বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবুধবার, ২০ মে, ২০২৬
স্পটলাইট

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষক কম, তবে কি মাতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শিশুরা?

motamot

শিক্ষার মাধ্যমে শুধু জ্ঞান অর্জনই নয় মানুষের মেধা, মনন, নৈতিকতা ও চরিত্র গঠনের প্রধান ভিত্তি। কোমলমতি শিশুদের শিক্ষাজীবনের শুরুতেই যে শিক্ষা দেওয়া হয় তার প্রভাব থেকেই যায়। তাই শিশুদের শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে কেবল পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মাতৃস্নেহের মতো মমতাপূর্ণ আবহ তৈরি করতে হবে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, শিশুদের শেখার প্রতি আগ্রহ বাড়ে তখনই যখন তাঁর মনে নিরাপত্তা ও ভালোবাসার অনুভূতি সৃষ্টি হয়। তখন তারা পাঠ্যবইকে চাপ হিসেবে নয়; বরং আনন্দের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করে। ফলে তাদের কৌতূহল ও জানার আগ্রহ বেড়ে যায়।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, সরকার ২০১৯ সালের প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালায় নারী শিক্ষকের সংখ্যা ৬০ শতাংশ যুক্ত করে কারণ, পরিবারের বাইরে প্রত্যেক শিশু শিক্ষা লাভ করবে তার মাতৃভাষায় এবং মাতৃস্নেহে আর এটা সম্ভব নারী শিক্ষকদের মাধ্যমে। তখন নারী শিক্ষকের শিক্ষাগত যোগ্যতা উচ্চ মাধ্যমিকে উন্নীত করা হয়। এর আগে প্রাথমিকে নারী শিক্ষকের ছিল ৪০ শতাংশ এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা ছিল মাধ্যমিক। এ সিদ্ধান্তের ফলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষকদের অংশগ্রহণ বাড়ে।

প্রাথমিক শিক্ষায় শিশুদের এনরোলমেন্ট প্রায় ৯৯ শতাংশ। গত ২৯ আগস্ট জারি হওয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা ২০২৫ প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তির এ গতিকে থমকে দিতে পারে। নতুন নিয়মে নারীদের ৬০ শতাংশ কোটা বাতিলসহ, পুরুষ ও পোষ্য– সব কোটা বাদ দেওয়া হয়েছে। কেবল ৭ শতাংশ কোটা রাখা হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের প্রার্থীদের জন্য। আর সম্পূর্ণ মেধার ভিত্তিতে বাকি ৯৩ শতাংশ নিয়োগ হবে। তবে নারী কোটা বাতিল হওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৬৫ হাজার ৫৬৫টি ও সেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ কোটি ৭১ লাখের বেশি এবং শিক্ষক প্রায় ৩ লাখ ৬৩ হাজার। তাদের মধ্যে নারী ২ লাখ ৩৫ হাজার; পুরুষ ১ লাখ ২৭ হাজার। সার্বিকভাবে নারী শিক্ষক বেশি হলেও চর, হাওর ও পাহাড়ি অঞ্চলে এখনও নারীর উপস্থিতি কম। আর সর্বশেষ নিয়োগে মোট উত্তীর্ণ প্রার্থীর মধ্যে নারী ছিলেন মাত্র ৪৭ শতাংশ, পুরুষ ৫৩ শতাংশ। 

বিশ্বব্যাপী প্রাথমিক পর্যায়ে নারী শিক্ষকের হার ৬৮ শতাংশ। কারণ ছোট শিশুদের সঙ্গে স্নেহ, ধৈর্য, যোগাযোগকেন্দ্রিক শিক্ষণ দক্ষতা এখানে মুখ্য- ইউনেস্কোর সাম্প্রতিক জেন্ডার ব্রিফের তথ্য অনুযায়ী। কিন্তু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৬০ শতাংশের বেশি নারী শিক্ষক নিয়োগের বিধি থাকলেও তা মানা হয়না।

২০২০ সালের নিয়োগে মাত্র ৪৭ শতাংশ নারীকে চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ করা হয়েছে। ৫৩ শতাংশ ছিলেন পুরুষ শিক্ষক। অথচ তখন পুরুষ শিক্ষকের কোটা ছিল ২০ শতাংশ আর পোষ্য কোটা ২০ শতাংশ। সে সময়ের পরিসংখ্যান অনুসারে, দেশের ৬১ জেলার মধ্যে ৫৫ জেলাতেই নারী কোটা পূরণ হয়নি। পূরণ হয়েছে মাত্র ছয়টি জেলায়।

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রাথমিক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার মানোন্নয়নে একটি পরামর্শ কমিটি গঠন করা হয়েছিল যেখানে প্রাথমিকের শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনায় নারী শিক্ষককে অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য সুপারিশ করা হয়েছিল। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদের নেতৃত্বাধীন এ কমিটি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তাদের প্রতিবেদন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়। কিন্তু নতুন প্রজ্ঞাপনে সেই সুপারিশের প্রতিফলন নেই। 

সরকারের এ সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদও ইতোমধ্যে বলেছে, কর্মক্ষেত্রে নারীর সংখ্যা যখন কমছে, তখন নারী কোটা বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই কাম্য নয়।

ইউনেস্কোর ২০২২ সালের রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, যেসব দেশে প্রাথমিক স্তরে নারী শিক্ষক অর্ধেকের বেশি, সেখানে শিশুর পাঠ্য বোধগম্যতার হার প্রায় ২০ শতাংশ বেশি। ইতোমধ্যে নেপাল ও ভুটানে নারী শিক্ষক বাড়ানোর ফলে বিদ্যালয়গুলোতে ঝরে পড়ার হার অর্ধেকে নেমেছে। অন্যদিকে আফগানিস্তান বা পাকিস্তানের মতো দেশে নারী শিক্ষক কম থাকায় বিদ্যালয়ে শিশুদের অংশগ্রহণও কম।


বাংলাদেশে নারী শিক্ষকের সংখ্যা কম হলে শিশুশিক্ষার মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সরকার চাইলে নারী কোটাকে পুরোপুরি বাতিল না করে অন্তত ৫০ শতাংশে সীমিত রাখতে পারত। এতে একদিকে মেধার প্রতিযোগিতা বজায় থাকত, অন্যদিকে শিশুদের মাতৃস্নেহপূর্ণ পরিবেশও নিশ্চিত হতো। এ ছাড়া চর, হাওর ও পার্বত্যাঞ্চলে বিশেষ কোটায় নারী শিক্ষক নিয়োগ দিলে প্রান্তিক এলাকার শিশুরাও সমান সুযোগ পেত। তাই প্রাথমিক শিক্ষায় নারী শিক্ষক কমিয়ে নয়, বরং বাড়িয়েই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।