেই হবে আর এইজন্য রেজাল্টাও তো খুব ভালো করতে হবে যারকারণে এতো কষ্ট করা।

আমি তখনও জানি না সৌরভ কেন চায় আমি তার কলেজেই এডমিশন নেই! আমরা তো এক ক্লাশে পড়ি না বরং আমি ভর্তি হবার মাস ছয়েকের মধ্যে তারও কলেজ ছাড়বার সময় হয়ে যাবে। তবে ঐ বয়সে আমাকে নিয়ে তার এমন যত্নবান আচরণ আমি বেশ উপভোগ করতাম। কেমন যেন লজ্জাও পেতাম।এসএসসি পরিক্ষার রেজাল্ট যেদিন হলো আমার জন্য একটা চকবার আইসক্রিম নিয়ে দেখা করেছিল সৌরভ।আমি ওর কলেজে ভর্তি হলাম। প্রায়দিনই টিফিনের সময় ওর সাথে আমার দেখা হয়। আমি অপেক্ষায় থাকতাম এক ঝলক সৌরভকে দেখবো ! সেই সাথে খুব জানতে ইচ্ছা করতো আমার বুকের মধ্যেখানে ওকে দেখলে যেমন ঝড় উঠে তারও কি এমনই হয় নাকি এমনিতেই আমার প্রতি এমন যত্নবান? সরাসরি কিছু জিজ্ঞেস করার মত সাহস কিংবা শক্তি কিছুই আমার ছিল না। আমি বরাবরই খুব নরম এবং লাজুক স্বভাবের । কলেজে ওকে অন্য কোন মেয়ের সাথে কথা বলতে দেখলে আমার খুব কষ্ট হতো। নিজের উপর সামান্য রাগও হতো । কথা বল্লে কি এমন ক্ষতি? আমরা দু’জনে কোএড কলেজে পড়ি সেখানে ছেলে মেয়েতে বন্ধুত্ব হতেই পারে এতে আমার বুক ব্যথা হবার তো কথা না তাই না। একবার আমি ক্লাশ শেষে ক্লাশ রুম থেকে বের হয়ে ব্যালকনির রেলিং ধরে নীচের দিকে তাকাতেই দেখলাম সামনের বটতলায় সৌরভ একটা মেয়ের সাথে খুব হেসে গড়িয়ে আড্ডা মারছে আমার এতো রাগ হলো যে কাঁদতে কাঁদতে সেদিন জ্বর উঠে গেল এবং পরের তিনদিন কলেজে যেতে পারি নাই। সৌরভ এলো খবর নিতে কেন কলেজে যাচ্ছি না । আম্মা আমার শরীর খারাপের কথা জানালো সে পরদিন কলেজের সব বাড়ির কাজ, ক্লাশের কাজ যোগার করে আবার আম্মার কাছে দিয়ে গেল। তার এই পদক্ষেপ আমার মন গলালো না এবার আর আমি সে যেই ভার্সিটিতে ভর্তি হবে সেখানে ভর্তি হচ্ছি না বাপু আমার যেখানে খুশি সেখানে পড়বো বলেই মনস্থির করলাম। ছোটবেলার গোপন প্রেম বলেই হয়ত অভিমানের পুরুত্বটা একটু বেশিই ছিল এখন এসব ভাবলে এতো হাসি পায় কি বলবো। ইন্টারনেট ব্রাউজ করে কতশত নানান দেশের ইউনিভার্সিটির খবর নিলাম যারা রেজাল্টের উপর ভিত্তি করে স্কলারশীপ দিয়ে বাইরে পড়ার সুযোগ করে দেয়।জ্বরের ঘোরেই বেশ কিছু ইউনিভার্সিটিতে এপ্লিকিশন করে রেখেছিলাম যা পরবর্তিতে ভুলেই গেছিলাম একটা সময়। 

সুস্থ্য হয়ে কলেজে যাওয়া শুরু করলাম। চেষ্টা করতাম সৌরভকে এড়িয়ে যাওয়ার কারণ তাকে চিন্তা করে করে লেখাপড়ায় ভালই ক্ষতি হচ্ছিল যা আমার পক্ষে একদম মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না।সৌরভ কিভাবে যেন বুঝে গেল আমি কেন তাকে এড়িয়ে চলছি। সে আমাকে দেখলে মুচকি হাসতো কিছু বলতো না যেন সে বিরাট মজা পেয়েছে তার প্রতি আমার অভিমান দেখে।দেখতে দেখতে আমি ২য় বর্ষে উঠে গেলাম আর এদিকে সৌরভের কলেজ ছাড়ার সময় চলে এলো। স্বভাবগত ভাবে সমস্ত নোটের ফটোকপি বাড়িতে পৌছেও দিলো। আমার সাথে সৌরভের তখন কথা বন্ধ বেশ অনেকদিন কিন্তু চোখাচোখি হয়, সে দুষ্টভরা চোখ নিয়ে মাঝে মাঝে মুচকি হাসে কখনও দীর্ঘশ্বাস মুষ্টিবদ্ধ করে আমার দিকে ছুড়ে মারে কিন্তু আমি কিছু বলি না। কি যে হয়েছিল আমার আজও সেটা চিন্তা করে নিজের অজান্তেই হো হো করে হেসে উঠি। 

সেদিন ছিল এইচএসসি ব্যাচের বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠান। আমরা মেয়েরা সবাই শাড়ি পরে কলেজে গেছি। অনুষ্ঠান শেষে যখন কোরিডর দিয়ে হেঁটে মূলফটকের দিকে যাচ্ছিলাম হুট করে সৌরভ আমার সামনে এসে পরলো মুহূর্তের মধ্যে আমার হাতে একটা চিরকূট দিয়ে চলে গেল আমি চিরকূটটা খুলে দেখি সেখানে লেখা

“ যদি বলি তোমাকে ভালোবাসি কোন প্রবলেম?

Advertisements

   সমস্যা যদি না থাকে, তবে পেছনে ফিরে একবার দেখো?”

আমি চিরকূট পড়তে পড়তেই পেছনে তাকিয়ে দেখি সে দেওয়ালে হেলান দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে। আমার সমস্ত পৃথিবী যেন দুলে উঠলো। জীবনে কোনদিন এত লজ্জা পেয়েছি কিনা আমার মনে পরে না। আমি ঠিক কি বলবো বুঝতে পারছিলাম না ঠোঁট টিপে কোনরকমে দু’হাত দিয়ে মুখ ঢেকে দৌড়ে সেখান থেকে পালিয়ে বাঁচলাম। কেউ এভাবে প্রপোজ করে এত মানুষের সামনে? আমার বুঝি লজ্জা লাগে না? 

সেই থেকে আমাদের প্রেমের শুরু। সৌরভ এইচএসসিতে খুব ভালো রেজাল্ট করলো বরাবরের মতই তারপর বুয়েটে ভর্তি হলো।আমারা প্রায়ই সন্ধেবেলা ছাদে বসে গল্প করতাম , জীবন নিয়ে স্বপ্ন সাজাতাম, সে আমাকে মাঝে মাঝে ক্যামেস্ট্রি পড়াতো। দিনগুলো স্বপ্নের মত কাটছিল। পৃথিবীতে প্রেমের মত সুন্দর হয়তো ফুলও না এমন মনে হতো আমার। আমাদের ঝগড়া কখনও হতো না সবসময় আমরা নিজেদের খুব মানিয়ে চলতাম। সৌরভ অবশ্য ভীষণ শান্ত সে ঝগড়া করার মত ছেলেই না। আমাদের পরিবারের সবাইও আস্তে আস্তে বুঝতে পারলো আমরা একে অপরকে পছন্দ করি। আমার বোর্ড পরিক্ষা চলে এলো। কিন্তু রেজাল্ট আশানুরুপ ভালো না হওয়ায় এবং ভর্তি পরিক্ষাও ভালো না হওয়ায় আমি মেজিকেলেও চান্স পেলাম না বুয়েটেও না। আমি অবশ্য তেমন দুশ্চিন্তা করছিলামও না ভেবেছিলাম লেখাপড়া করে কি হবে তারচেয়ে বরং সৌরভ পাশ করুক চাকরিতে ঢুকলেই বিয়ে করে সংসার ধর্ম পালন করি। আমার এই কথা শুনে সৌরভ খুব রাগ হলো কেন পড়াশোনা করবো না বলছি? বিভাগীয় ইউনিভার্সিটির পরিক্ষা তো এখনও বাকি এতো হতাশ কেনো হচ্ছি। আমি আসলে কখনই এতো ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবি নাই তবে সৌরভের আমাকে নিয়ে ভাবাটা খুব ইনজয় করতাম। তার কথা ছিল আর যাই কর না কেন পড়াশোনাটা একদম ঠিক থাকতে হবে। 

একদিন সকালবেলা ইমেইল চেক করতে গিয়ে দেখি নিউজিল্যান্ডের একটা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমাকে রেজাল্ট এর আপডেট দিয়ে মেইল করতে বলেছে । তখন মনে পরলো বছর খানেক আগে আমি বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে কৌতূহল বসত আমার সমস্ত কিছু পাঠিয়েছিলাম ঐ যে জ্বরের ঘোরে তারাই আমাকে আবার যোগাযোগ করার জন্য ইমেইলটা করেছে। আমি রেজাল্ট সহ সকল কাগজপত্র পাঠিয়এ দিলাম সাথে সাথেই তার কয়েক দিনপরই তারা আমাকে ফুলফান্ড স্কলারশীপ দিয়ে পড়ার সুযোগটা দিতে চায় বলে জানায়। আমি আগেপিছে কিছু না ভেবেই সেই ইমেইল সৌরভকে ফরওয়ার্ড করে দেই। প্রথমে খুশিতে চিৎকার দেই ঠিকই তারপরপরই কিছুক্ষণ তব্দা মেরে বসে থাকি আমি কি আসলেই দেশ ছেড়ে এতো দূরে পড়তে যাব তাও দীর্ঘ চার বছরের জন্য? আমি পারবো? আমার কি হবে? সৌরভের কি হবে? আমাদের সম্পর্কের কি হবে? এমন হাজারটা প্রশ্ন মাথায় ঘুরতে থাকে। আম্মা আব্বাকে জানানোর পর তারা তো সেই খুশি। উন্নত বিশ্ব, ভালো ইউনিভার্সিটি, বায়োলজির মত সাব্জেক্টে পড়বো সব মিলাই অবশ্যই ব্যাপারটা স্বপ্নের মত তবুও কেন যেন মনটা খারাপ লাগছে। বারবার সৌরভের কথা মনে হচ্ছে। 

সন্ধায় সৌরভ আমার জন্য ফুল আর চকলেট নিয়ে আসলো, সেও ভীষণ খুশি এত বড় সুযোগ আমি পেয়েছি সেটা তো সেলিব্রেট করতেই হয়। সৌরভের উচ্ছাস দেখে আমার দুশ্চিন্তা কিছুটা কমলেও মনের কোন জায়গায় জানি খুব ব্যথা হচ্ছিলো। সৌরভকে যখন মিনমিন করে বল্লাম “না যাই না এখানেই কোথাও কিছু একটা পড়ি?” সে আমার হাতটা শক্ত করে ধরে বলেছিল “উহু তুমি ওখানেই পড়বে, এভাবে ফুলফান্ড স্কলারশীপ বৃথা যেতে দেওয়া যাবে না, আমি ততদিনে তোমার জন্য উপযুক্ত বর হয়ে নিজেকে তৈরি করি তুমি ফিরে আসলেই আমরা বিয়ে করবো। খবরদার কোন বিদেশীর সাথে আবার প্রেম ট্রেম কইরো না কিন্তু একদম ওখানে এসেই খুন করে ফেলব রু” 

