বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈ/ষম্যের শি/কার সবচেয়ে বেশি নারী শিক্ষার্থীরা

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের বড় অংশ এখনো নানাভাবে বৈষম্যের মুখোমুখি হচ্ছেন। আঁচল ফাউন্ডেশনের এক সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, মোট ৪১ দশমিক ৯ শতাংশ শিক্ষার্থী বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। কিন্তু সবচেয়ে আশঙ্কাজনক তথ্য হলো—এই বৈষম্যের বোঝা বহন করছেন নারী শিক্ষার্থীরাই বেশি। বৈষম্যের শিকার শিক্ষার্থীদের মধ্যে নারীর হার ৫১ শতাংশ, পুরুষ ৪৯ শতাংশ।
বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় ও চতুর্থ বর্ষে পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের সম্মুখীন হচ্ছেন। বৈষম্যের মূল ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে শ্রেণিকক্ষ এবং পরীক্ষা।
বৈষম্যের ধরন: নারীরাই বেশি ভুক্তভোগী
জরিপে অংশ নিয়েছেন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ হাজার ১৭৩ জন শিক্ষার্থী। এদের মধ্যে নারী শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণই ছিল বেশি—৫৬ দশমিক ৬ শতাংশ। বয়সের হিসাবে বেশিরভাগই ২৩ থেকে ২৬ বছরের মধ্যে।
জরিপে দেখা যায়, প্রায় ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী পরীক্ষার ফলাফলে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের শিকার হয়েছেন প্রায় ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী, আর এই জায়গাতেই নারীদের সংখ্যা বেশি। এছাড়া ধর্মীয় কারণে ১৯ শতাংশ, জাতিগত কারণে ৯ শতাংশ, অর্থনৈতিক কারণে ২৩ শতাংশ, শারীরিক অবয়বের কারণে ২৯ শতাংশ এবং রাজনৈতিক মত পার্থক্যের কারণে ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী বৈষম্যের মুখে পড়েছেন।
শ্রেণিকক্ষ থেকে ইভেন্ট, সর্বত্র বৈষম্য
শিক্ষার্থীরা জানাচ্ছেন, বৈষম্যের প্রধান স্থান হচ্ছে শ্রেণিকক্ষ। ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী বলেছেন, শ্রেণিকক্ষেই তারা বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইভেন্টে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন ৩৭ শতাংশ, হলে ১৯ শতাংশ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ৩১ শতাংশ।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বৈষম্যমূলক আচরণের প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে সহপাঠীরাই (৫৮ শতাংশ)। এরপর শিক্ষকদের কাছ থেকেও (৫৫ শতাংশ) এসেছে বৈষম্যের অভিজ্ঞতা।
নারীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব
বৈষম্যের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে। জরিপ অনুযায়ী, বৈষম্যের শিকার ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
এর মধ্যে ৫৫ শতাংশ বিষণ্নতা, ৪৯ শতাংশ উদ্বেগ, ৪৩ শতাংশ একাকিত্ব এবং ৪১ শতাংশ হীনমন্যতায় ভুগছেন। ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থীর ঘুমের সমস্যা তৈরি হয়েছে, ২২ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন তাদের প্যানিক অ্যাটাক বেড়েছে। এই সমস্যাগুলোতে নারীরাই তুলনামূলকভাবে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন।
মানসিক সমস্যার কারণে ৫১ শতাংশ শিক্ষার্থী ক্লাসে অংশ নিলেও পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখতে পারছেন না।
অভিযোগ করেও সুরাহা নেই
জরিপে দেখা যায়, বৈষম্যের শিকার হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেছেন মাত্র ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী। অথচ এর মধ্যে মাত্র ১১ শতাংশ মনে করেন প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা নিয়েছে।
অন্যদিকে, ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নেই। ফলে বৈষম্যের বোঝা একা বয়ে বেড়াতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের, বিশেষত নারী শিক্ষার্থীদের।
আঁচল ফাউন্ডেশনের সুপারিশ
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আঁচল ফাউন্ডেশন কয়েকটি সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে মেন্টরিং চালু করা,
নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং,
বৈষম্য প্রতিরোধে মনিটরিং টিম গঠন,
প্রতিটি বিভাগে অভিযোগ বক্স রাখা,
ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং সেন্টার চালু করা,
বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা।
জরিপের পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যা নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরকার এক কঠিন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। আর সেই বাস্তবতায় সবচেয়ে বেশি আঘাত আসছে নারী শিক্ষার্থীদের ওপর। শ্রেণিকক্ষ থেকে পরীক্ষা, সহপাঠী থেকে শিক্ষক—সব জায়গায় বৈষম্যের মুখোমুখি হয়ে তাদের পড়াশোনা, মানসিক স্বাস্থ্য, এমনকি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় যখন সমান সুযোগ আর ন্যায়বিচারের জায়গা হওয়ার কথা, তখন সেখানে নারীরা যদি বৈষম্যের শিকার হন, তবে শিক্ষার পরিবেশের মূল ভিত্তিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়



