একজন সুমীর হাত ধরে শত নারীর স্বপ্নপূরণ

এক সময় রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে মাঠে দিন মজুরের কাজ করতেন। এখন নকশি কাঁথা সেলাই করেন। এর মাধ্যমেই জীবিকা অর্জন করেন। শুধু তিনি একা নন সঙ্গে আরও কয়েকজন নিয়ে তিনি এ কাজ করেন। কাঁথার জমিনে সুই-সুতায় রঙিন নকশা ফুটিয়ে তোলার পাশাপাশি শতাধিক নারীর মুখে হাসিও ফুটিয়েছেন তিনি। বলছিলাম সুমী মুর্মুর কথা।
দুই সন্তানের জননী সুমী। নকশি কাঁথা সেলাই করে পরিবারের মুখে হাসি ফুটছে ,অন্যদিকে আয় ও হচ্ছে। পাশাপাশি ‘নারী ও শিশু কল্যাণ সংস্থা’ নামের একটি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা তিনি। শুধু প্রান্তিক নারীদের স্বাবলম্বী করাই নয়, তাঁদের সন্তানদের পড়াশোনার ব্যবস্থাও করেছেন সুমী। চালু করেছেন দুটি স্কুল। সেখানে বিনামূল্যে পড়ছে প্রায় ২০০ শিক্ষার্থী। মাদকাসক্তি, নারী নির্যাতন, বাল্যবিয়ের মতো অন্ধকারের বলয় থেকে তাঁদের বের করার জন্য মুলত তিনি এ উদ্যোগ নেন। অন্যদিকে রাজশাহীর বোয়ালিয়ার কয়েরদাঁড়া খ্রিস্টানপাড়া এবং পবা উপজেলার ভূগরইল গ্রামের মাহালী ও সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মধ্যে শিক্ষার হার খুব কম। বেশির ভাগই অন্যের জমিতে মজুরি দেয়। নারী ও শিশুদের জন্য তিনি এ উদ্যোগ নেন। যাতে করে নারীদের আর অন্যের জমিতে কাজ করতে না হয় আর শিশুরাও যেন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়।
এই উদ্যোগ বদলে দিয়েছে পুরো গ্রাম
সুমীর এই উদ্যোগের ফলে বদলে গেছে রাজশাহীর কয়েরদাঁড়া খ্রিস্টানপাড়া ও ভূগরইল গ্রামের চিত্র। আগে দুই গ্রামের নারীরা সকাল-সন্ধ্যা মাঠে মজুরি খাটতেন। এখন দুই গ্রামে সকালে শিশুরা দলবেঁধে বিদ্যালয়ে যাচ্ছে। নারীরা ঘরের কাজ সামলে বিকেলে কাঁথা নিয়ে বসছেন।
সুমী প্রথমে বিদ্যালয় চালু করেছেন। পরে ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথা শিল্প পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ নিয়েছেন। মহিলা অধিদপ্তরের সহায়তায় নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। প্রয়োজনীয় সব উপকরণ সুমী সরবরাহ করেন। এখন মাসে গড়ে প্রায় ১৫০টি কাঁথা বিক্রি করেন তাঁরা। একেকটির দাম আট শ থেকে আট হাজার টাকা। নকশিকাঁথা বিক্রির একটা অংশ নারীদের মাঝে বণ্টন করেন। আর বাকিটা ব্যয় করেন বিদ্যালয় পরিচালনায়।
এক সময় সেখানকার নারীদের অসুখ হলে ওষুধ কেনার মতো টাকা পয়সা হাতে ছিল না কিন্তু এখন সেখানকার নারীদের চিত্র পুরোটায় বদলে গিয়েছে।
সুমির শিক্ষা জীবন