আমি এত হাসছিলাম সৌরভের কথা শুনে ঐদিন। সে আমাকে সবসময় রু ডাকতো কখনও পুরো নামে ডাকতো না।যেদিন দেশ ছেড়েছিলাম বাড়ি থেকে সবাই বিদায় দিলেও সে আমাকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত নিয়ে এসেছিলো। যতক্ষণ আমরা গাড়িতে ছিলাম আমার হাতটা শক্ত করে ধরে ছিল। আমি ওর মুখের দিকে তাকাতে পারছিলাম না একদমই। বারবার নিজের উপর জিদ হচ্ছিল কেন যে যাচ্ছি কেনইবা এপ্লাইটা করেছিলাম । আমি জানি আমাকে বিদায় দেওয়া আমার চেয়ে লক্ষকোটি গুণ কষ্ট  হচ্ছে সৌরভের কিন্তু তারপরও তার সিদ্ধান্তেই আমাকে এই সুযোগটা নেবার সাহস যুগিয়েছে কারণ সে সবসময় চাইতো আমি পড়াশোনায় যেন তার চেয়ে ভালো করি। 

আজ আমার অপেক্ষার পালা শেষ । লাগেজ ট্রলিতে উঠাতে উঠাতে বের হবার রাস্তারটা মাপার চেষ্টা করছি। বুকের ভেতরটা কেমন যেন দুমড়ে মুচরে যাচ্ছে। 

ঐ যে সৌরভকে দেখা যায় মনে করে সামনে এগিয়ে গেলাম। মুচকি হেসে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেল্লাম।না যে মানুষটা ট্রলি থেকে আমার লাগেজ নামিয়ে গাড়িতে তুলছে সে আমার সৌরভ না। আমি ঠিকমত তার দিকে তাকাতেও পারছি না। চার বছর আগে আমি কি জানতাম আমার জন্য এমন একটা দিনও অপেক্ষা করছে? গাড়িতে আমি আর শোভন। সাঁই সাঁই করে গাড়ি এলিভেটর এক্সপ্রেস দিয়ে যাচ্ছে। এই উন্নয়ন আমি যখন দেশ ছেড়েছিলাম তখন দেখি নাই। এটার উপর দিয়ে যাচ্ছি বলেই কোন জ্যম নেই যানজট নেই। শোভন আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো কেমন আছি। আমি কোন উত্তর দিলাম না। আমরা ২০ মিনিটের মাথায় আজিমপুর পৌছে গেলাম। শোভনকে আগেই বলে রেখেছিলাম বাড়িতে যাবার আগে আমি কবরস্থান যেতে চাই। শোভন বারবার বলছিল মেয়েরা নাকি গোরস্থানে যায় না। আমি ওসব শুনতে চাই নাই। কত নিয়মই তো আছে যা স্বয়ং প্রকৃতিই মানে না আমি তো সামান্য মানুষ।

হ্যা আমার সৌরভ দুনিয়াতে নেই। বড্ড অসময়ে তার অকাল মৃত্যু আমরা মেনে নিয়েছি। সে যে বীরের মৃত্যু বরণ করেছে। দেশের জন্য দশের জন্য সেবায় নিজেকে নিয়েজিত করতে গিয়ে বৈষম্যহিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সকলের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করার সময় একটা গুলি নাকি তার মাথার ঠিক পেছনে লেগেছিল আর সঙ্গে সঙ্গেই সে মাটিতে লুটিয়ে পরে। সময় মত হাসপাতালে পৌছিয়েছিল ঠিকই কিন্তু প্রায় আটদিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে আমার সৌরভ আর পারলো না ফিরতে। তার মৃত্যুর তিনদিন আগে আমার সাথে ভিডিওকলে শেষ কথা হয় সে বারবার বলছিল “আরে কিচ্ছু হয়নি কয়েকদিনের মধ্যে সুস্থ্য হয়ে বাড়ি চলে যাব তুমি চিন্তা করো না তো একদম । তোমার ফাইনাল চলছে মন দিয়ে পরিক্ষা দাও আমি কিন্তু তোমার ভালো রেজাল্ট চাই তারপর তোমার জন্য একটা বিরাট সারপ্রাইজ আছে হুম?”

