শ্রীমঙ্গলে বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যবাহী ‘টিকি’

এক সময় শ্রীমঙ্গলসহ মৌলভীবাজারের গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে বহুল ব্যবহৃত ছিল টিকি। খাবারের পর হুক্কায় তামাক সেবন ছিল অনেকের নিত্যদিনের অভ্যাস। সেই হুক্কার মূল উপাদান ছিল এই টিকি। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে আজ সেই টিকি গ্রামবাংলা থেকে প্রায় হারিয়ে গেছে।
গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে এক সময় টিকি তৈরি করে রোদে শুকাতে দেখা যেত। যারা নিজেরা বানাতে পারতেন না, তারা বাজার থেকে কিনে নিতেন। মধ্যবয়সী কিংবা প্রবীণ পুরুষেরা তিনবেলা খাবারের পর হুক্কা না টানলে যেন খাবারের তৃপ্তি পূর্ণ হতো না। কৃষিকাজে ব্যস্ত শ্রমিক কিংবা গৃহকর্তারাও দিনে কয়েকবার হুক্কা টানতেন।
উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের বৃদ্ধ আতাউর রহমান বলেন,“আমার বাবা-দাদাদের হুক্কা টানতে দেখেছি। সেই ধারাবাহিকতায় আমিও এখনো হুক্কা ব্যবহার করি। লতা-পাতা পুড়িয়ে কয়লা তৈরি করে টিকি বানাই। শহর থেকে তামাকপাতা এনে নিজেই খাওয়ার যোগ্য করি।
আশিন্দ্রোন ইউনিয়নের ইউপি সদস্য মকসুদুর রহমান ও শহরের সুরভিপাড়ার বাসিন্দা সেজিম আহমেদ জানান, তাদের বাবা-চাচা ও দাদারা নিয়মিত হুক্কা ব্যবহার করতেন। এখনো তাদের ঘরে পুরনো হুক্কা সংরক্ষিত আছে, তবে আর ব্যবহার করা হয় না।
শহরে এখনো হাতে গোনা কয়েকজন টিকি বিক্রেতা জীবিকা নির্বাহ করছেন। পূর্বাশা এলাকার ঋষিপাড়ার বাসিন্দা পূর্ণিমা ঋষি জানান, তিনি ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে টিকি বিক্রি করছেন। আরেকজন বিক্রেতা প্রমিলা ঋষি দীর্ঘদিন ধরে এ পেশার সঙ্গে যুক্ত।
তারা হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুরের হরষপুর থেকে ৩০ টাকা কেজি দরে টিকি কিনে এনে খুচরা বিক্রি করেন। খরচ বাদ দিয়ে প্রতি কেজিতে ১৫ থেকে ২০ টাকা লাভ হয়। আগে প্রতিদিন কয়েক হাজার টাকার টিকি বিক্রি হতো, এখন দিনে চার-পাঁচশ টাকার বেশি হয় না।

পূর্ণিমা ঋষি আরো বলেন, “আগে হিন্দু-মুসলিম সবাই হুক্কা টানার জন্য টিকি কিনত। এখন কেবল হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা ধর্মীয় উপাসনায় ধূপবাতির জন্য সীমিত পরিমাণ টিকি ব্যবহার করে। অনেকেই এখন আগরবাতি ব্যবহার করছে।”
পূর্ণিমা ঋষি’র সাথে কথা বলতে বলতে, তার কাছ থেকে সদর ইউনিয়নের উত্তরসুর এলাকার সুব্রত দাশ নামের এক যুবক ৪০ টাকার টিকি ক্রয় করলেন। টিকি কি কাজে ব্যবহার করবেন, জানতে চাইলে তিনি জানান, দেবতা ঘরের প্রার্থনায় ধূপবাতিতে ব্যবহারের জন্য নিচ্ছেন।
আজ গ্রামে টিকি তৈরি বা শুকানোর দৃশ্য আর দেখা যায় না। অনেক বাড়িতে হুক্কা থাকলেও তা কেবল সাজসজ্জার জিনিস হয়ে পড়ে আছে। তবুও কয়েকজন প্রবীণ এখনও হুক্কা ও টিকির প্রতি টান অনুভব করেন।
সময়ের পরিবর্তনে বদলে গেছে জীবনযাত্রা, অভ্যাস ও প্রয়োজন। কিন্তু হারিয়ে যাওয়া এই টিকি এখনো গ্রামীণ ঐতিহ্যের একটি স্মৃতিচিহ্ন হয়ে বেঁচে আছে প্রবীণদের স্মৃতিতে আর অল্প কিছু পরিবারের আচার-অনুষ্ঠানে।



