বাংলাদেশে গর্ভকালীন ও প্রসবোত্তর নারীদের মধ্যে বাড়ছে বিষণ্ণতা

বাংলাদেশে নারীরা মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি। গর্ভাবস্থা ও সন্তান জন্মের সময়কাল একজন নারীর জীবনে শারীরিক ও মানসিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে নারীরা শুধু শারীরিক চাপই নয়, মানসিক চাপ ও আবেগের টানাপোড়েনেও ভোগেন। সম্প্রতি আইসিডিডিআর,বি–র অ্যাডসার্চ প্রকল্প পরিচালিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য— দেশের অন্তঃসত্ত্বা ও প্রসবোত্তর সময়ে থাকা ৭৭ শতাংশ নারী বিষণ্নতা কিংবা উদ্বেগজনিত সমস্যায় আক্রান্ত। আরও ভয়াবহ হলো, **৬৬ শতাংশ নারী একইসঙ্গে দুটি সমস্যার মধ্য দিয়েই যাচ্ছেন।
বৈশ্বিক চিত্র
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (২০২১) হিসাবে বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ৯৭ কোটি মানুষ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতেই এই সংখ্যা প্রায় ২৪ কোটি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অঞ্চলের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে।
বাংলাদেশের পরিস্থিতি
২০১৯ সালের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপে দেখা গেছে, ১৯ শতাংশ মানুষ মানসিক রোগে আক্রান্ত। নারীদের সংখ্যা পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি। অথচ দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো অত্যন্ত সীমিত—
- মানসিক চিকিৎসক (Psychiatrist) মাত্র ২৬০ জন
- ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞানী মাত্র ৫৬৫ জন
তাদেরও বেশিরভাগ শহরে অবস্থান করেন, ফলে গ্রামের সাধারণ মানুষের জন্য এ সেবা কার্যত অপ্রাপ্য।
গবেষণার পদ্ধতি ও ফলাফল
২০২২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৩ সালের জুলাই পর্যন্ত দেশের সাতটি জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে ৭,৫০০ জন মানুষের ওপর গবেষণা চালানো হয়। এর মধ্যে ৫,৬০০ জন ছিলেন নারী।
গবেষণায় দেখা গেছে—
- বিষণ্ন নারীদের সাধারণ লক্ষণ ছিল: দুঃখবোধ, ঘুমের সমস্যা, কাজের আগ্রহ হারানো, খাবারে অরুচি, আত্মদোষারোপ, মনোযোগের অভাব ও আত্মহত্যার চিন্তা।
- উদ্বেগে ভোগা নারীদের সমস্যা ছিল: স্নায়বিক অস্থিরতা, ভয়, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা ও নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কা।
ওয়েলবিং সেন্টারের ভূমিকা
অ্যাডসার্চ প্রকল্পের উদ্যোগে মনস্বাস্থ্য কেন্দ্র বা ওয়েলবিং সেন্টার চালু করা হয়। এখানে অন্তঃসত্ত্বা ও প্রসূতি নারীরা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মনোবিজ্ঞানী ও চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শের সুযোগ পান। গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, কয়েক দফা কাউন্সেলিং নেওয়ার পর নারীদের মানসিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।
প্রজনন বয়সী নারীদের মানসিক স্বাস্থ্য
বিডিএইচএস (২০২২)-এ প্রথমবার মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক মডিউল যুক্ত হয়। এতে দেখা যায়, ২০ হাজার ২৯ জন নারীর মধ্যে—
- ৪% মাঝারি থেকে তীব্র উদ্বেগে আক্রান্ত
- ৫% মাঝারি থেকে তীব্র বিষণ্নতায় ভুগছেন
বিশেষ করে খুলনা, রংপুর ও সিলেটের মতো দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলে নারীদের মধ্যে এ হার বেশি।
কিশোরীদের ঝুঁকি
বাংলাদেশ অ্যাডোলেসেন্ট হেলথ অ্যান্ড ওয়েলবিইং সার্ভে (২০১৯–২০২০) অনুসারে, ৪,৯৮৪ জন কিশোরীর মধ্যে—
- ৮% গত এক বছরে সাইবার বুলিংয়ের শিকার
- ১২% তীব্র বিষণ্নতায় আক্রান্ত
গবেষকরা জানিয়েছেন, সাইবার বুলিং কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে।
বিশেষজ্ঞদের মত
গবেষণা প্রকাশ অনুষ্ঠানে একাধিক বিশেষজ্ঞ মত দিয়েছেন—
- অধ্যাপক ডা. সায়েবা আক্তার: মানসিক স্বাস্থ্যকে শারীরিক স্বাস্থ্যের সমান গুরুত্ব না দিলে নারীরা আরও ঝুঁকিতে পড়বেন।
- স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কাজী দেলোয়ার হোসেন: মেন্টাল হেলথ অ্যাক্ট বাস্তবায়ন জরুরি।
- এনসিডিসি লাইন ডিরেক্টর ডা. সৈয়দ জাকির হোসেন: বাজেট বৃদ্ধি ও ইউনিয়ন–উপজেলা পর্যায়ে সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
- ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ মেন্টাল হেলথ-এর পরিচালক ডা. মাহবুবুর রহমান: ৬০০ উপজেলা ডাক্তারকে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
- কানাডার ফার্স্ট সেক্রেটারি এডওয়ার্ড ক্যাবেরা: প্রত্যেক নারী যেন মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা পান, কানাডা সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।
বাংলাদেশে অন্তঃসত্ত্বা ও প্রসবোত্তর নারীদের মানসিক স্বাস্থ্য একটি বড় সংকট হিসেবে ধরা দিচ্ছে। অ্যাডসার্চ প্রকল্পের ওয়েলবিং সেন্টার মডেল ইতিমধ্যে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। তবে এটিকে সীমিত পরিসর থেকে বের করে জাতীয় পর্যায়ে সম্প্রসারণ করতে হবে। কারণ সুস্থ প্রজন্ম গঠনে মায়েদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা ছাড়া বিকল্প নেই।