ওর কথা আমি বিশ্বাস করেছিলাম আমি জানতাম তার কিচ্ছু হবে না। কিন্তু আমার সাথে কথা হবার ঘন্টাখানেক পরই নাকি তার খিচুনী শুরু হয় তারপর আইসিওতে টানা তিনদিন লাইফ সাপোর্টে ছিল সে নাকি কোমায় চলে গিয়েছিল অথচ তার মৃত্যুর আগে কিংবা পরেও কেউ আমাকে কিচ্ছু জানায় নাই। আমি একা একটা ভীনদেশে তারউপর পরিক্ষা চলছে নাকি কি যে এদের মাথায় চলছিল কে জানে ।

৪/৫ দিন যখন সৌরভের কন্ঠ না শুনে ছিলাম পাগল প্রায় অবস্থায় বারবার জিজ্ঞেস করেও জানতে ব্যর্থ হচ্ছিলাম সে কেমন আছে। পরে যখন শোভন আমাকে জানালো তার ভাই পৃথিবীতে নেই, সে আমাকে ফেলে সবাইকে ফেলে অনন্ত নক্ষত্র বিথীর পথে রওনা করেছে অদ্ভুত ভাবে আমি কেমন শক্ত হয়ে গেলাম এক ফোটা চোখের পানি আমাকে ঝাপসা করলো না। সংবাদটা আমাকে পাথর করে দিল। পরিক্ষা শেষে এমনিতেও টিকেট করা ছিল আমি সেই টিকেট দুদিন আগে বদলিয়ে তারিখ নিলাম কোন রকমে দেশে ফিরলাম।

শোভন সৌরভের ৫ মিনিটের ছোট তারা দেখতে অবিকল একরকম কিন্তু আমার কখনই তাদেরকে একরকম লাগতো না এখন তো আরো লাগছে না।বাসা থেকে আব্বা আম্মা আসতে চেয়েছিল আমি মানা করে দিয়েছিলাম আমিই শোভনকে বলেছিলাম যেন আমাকে তার ভাইয়ের কাছে সবার আগে নিয়ে যায়। সৌরভের উপর আমার ভীষণ অভিমাণ সেই কিশোর বেলার মতো। এমন তো কথা ছিল না? তার জন্যই তো আমি বিদেশ গেলাম এতোদিন  তাকে ছাড়া ছিলাম এখন যখন আমাদের এক হবার কথা, সংসার শুরু করার কথা তখন সে ফাঁকি মেরে চলে গেলো? চলে যাওয়াটা এতোটাই সহজ।

আজিমপুর কবরস্থানের সামনে শোভন গাড়ি পার্ক করলো। রুপা চোখ বন্ধ করে বসে আছে শোভনও কিছু বলছে না। রুপার দিকে তাকানো যাচ্ছে না।যেই রুপা দেশ ছেড়েছিল প্রিয়তম সৌরভের কথায় এই রুপা সেই রুপা নয়। এ যেন একটা পাথর। বিকেল প্রায় শেষ হয়ে এলো চারদিকে পাখীর কলতান যেনো জানান দিচ্ছে এখন নীড়ে ফেরার সময়। রুপা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শোভনের দিকে তাকালো। 

তারা ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে সৌরভের সমাধির কাছাকাছি। সৌরভের কবরের কাছে  আসতেই রুপা ফিসফিস করে বলল “সৌরভ এমন তো কথা ছিল না?”

বলতে বলতেই রুপা মাটিতে লুটিয়ে পরলো॥ 

Advertisements