বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬
স্পটলাইট

কোচিং নির্ভরতা ভেঙে শিক্ষাকে আবার শ্রেণীকক্ষে ফিরিয়ে আনতে হবে

koching

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ঘিরে এখন শুরু হয়েছে নতুন এক বাণিজ্য। কোচিং আর গাইড বইয়ের বাণিজ্য এখন বেড়েই চলছে। স্কুল–কলেজে জোর করে কোচিং করানোর এই চর্চা নতুন কিংবা অভিনব নয়। শিক্ষার্থীরা স্কুল বা কলেজে কোচিং না করলে ক্লাসে তাঁদের অন্য নজরে দেখা হয়। আর পরীক্ষার খাতায় নাম্বার কম দেওয়ার ঘটনা নতুন নয়।

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে এ পর্যন্ত ৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২৮ জনই শিশু। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে এখনও অনেকে। ১১ আগস্ট মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজের নিহত শিক্ষার্থীদের অভিভাবকেরা একটি প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে মাইলস্টোন কলেজসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোচিং ব্যবসা বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। অনেক অভিভাবক তাঁদের সন্তানদের মৃত্যুর জন্য কোচিং ব্যবসাকে দায়ী করেছেন।

বিমান বিধ্বস্ত হয়ে নিহত হয় তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী মারিয়াম উম্মে আফিয়া। তাঁর মা উম্মে তামিমা আক্তার তাঁর মেয়ের মৃত্যুর জন্য কোচিং ব্যবসাকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, আমার বাচ্চাটাকে আমি কখনো কোচিংয়ে দিতাম না। আমার বাচ্চাটাকে দেড় মাস হয়েছে কোচিংয়ে দিয়েছি। কারণ আমার বাচ্চা প্রতিদিনই এসে বলে, “আম্মু, আমি যদি কোচিং না করি, মিসরা আমাকে আদর করেন না।”

প্রায় অনেক অভিভাবকেরা একই অভিযোগ করেন। জোর করে কোচিং করানোর যে অভিযোগ অভিভাবকেরা তুলেছেন বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে খতিয়ে দেখা উচিত। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অনৈতিক চর্চা বন্ধ করা প্রয়োজন। 

প্রাইমারি থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষাটা কোচিং নির্ভর হয়ে পড়েছে। শুধুমাত্র স্কুলের ভিতরেই না বাইরেও এ ধরনের কোচিং নির্ভর বাণিজ্য চলছে। কিছু প্রতিষ্ঠানে ক্লাস ছুটির পর কোচিং বসে। আবার কিছু প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরা কোচিং করান স্কুলের পাশে। ঢাকার এ ধরনের কোচিং গুলোতে সপ্তাহে দু-তিন দিন কোচিং করানো হয়। শিক্ষার্থী প্রতি নেওয়া হয় দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা। এই হিসাবে নবম, দশম, একাদশ ও দ্বাদশ পড়ুয়া বিজ্ঞানের একজন শিক্ষার্থীর জন্য শুধু কোচিং কিংবা প্রাইভেট পড়ার জন্য খরচ হয় মাসে আট থেকে দশ হাজার টাকা। এর সঙ্গে স্কুল-কলেজের বেতন, যাতায়াত, বই-খাতার খরচ যোগ করলে মোট ব্যয় অনেকটাই বেড়ে যায়।    

ইউনেসকোর গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং রিপোর্ট ২০২২ এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের পরিবারগুলোকে মোট শিক্ষা খরচের ৭২ শতাংশ বহন করতে হয়। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে যা সর্বোচ্চ। আর গণসাক্ষরতা অভিযানের ‘এডুকেশন ওয়াচ ২০২৩’ গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক শিক্ষায় (পঞ্চম শ্রেণি) এক শিক্ষার্থীর পরিবারের শিক্ষার গড় বার্ষিক ব্যয় ছিল ২০২২ সালে ১৩ হাজার ৮৮২ টাকা, যা ২০২৩ সালের প্রথম ছয় মাসে ২৫ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৮ হাজার ৬৪৭ টাকা পর্যন্ত পৌঁছায়। মাধ্যমিক শিক্ষায় (নবম শ্রেণি) এক শিক্ষার্থীর গড় বার্ষিক খরচ ছিল ২০২২ সালে ২৭ হাজার ৩৪০ টাকা, যা ২০২৩ সালের প্রথম ছয় মাসে ৫১ শতাংশ বেড়ে প্রায় ২০ হাজার ৭১২ টাকা হয়েছে। এই খরচ বেড়ে যাওয়ার পেছনে প্রাইভেট টিউশন বা কোচিং এবং নোট বা গাইড বই-ই মূলত দায়ী।

একসময় উচ্চশিক্ষা এরপর ধীরে ধীরে উচ্চ মাধ্যমিকেও এই কোচিং বাণিজ্য এসেছে। আবার কোথাও কোথাও এই কোচিং বাণিজ্যের পিছনে অনেক রাজনৈতিক নেতারাও রয়েছে। কারণ তাঁদের আয়ের অন্যতম উৎস কোচিং ব্যবসা। কিন্তু কোচিং বাণিজ্য এভাবে চলতে থাকলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসের দিকে যাবে। শিক্ষা, পাঠ্যপুস্তক, কারিকুলাম সংস্কারের প্রশ্ন এলেই স্বার্থবাদী গোষ্ঠীগুলোর পক্ষ থেকে নানা আপত্তি আসে।

এ বিষয় গুলোর দিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের খেয়াল রাখা উচিত। বিভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করা উচিত। শ্রেণীকক্ষে পাঠদান ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। কারিকুলামের পরিবর্তন আনতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষকদের সম্মানজনক বেতন-ভাতা দিতে হবে। ফলে দেখা যাবে কোচিং নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন হবে। শিক্ষার কোচিং নির্ভর বাণিজ্য থেকে শ্রেণীকক্ষে ফিরিয়ে আনতে হলে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। এজন্য শিক্ষকদের পাশাপাশি অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে।