বিবিএস জরিপ: নারীর অবৈতনিক শ্রমের আর্থিক মূল্য ৫ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা

‘আনপেইড হাউজহোল্ড প্রোডাকশন স্যাটেলাইট অব অ্যাকাউন্টস’ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে নারী ও পুরুষরা যে অদৃশ্য শ্রম প্রতিদিন দিয়ে যাচ্ছেন, তার আর্থিক মূল্য ২০২১ সালে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন বা ৬ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। দেশের মোট জিডিপির প্রায় ১৮ দশমিক ৯ শতাংশের সমান। আর নারীদের এই অবৈতনিক কাজের মূল্য ৫ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা বা ৮৫ শতাংশ।
মঙ্গলবার (৯ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) অডিটরিয়ামে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দৈনিক একজন নারী ৫ দশমিক ৯ ঘণ্টা আনপেইড কাজ করেন। যা পুরুষের তুলনায় ৭ দশমিক ৩ গুণ বেশি। সময় ব্যবহার জরিপ ২০২১ এবং শ্রমশক্তি জরিপ ২০২২-এর তথ্য বিশ্লেষণ করে এই হিসাব তৈরি হয়েছে বলে জানা যায়।
প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন বিবিএসের উপপরিচালক আসমা আখতার। এছাড়াও ইউএন উইমেনের নুবাইরা জেহেন ‘কেয়ার ক্যালকুলেটর’ নামের সরঞ্জাম ব্যবহার করে দেখান, একজন মানুষ প্রতিদিন কতটা সময় অবৈতনিক কাজে ব্যয় করেন।
রান্না, কাপড় ধোয়া, ঘর গোছানো, শিশু ও বৃদ্ধের যত্ন নেওয়া কিংবা অসুস্থের সেবা এমন অসংখ্য কাজের ওপরই ভর করে চলে পরিবার ও সমাজ। তবু এতদিন এই কাজগুলো দেশের অর্থনীতির খাতায় যোগ হয়নি। বিবিএস জানায়, নতুন এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো নারীর এই অদৃশ্য শ্রমের অর্থনৈতিক গুরুত্ব জাতীয় পরিসংখ্যানে ধরা হলো।
নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমিন এস. মুর্শিদ বলেন, নারীর শ্রম দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতির ছায়ায় ছিল। আজকের এই প্রতিবেদন সেই অমূল্য অবদানকে দৃশ্যমান করলো।
বাংলাদেশে বছরে নারী ও পুরুষের গড়ে প্রায় ২,৪৩৫ ঘণ্টা অবৈতনিক গৃহস্থালী ও যত্নমূলক কাজে ব্যয় হয়। যার মধ্যে ৭৯ শতাংশ সময় অবৈতনিক গৃহস্থালী কাজে এবং বাকিটা অবৈতনিক যত্নমূলক কাজে ব্যয় করে থাকে। অবৈতনিক গৃহস্থালী ও যত্নমূলক কাজের মোট সময়ের মধ্যে ৮৮ শতাংশ সময় নারীরা ব্যয় করে থাকে। এক্ষেত্রে, অবৈতনিক গৃহস্থালী কাজের মধ্যে ৮৯ শতাংশ এবং যত্নমূলক কাজের ৮৬ শতাংশ সময় নারীরা ব্যয় করে থাকে। লিঙ্গ এবং প্রকারভেদে, ২০২১ সালে বাংলাদেশে বার্ষিক মোট সময় ব্যয় এবং ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সী জনসংখ্যার অবৈতনিক কাজে মোট সময় ব্যয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অবৈতনিক কাজকে অর্থনীতির মূলধারায় আনতে কিছু সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে-
- যত্ন খাতকে জাতীয় বাজেট ও উন্নয়ন কৌশলে অগ্রাধিকার দেওয়া।
- আন্তঃমন্ত্রালয় সমন্বয়ে নীতি প্রণয়ন।
- বেসরকারি খাতে পরিবারবান্ধব নীতি গ্রহণ ও যত্ন কেন্দ্রিক চাকরির সুযোগ।
- পাশাপাশি পুরুষ ও ছেলেদেরকে যত্ন ভাগাভাগিতে উৎসাহিত করা এবং নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় নারীর অমূল্য অবদানকে দৃশ্যমান করার মাধ্যমে দেশ এক নতুন দিগন্তে প্রবেশ করলো। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নারীর অদেখা শ্রমের এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যার হিসাব নয়, বরং নীতি ও বাজেটে লিঙ্গ-সংবেদনশীলতা বাড়ানোর এক বড় ভিত্তি। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের প্রধান পরিসংখ্যানবিদ মাহিন্থান জোসেফ মারিয়াসিংহাম ভিডিও বার্তায় এই উদ্যোগকে বাংলাদেশের জন্য একটি অগ্রণী পদক্ষেপ বলে অভিহিত করেছেন।



