বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬
নারী

জাকসু নির্বাচনে নারীর সংকট, বুলিং ও শেমিংয়ের ভয়

WhatsApp Image 2025-09-06 at 3.44.38 PM

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ ৩৩ বছর পর কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) ও হল সংসদের নির্বাচন হতে যাচ্ছে। তবে নির্বাচনে নারী প্রার্থীর উপস্থিতি আশানুরূপ নয়। কেন এমন হলো?

চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থী মোহনা বাশার মনে করেন, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর নারী শিক্ষার্থীদের ওপর যে হারে সাইবার বুলিং ও স্লাট–শেমিং চালানো হয়েছে, তা অনেককে নিরুৎসাহিত করেছে। তাঁর ভাষায়, “একজন নারী নির্বাচনে অংশ নিলে তাঁকে কতটা হুমকি বা হয়রানি সহ্য করতে হবে, সেটি ভেবেই অনেকে পিছিয়ে যান।”

সংখ্যা কমার বাস্তবতা

জাকসুর মোট ২৭টি পদের মধ্যে ছাত্রীদের জন্য ছয়টি, ছাত্রদের জন্য ছয়টি এবং বাকিগুলো সবার জন্য উন্মুক্ত। এবার ১৩টি উন্মুক্ত পদে প্রার্থী হয়েছেন ৯৫ জন—এর মধ্যে নারী মাত্র ১১ জন, অর্থাৎ ১২ শতাংশ। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রায় অর্ধেকই নারী। সহসভাপতি (ভিপি) পদে ১০ জনের মধ্যে কেউ নারী নন, সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদের ৯ জন প্রার্থীর মধ্যে আছেন মাত্র ২ জন নারী।

কেন্দ্রীয় সংসদে ছাত্রীদের জন্য নির্ধারিত ৬ পদে প্রার্থী হয়েছেন ৩৫ জন, আর ছাত্রদের জন্য নির্ধারিত ৬ পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৪৯ জন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০টি ছাত্রী হলে ১৫০টি আসনের মধ্যে ৫৯টিতে কোনো প্রার্থীই নেই। আবার ৬৭টি পদে আছেন মাত্র একজন প্রার্থী।

সব মিলিয়ে জাকসু ও হল সংসদে মোট প্রার্থী ৬৫৬ জনের মধ্যে নারী ১৭৩ জন (২৭ শতাংশ), আর পুরুষ প্রার্থী ৪৮৩ জন (৭৩ শতাংশ)।

কারণগুলো কোথায়

নারী শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা মনে করেন, সাইবার বুলিংয়ের ভয়, ছাত্রসংগঠনের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ, গেস্টরুম সংস্কৃতি, পারিবারিক চাপ, প্রশাসনের নির্লিপ্ততা—এসব কারণেই নারী প্রার্থী কম।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও জাকসু নির্বাচন কমিশনের সদস্যসচিব অধ্যাপক এ কে এম রাশিদুল আলম বলেন, “নারীদের ক্ষমতায়নের জন্য ছয়টি পদ সংরক্ষিত করা আছে। তবে গণ–অভ্যুত্থানে নারীরা সামনে থাকলেও নির্বাচনে সেই অনুপাতে প্রার্থী পাওয়া যায়নি। সাইবার বুলিংয়ের কারণে অনেকেই নিরুৎসাহিত হচ্ছে, সেটি অস্বীকার করার উপায় নেই।”

প্যানেলে নারীদের অবস্থান

এবারের নির্বাচনে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন নিজেদের প্যানেল ঘোষণা করেছে। ছাত্রশিবিরের প্যানেলে নির্ধারিত ছয়টি আসনের বাইরে কোনো নারী নেই। গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ (বাগছাস) নারীদের জন্য নির্ধারিত আসনের বাইরে আরও দুজন নারী প্রার্থী দিয়েছে। ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলে জিএস পদে একজন নারীকে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে বামপন্থী সংগঠনগুলোর ঘোষিত ‘সম্প্রীতির ঐক্য’ প্যানেলে সর্বোচ্চ ১১ জন নারী রয়েছেন, তবে শীর্ষ পদ দুটিতে নেই কোনো নারী।

এবার জাকসুতে মোট ভোটার ১১ হাজার ৯১৯ জন। এর মধ্যে প্রায় ৪৯ শতাংশই নারী। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রক্রিয়াতেও অর্ধেক আসন ছাত্রীদের জন্য সংরক্ষিত, কিন্তু নির্বাচনে প্রার্থীর সংখ্যা সেই হারে বাড়েনি।

নারীর অংশগ্রহণে পশ্চাদপসরণ

জাহাঙ্গীরনগরের ইতিহাসে নারীরা সবসময় আন্দোলনের সম্মুখভাগে থেকেছেন। ১৯৯৮ সালের ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন হোক বা ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থান—নারীরা নেতৃত্ব দিয়েছেন। অথচ সংসদ নির্বাচনে তাঁদের অংশগ্রহণ আশানুরূপ নয়।

১৬ জন নারী শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেকেই সাইবার বুলিং, সাংগঠনিকভাবে ‘মাইনাস’ করার রাজনীতি এবং পারিবারিক চাপকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন। সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সোহাগী সামিয়া বলেন, “গণ–অভ্যুত্থানে নারীরা সামনে থাকলেও পরবর্তীতে তাঁদের সামাজিকভাবে হেয় করা হয়েছে। আবার অনেক সংগঠনেই নারীদের বাদ দেওয়ার প্রবণতা আজও বিদ্যমান।”

ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক নাহরিন ইসলাম খান মনে করেন, আন্দোলনে নারীরা প্রায়ই ‘ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার হন। তাঁর ভাষায়, “নারীরা সামনের সারিতে থাকলে আক্রমণ ঠেকানো সহজ হয়। কিন্তু আন্দোলনের সফলতার পর তাঁরা আড়াল হয়ে যান।”

ছবি: শুভ্র কান্তি দাশ