‘বুলিংয়ের শিকার’ হয়ে মাস্টার্স না করেই অনেকে বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়েন

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় অনেক শিক্ষার্থী বুলিংয়ের শিকার হয়। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীরা। আর সহপাঠীদের মাধ্যমেই বেশিরভাগ বুলিংয়ের শিকার হয়। দিন দিন বুলিং-গসিপের মতো মানসিক হয়রানির ভয়াবহতা বেড়েই চলছে। কিন্তু অনেক শিক্ষার্থীরাই কোনো প্রতিকার পাননা। অনেকের অভিযোগ নারীর প্রতি যৌন হয়রানিকে যতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়, এ নিয়ে লোকজনকে যতটা প্রতিবাদী হতে দেখা যায়, বুলিং-গসিপের মতো মানসিক হয়রানি-পীড়নের ক্ষেত্রে তা দেখা যায় না।
বুলিংয়ের শিকার হয়ে অনেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু কোনোরকম অনার্স শেষ করে। মাস্টার্স অনেকেই না করে চাকরিতে যোগ দেন নয়তো বিদেশ পাড়ি জমান, সেখানে উচ্চশিক্ষার জন্য যান। যৌন হয়রানি নিয়ে অনেকে কথা বলেন। কিন্তু বুলিং-গসিপের মতো মানসিক হয়রানির ভয়াবহতা ততটা গুরুত্ব পায় না’- এমনটাই বলছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, ‘ঘটনাগুলো আমাকে এত তাড়া করত, আমি কাঁদতাম। আমার ক্লাসে যেতে ইচ্ছে করতো না। তিনি আরও অভিযোগ করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স পড়ার সময় তিনি কিছু সহপাঠীর মাধ্যমে বুলিংয়ের শিকার হয়েছিলেন। কিন্তু কোনো প্রতিকার পাননি তিনি। এমনকি তাঁর এই মানসিক হয়রানির বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় কর্তৃপক্ষের কাছে গুরুত্ব পায়নি। তরুণী বলেন, ‘এটা (বুলিং) সেখানে শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়। অথচ বুলিদের (হেনস্তাকারী) কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স করতে পারি না।’
‘বিশ্ববিদ্যালয়ে আর পড়ব না’
তিনি ২০১৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্সে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ভিন্ন ভিন্ন মানসিকতার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর। তিনি সবার সঙ্গে মেশার চেষ্টা করতেন। তবে কারও সঙ্গেই খুব বেশি ঘনিষ্ঠতা হয়নি। এর মধ্যে একটি গ্রুপ হয়ে ওঠে ‘এলিট’ (প্রভাবশালী)। এই গ্রুপে মূলত ছেলেরাই ছিলেন। তাঁরা পড়াশোনায় ভালো ছিলেন। পারিবারিকভাবে সচ্ছল।
২০২০ সালে করোনা মহামারিকালে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছোট কয়েকটি গ্রুপ তৈরি হয় বলে জানান তিনি। তখনও ফেসবুকে কাউকে না কাউকে নিশানা করে বুলিং করা হতো। কোভিডের পর সরাসরি ক্লাস শুরু হয়। তখনো এসব বুলিং থামেনি। কারো অনুপস্থিতে কথা বলা বা কারো পোশাক নিয়ে কথা বলা এগুলো ছিল সেসময় নিত্যদিনের ঘটনা। এমনকি কেউ কিছু না বললেও তাঁকে দোষারোপ করা হয় বিভিন্নভাবে।এমনকি নারীবিদ্বেষী মন্তব্য করতেন অনেকে। বডি শেমিং, স্লাট শেমিং করতেন।
তিনি বলেন, ‘আমি কতটা অসুস্থ হয়ে যাচ্ছিলাম, বোঝাতে পারব না। মাস্টার্সে ভর্তি হয়ে দুটি ক্লাস করে আর যাইনি। মা–বাবা অবাক হয়েছিলেন। তাঁদের বলেছি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ওদের সঙ্গে আর পড়ব না।’
শিক্ষকের কথা
তরুণীর অভিযোগ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগের শিক্ষক ও তৎকালীন স্টুডেন্ট কাউন্সেলরের সঙ্গে কথা হয় । তিনি বলেন, যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁদের ডেকে তিনি কথা বলেছিলেন। অন্য সহপাঠীদের সঙ্গেও কথা বলেছিলেন। শিক্ষক বলেন, ‘মেয়েটি যে ধরনের অভিযোগ এনেছিল, তা প্রমাণ করা কঠিন। ফলে মেয়েটিকে আমি মানসিকভাবে শক্ত হওয়ার জন্য বুঝিয়েছিলাম’।
