শৈশবে প্রযুক্তির ছোঁয়া চিরতরে বদলে দিবে মানসিক স্বাস্থ্য

প্রযুক্তি আমাদের সভ্যতার বড় অর্জন। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট আর ডিজিটাল দুনিয়া জীবনকে সহজ করেছে। কিন্তু এর নেতিবাচক দিকও কম নয়। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে। এখন অনেক পরিবারে ছোট্ট শিশুকে খাওয়ানোর সময় হাতে মোবাইল দিয়ে কার্টুন দেখানো হয়। পরে নিরাপত্তা, পড়াশোনা বা অন্য প্রয়োজনে তার হাতেই তুলে দেওয়া হয় একটি ফোন। কিন্তু গবেষণা বলছে, খুব অল্প বয়সে স্মার্টফোন হাতে পাওয়া শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হতে পারে।
সম্প্রতি জার্নাল অব হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ক্যাপাবিলিটিজ-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ১৩ বছরের আগেই স্মার্টফোন পেয়েছে, তাদের প্রাপ্তবয়স্ক বয়সে মানসিক সমস্যার ঝুঁকি অনেক বেশি। উদ্বেগ, আত্মমর্যাদা কমে যাওয়া, আবেগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা, এমনকি আত্মহত্যার চিন্তা পর্যন্ত দেখা যায় এদের মধ্যে। স্প্যানিয়ান ল্যাবসের (Sapien Labs) গবেষকেরা বিশ্বের লাখো তরুণের মানসিক স্বাস্থ্য বিশ্লেষণ করে বলছেন, ছোটবেলায় ফোন পাওয়া মানে বড় হয়ে মানসিকভাবে আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠা।
শিশুদের হাতে দ্রুত পৌঁছে যাচ্ছে স্মার্টফোন। যুক্তরাষ্ট্রে ১২ বছরের নিচের প্রায় ১৭% শিশু ইতিমধ্যেই স্মার্টফোন ব্যবহার করছে। বিশ্বব্যাপী ৮–১২ বছর বয়সী অর্ধেকেরও বেশি শিশুর হাতে আছে একটি ফোন।বেশির ভাগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ১৩ বছরের নিচে ব্যবহার নিষিদ্ধ বললেও বাস্তবে এই নিয়ম মানা হয় না। ফলে ছোট বয়সেই তারা সাইবার বুলিং, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম, ঘুমের ব্যাঘাত ও পারিবারিক যোগাযোগে দুর্বলতার শিকার হচ্ছে। এগুলো ভবিষ্যতে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে আরও নাজুক করে তুলছে।

গবেষণা বলছে, মেয়েরা অল্প বয়সে ফোন হাতে পেলে তাদের আত্মবিশ্বাস, আত্মসম্মান ও আবেগ নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। ছেলেদের ক্ষেত্রেও সমস্যা দেখা দেয়। তবে তা তুলনামূলকভাবে আচরণগত ও নিয়ন্ত্রণহীন আবেগের দিকেই বেশি।
অভিভাবকদের করণীয়না বলতে শিখতে হবে – শিশু যদি ফোন চাই, তখন সবসময় হ্যাঁ বলাই সমাধান নয়।
বিকল্প তৈরি করুন – পারিবারিক সময়, বই পড়া, খেলাধুলা এগুলো প্রযুক্তির বিকল্প হতে পারে।খোলামেলা আলোচনা করুন – সন্তানকে বোঝান কেন প্রযুক্তির সীমাবদ্ধ ব্যবহার দরকার।
নীতিনির্ধারকদের করণীয়
- স্মার্টফোন ব্যবহারে বয়সসীমা নিশ্চিত করার আইন দরকার।
- স্কুলপর্যায়ে প্রযুক্তি ব্যবহারের শিক্ষা ও সচেতনতা জরুরি।
- সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিকে আরও কঠোর বয়স যাচাই ও কনটেন্ট ফিল্টারিং করতে হবে।
প্রযুক্তি আমাদের জীবনের অংশ, সেটি বদলানো যাবে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ‘আমরা কি সন্তানদের খুব অল্প বয়সেই প্রযুক্তির বন্দি করে তুলছি?’ ১৩ বছরের আগেই স্মার্টফোন হাতে পাওয়াটা এখন সাধারণ ব্যাপার মনে হলেও এর প্রভাব মোটেও সাধারণ নয়। এটি শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ, আত্মপরিচয় আর আবেগীয় স্বাস্থ্যে গভীর দাগ রেখে যাচ্ছে। তাই এখনই সচেতন হওয়ার সময়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে হলে প্রযুক্তির ব্যবহারে সীমা টানা জরুরি।



