বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনমঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬
স্পটলাইট

নারীদের চাকরি হারানো, শ্রমবাজারে নতুন সংকট

WhatsApp Image 2025-09-06 at 3.38.47 PM

বাংলাদেশের শ্রমবাজারে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) প্রায় ২১ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছেন, যার মধ্যে ১৮ লাখই নারী। অর্থাৎ চাকরি হারানোদের মধ্যে ৮৫ শতাংশেরও বেশি নারী। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউএন উইমেন যৌথভাবে প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কর্মসংস্থানের সংকোচন শুধু পারিবারিক আয়ের ওপর নয়, দারিদ্র্য ও বৈষম্যের ঝুঁকিও বাড়িয়ে তুলছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও সেবা খাত—যেখানে নারীদের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি—সে খাতে চাকরি হারানো সামগ্রিক অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলছে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নারী শ্রমশক্তি অংশগ্রহণে বাংলাদেশ সবচেয়ে পিছিয়ে। নেপালে এ হার ৫০ শতাংশের কাছাকাছি, ভুটানে ৫৮ শতাংশ, অথচ বাংলাদেশে মাত্র ৩৭ শতাংশ। ফলে নারী কর্মসংস্থানে ধস নামলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, “তৈরি পোশাক, কৃষি, সেবা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোগে নারীদের অবদান দেশের প্রবৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে শ্রমবাজারে নারীরা ভয়াবহ সঙ্কটে পড়েছেন, যা লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের কঠিন বাস্তবতাকেই স্পষ্ট করছে।”

গার্মেন্টস খাতে বাস্তব চিত্র

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে প্রায় ৩০ লাখ নারী কর্মরত। তবে বৈশ্বিক অর্ডার কমে যাওয়ায় অনেকেই চাকরি হারাচ্ছেন বা কম বেতনে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।

গাজীপুরের জেসমিন আক্তার (২২) হঠাৎ চাকরি হারান গত নভেম্বরে। আগে মাসে ১২ হাজার টাকা আয় করতেন, এখন একটি ছোট কারখানায় ৮ হাজার টাকা মজুরিতে কাজ করছেন। তাঁর কথায়, “এই টাকায় বাসা ভাড়া, মায়ের ওষুধ আর নিজের খরচ মেটানোই কষ্টকর হয়ে পড়েছে।”

শিল্পী নামের আরেক শ্রমিক মালিকপক্ষের অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় চাকরি হারিয়েছেন এবং কালো তালিকাভুক্ত হয়েছেন। এ ধরনের অভিজ্ঞতা নারীদের কর্মক্ষেত্রে অরক্ষিত অবস্থাকেই সামনে আনে।

গার্মেন্টস শ্রমিক ফ্রন্টের হিসাব অনুযায়ী, গত এক বছরে প্রায় এক লাখ নারী শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন, যাদের অধিকাংশই বিকল্প কর্মসংস্থান খুঁজে পাননি।

গ্রামীণ অর্থনীতিতেও প্রভাব

শ্রমবাজার থেকে নারীদের ছিটকে পড়া শুধু শহরে নয়, গ্রামেও স্পষ্ট হচ্ছে। কৃষিকাজে মৌসুমি শ্রমিক হিসেবে নারীরা কাজ করলেও আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়ায় তাদের চাহিদা কমছে। সিরাজগঞ্জের রহিমা খাতুনের অভিজ্ঞতা: “আগে ধান কাটার সময় ডাক পড়ত, এখন মেশিনে কাজ হয়ে যায়, আমাদের আর ডাকা হয় না।”

বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপ বলছে, দেশে নারীর শ্রমশক্তি অংশগ্রহণ বর্তমানে প্রায় ৩৭ শতাংশ। মহামারির আগে এ হার সামান্য বেড়েছিল, কিন্তু করোনার পর থেকে ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। যারা এখনও কাজ করছেন তাদের বেশিরভাগই অনানুষ্ঠানিক খাতে—গার্মেন্টস, কৃষি, গৃহকর্ম, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও সেবা খাত। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, এসব খাতেই মন্দার ধাক্কা প্রথম লাগে, তাই নারীরাই বেশি বিপর্যস্ত হন।

মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেমের মতে, “উৎপাদন খাতে সংকোচন হলে সবার আগে নারী শ্রমিকদের ছাঁটাই করা হয়।”

অর্থনীতি ও সমাজে অভিঘাত

অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ কমে গেলে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিও ধীর হয়ে যায়। বিশেষজ্ঞরা হিসাব দিয়েছেন—নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ মাত্র ১ শতাংশ কমলে জিডিপি প্রায় ০.৩ শতাংশ হ্রাস পায়।

ড. সেলিম রায়হান বলেন, “নারীর চাকরি হারানো শুধু ব্যক্তিগত সংকট নয়, বরং পুরো অর্থনৈতিক কাঠামোকেই প্রভাবিত করছে।”
ইনোভেশন ফর ওয়েলবিং ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মনিরা রহমান যোগ করেন, “কাজ নারীর জন্য কেবল আয়ের মাধ্যম নয়, এটি তার আত্মবিশ্বাস, পরিচয় ও মানসিক স্থিতির সঙ্গেও জড়িত।”

করণীয়

অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এখনই জরুরি ভিত্তিতে উদ্যোগ নিতে হবে। এর মধ্যে আছে—

চাকরি হারানো নারীদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন ও পুনঃপ্রশিক্ষণ কর্মসূচি

শ্রমবাজারে নিরাপত্তা, ন্যায্য মজুরি ও উন্নত কর্মপরিবেশ নিশ্চিতকরণ

নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, সরকারি সহায়তা ও বাজারসংযোগ বৃদ্ধি

ড. সেলিম রায়হান বলেন, “শুধু সহানুভূতিশীল নীতি নয়, বাস্তবসম্মত পদক্ষেপই এই সংকট কাটিয়ে ওঠার একমাত্র পথ।”