বুলিংয়ের মতো হেনস্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁরা ব্যবস্থা নিবেন বলে জানান।। শুরুতে তিনি মেয়েটিকে লিখিতভাবে অভিযোগ দিতে বলেছিলেন। পরে মেয়েটি বিভাগের প্রধানের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু তখন অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের মাস্টার্স পরীক্ষা হয়ে গেছে। তরুণী বলেন, তিনি প্রথম মৌখিক অভিযোগ করেন। পরে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের মাস্টার্স পরীক্ষার পর লিখিত অভিযোগ দেন। তাঁকে বলা হয়েছিল, একটা কমিটি হয়েছে। মাস্টার্সের ফলাফল এখনো প্রকাশিত হয়নি। কর্তৃপক্ষ আন্তরিক হলে এখনো ব্যবস্থা নিতে পারে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, মৌখিক অভিযোগ যখন করেছিলেন, তখন সেটাকে আমলে নেওয়া হয়নি। ফলে হেনস্তাকারীরা নিজেদের আরও ক্ষমতায়িত বোধ করেছেন। তাঁদের কোনো অনুতাপ হয়নি। তাঁরা নিজেদের অপরাধ ঢাকতে বিভিন্ন বিষয় সামনে নিয়ে আসেন।
৫ শতাংশ শিক্ষার্থী সহপাঠীদের আচরণে হীনম্মন্যতায় ভোগে
২০২২ সালের অক্টোবরে বেসরকারি সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশন ‘করোনা-পরবর্তী বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর একাডেমিক চাপের প্রভাব এবং তাদের আত্মহত্যার প্রবণতা’ শীর্ষক জরিপের প্রতিবেদন প্রকাশ করে। জরিপে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মাদ্রাসার মোট ১ হাজার ৬৪০ জন শিক্ষার্থী অংশ নেন। এর মধ্যে নারী শিক্ষার্থী ৫৬ শতাংশ। জরিপে উঠে আসে সহপাঠীদের দ্বারা তুচ্ছতাচ্ছিল্যের কারণে হীনম্মন্যতায় ভোগেন প্রায় ৫ শতাংশ শিক্ষার্থী।
২০২২ সালের মার্চে ‘তরুণীদের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট এবং মানসিক স্বাস্থ্যে এর প্রভাব’ শিরোনামে আরেকটি জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করে তাঁরা। এই জরিপে এক হাজারের বেশি তরুণী অংশ নিয়েছিলেন। এতে দেখা যায়, তরুণীরা তাঁদের দেহের আকৃতি, গঠন ও অবয়ব নিয়ে কথাবার্তায় হেয়প্রতিপন্ন বোধ করেন। বন্ধুবান্ধবের কাছে ‘বডি শেমিং’-এর শিকার হয়েছেন ২২ শতাংশ তরুণী।
২০২১ সালে পোল্যান্ডের ম্যানেজমেন্ট সাময়িকীতে প্রকাশিত ‘কনসিকোয়েন্সেস অব বুলিং অন ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস ইন বাংলাদেশ’ (বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর বুলিংয়ের পরিণতি) শীর্ষক এক গবেষণায় উঠে আসে, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বুলিং হয়। বুলিং প্রতিরোধে শিক্ষার্থীদের তাঁদের অধিকার সম্পর্কে জানা, অভিযোগ করার বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী হওয়া, অন্যদের সচেতন করা, পরিবারকে ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়ানো, শিক্ষকসহ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ভুক্তভোগীকে সহায়তা দেওয়াসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গবেষণা প্রতিবেদনে জোর দেওয়া হয়।
‘গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত বুলিংয়ের অভিযোগ’
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে সেল গঠন করা উচিত। যৌন পীড়নের ঘটনায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু বুলিংয়ের বিরুদ্ধে সেভাবে কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না। বুলিংয়ের মতো ঘটনায় ভুক্তভোগীর মধ্যে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, ক্লাসে যেতে ভয় পাওয়া, মানসিকভাবে দুর্বল বোধ করা, হীনম্মন্যতা, এমনকি অপরাধবোধে ভোগার মতো প্রবণতা দেখা যায়। কারও কারও ক্ষেত্রে নিজের ক্ষতি করা বা আত্মহত্যায় ঝুঁকতে দেখা যায়। এ কারণে কেউ বুলিংয়ের অভিযোগ করলে তা গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যদিকে ভুক্তভোগীকে কাউন্সেলিংয়ের মতো মানসিক সহায়তা দেওয়া উচিত। ভুক্তভোগীরা যেন বিনা মূল্যে মানসিক সহায়তা পায় সে ব্যবস্থা নিতে হবে।



