বছরে বিশ হাজার আ/ত্মহনন, এক-তৃতীয়াংশই কিশোরী

আমাদের দেশে প্রায়ই আত্মহননের মতো ঘটনা ঘটে থাকে। কিশোর বয়সে নানা হতাশা, বিষণ্নতা এমনকি পরিবারের বিভিন্ন চাপের কারণে কিশোর-কিশোরীরা আত্মহননের পথ বেছে নেয়। তবে কিশোরীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার সবচেয়ে বেশি। গ্রামে এ হার বেশি দেখা যায়। ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোরীদের মধ্যে এ ধরনের প্রবণতা বেশি দেখা যায়।
সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশের (সিআইপিআরবি) এক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর গড়ে ২০ হাজার ৫০৫ জন আত্মহত্যা করেন। তাদের মধ্যে ৩৫ দশমিক ৪ শতাংশ কিশোরী। সিআইপিআরবির জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ২৩ হাজার ৮৬৮ জন আত্মহত্যা করেছিল, যা প্রতি লাখে ছিল ১৪ দশমিক ৭ জন। সর্বশেষ জরিপে প্রতি লাখে আত্মহত্যার হার ১২ দশমিক ৪ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিশোর-কিশোরীদের নানা কারণে হতাশা তৈরি হয়, যা থেকে বিষণ্নতা দেখা দিতে পারে। যথাসময়ে চিকিৎসা বা কাউন্সেলিং করা না হলে বিষণ্নতা আত্মহত্যার দিকে যেতে পারে। সিআইপিআরবির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক এ কে এম ফজলুর রহমান বলেন, দেশে আত্মহত্যার প্রবণতা হয়তো আগের চেয়ে কিছুটা কমেছে। তবে এখনও বহু মানুষ আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে। কিশোরীদের আত্মহত্যা প্রতিরোধে সম্মিলিত উদ্যোগ ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) মনোরোগ বিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সালাহউদ্দিন কাউসার বিপ্লব বলেন, বিশ্বে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার সবচেয়ে বেশি। তাঁরা ব্যর্থতা মোকাবিলা করার শিক্ষা অনেক সময় পরিবার ও সমাজ থেকে পায় না। একটুতেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। ফলে তাঁরা আত্মহননের পথ বেছে নেয়।
গতকাল মঙ্গলবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক ড. ক্যাথরিন বোহেম বলেন, আত্মহত্যা প্রতিরোধযোগ্য। এজন্য সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। ব্যক্তিগত সংকট মোকাবিলার চেয়ে সম্মিলিত সংকট নিরসন করা জরুরি। নীরবতা ও লজ্জার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে বোঝাপড়া এবং সহমর্মিতার পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রতিবছর দুই লাখ ৮ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে। আত্মহত্যা প্রতিরোধে সংস্থাটি চারটি সুপারিশ প্রস্তাব করেছে। এগুলো হলো-
- আত্মহত্যা পদ্ধতির (বিষ, অস্ত্র) সহজপ্রাপ্যতা সীমিত করা।
- আত্মহত্যা নিয়ে গণমাধ্যমে দায়িত্বশীল প্রতিবেদন করা।
- কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের দক্ষতা গড়ে তোলা।
- আত্মহত্যা ও আত্ম-আঘাতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের দ্রুত চিহ্নিত করে সহায়তার ব্যবস্থা করা।
এ ধরনের প্রবণতা গ্রামে বেশি
সিআইপিআরবি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, শহরের তুলনায় গ্রামে এ হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। শহরে ৭ দশমিক ৯২ শতাংশ আত্মহত্যার পথ বেছে নিলে গ্রামে এ হার ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। গ্রামে বেকার জনগোষ্ঠীর মধ্যে আত্মহত্যার হার সবচেয়ে বেশি।
জরিপে বলা হয়েছে, ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোরীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার প্রতি লাখে ৩৫ দশমিক ৪ শতাংশ। ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের মধ্যে এ হার ২৮ শতাংশ। ২৫ থেকে ৩৯ বছর বয়সীদের মধ্যে ১৭ দশমিক ২ ও ৪০ থেকে ৬০ ঊর্ধ্বদের মধ্যে ১৬ দশমিক ২ এবং ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ৯ দশমিক ৬ শতাংশ। আত্মহত্যার পদ্ধতি হিসেবে তাঁরা বেছে নিচ্ছে গলায় ফাঁস ও বিষপান। গলায় ফাঁস দেওয়ার হার ৫০ দশমিক ৯ শতাংশ এবং এর পর বিষপানের হার ৪১ দশমিক ৮ শতাংশ।
আত্মহত্যা প্রতিরোধে করণীয়
অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি নজর দেওয়া। তাদের সঙ্গে সময় কাটানো ও অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া। সময়মতো সঠিক সেবা দেওয়া গেলে আত্মহত্যার মত ঘটনাগুলো প্রতিরোধ করা সম্ভব। কিশোরীদের মধ্যে যেহেতু এ হার বেশি তাই তাঁদের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। কেননা কিশোরীদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা কম। অনেক সময় তারা ছোটখাটো মানসিক উদ্বেগকে গুরুত্ব দেয় না। ফলে বড় ধরনের মানসিক সংকটে আত্মহননের পথ বেছে নেয়। এজন্য স্কুল পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা চালু এবং শিক্ষকদের এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। আত্মহত্যা প্রতিরোধ বিভিন্ন ধরনের প্রচারণা চালাতে হবে। তবে এ বিষয়ে পরিবারের মানুষদেরকে সবচেয়ে বেশি সচেতন হতে হবে পাশাপাশি সমাজের মানুষকেও সচেতন হতে হবে।