মাহালী নৃগোষ্ঠীর মেয়ে সুমী। শৈশব ছিল অভাবে ভরা। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। কয়েরদাঁড়া খ্রিস্টানপাড়ার প্রায় সবার বদ্ধমূল ধারণা ছিল, ‘মেয়েরা পরের ঘরে যাবে, পড়া দিয়ে ওদের কী হবে।’ ব্যতিক্রম ছিলেন সুমীর বাবা আলবেট মুর্মু। তিনি চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। কাজ করতেন রাজশাহী ক্যান্টনমেন্টে। ভেতরেই ছিল ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ। কাজের সূত্রে দেখতেন, পিঠে ব্যাগ নিয়ে ইউনিফর্ম পরা ছেলেমেয়েরা ক্লাসে যাচ্ছে। আলবেটও স্বপ্ন দেখতেন, ‘একদিন আমার মেয়েটাও স্কুলে যাবে।’ সুযোগ এলো ১৯৯৬ সালে। ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে সুমী সুযোগ পেলেন ক্যান্টনমেন্ট স্কুলে। সেখান থেকে এসএসসি পর্যন্ত পড়েছেন। সব বই কিনে দেওয়ার সামর্থ্য ছিল না বাবার। পরীক্ষার আগে সহপাঠীর কাছ থেকে বই চেয়ে নিয়ে আসতেন। এভাবে ২০০৬ সালে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে জিপিএ ৪.৫০ পেয়ে এসএসসি পাস করেন। সুমীর পরের গন্তব্য নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজ।
পরিবারের চাপে ২০০৭ সালে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয় তাঁকে। পরে মা হলেন। কিন্তু সুমীর ইচ্ছা ছিল উচ্চশিক্ষা নেওয়ার। শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাঁকে পড়াশোনা করতে দিতে না চাইলেও কিন্তু সুমী নিজ সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। ঘর সামলিয়ে, সন্তানকে ঘুম পাড়িয়ে তবেই পড়ার সুযোগ পেতেন তিনি।
এভাবে এইচএসসি পাস করে রাজশাহী কলেজ থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। এমবিএ করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগ থেকে।
কীভাবে উদ্যোক্তা হলেন
সুমী একটি বেসরকারি ব্যাংকে যোগ দিলেন মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ হিসেবে। সেখানে বছর তিনেক পর কিছু টাকা সঞ্চয়ের করে চাকরি ছাড়লেন। ফিরে এলেন নিজ গ্রামে। তিনি শৈশব থেকে দেখেছেন, মাহালী ও সাঁওতাল সম্প্রদায়ের নারীরা দিনভর মাঠে কাজ করেন। তাঁদের সন্তানরা বড় হচ্ছে অসহায়ের মতো। অর্থাভাবে বেশির ভাগেরই স্কুলে যাওয়া হয় না। অনেকে বিপথে চলে যাচ্ছে।
তিনি ভাবলেন, কি করা যায় তাঁদের নিয়ে। ২০২২ সালের এক বিকেলে খ্রিস্টানপাড়ার মায়েদের নিয়ে বসলেন। বোঝালেন তাঁদের সন্তানদের স্কুলে পাঠানো জরুরি। পরে গ্রামের কয়েকজন নারীকে নিয়ে গঠন করলেন ‘নারী ও শিশু কল্যাণ সংস্থা’। সংগঠনের কার্যনির্বাহী সদস্য সাতজন। সবাই নারী। নারীদের নকশিকাঁথা সেলাই, সবজির বাগান, হাঁস-মুরগি, ছাগল পালন ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। এ পর্যন্ত ১১৩ জন নারী নকশিকাঁথা সেলাইয়ের প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। সেলাই করা কাঁথাগুলো বিক্রি করার ব্যবস্থা করলেন সুমী। এ জন্য ‘প্রকৃতি কালেকশন’ নামে একটা দোকান দিয়েছেন রাজশাহীর বোয়ালিয়ায়। অনলাইনেও বিক্রি করেন। আড়ংসহ ঢাকার অনেক নামি প্রতিষ্ঠানে এখন যায় রাজশাহীর প্রত্যন্ত গ্রামের এই নারীদের নকশিকাঁথা।

এরপর সুমী দুটি বিদ্যালয় চালু করেছেন। একটি কয়েরদাঁড়া খ্রিস্টানপাড়ায়, অন্যটি পবার ভূগরইল গ্রামে। নাম ‘শিশুপ্রভাত বিদ্যানিকেতন।’ দুটি প্রতিষ্ঠানে এখন শিক্ষার্থী প্রায় ২০০ জন। শিক্ষক পাঁচজন। শিক্ষার্থীদের বই, খাতা-কলম স্কুল থেকে বিনামূল্যে দেওয়া হয়। সেখানে নার্সারি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পড়ানো হয়। তাঁরা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কার্যক্রমেও অংশ নেয়। সেখানে পড়াশুনার পাশাপাশি নাচ -গান ও শেখানো হয়। আশপাশের সাত-আট কিলোমিটারের মধ্যে কোনো স্কুল নেই। ২০২২ সালে শিশুপ্রভাত বিদ্যানিকেতন চালুর পর সেখানকার ছেলেমেয়েরা পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে।
উদ্যোক্তা সুমী বলেন, ‘শিক্ষার আলো ও অর্থনৈতিক সচ্ছলতা না থাকলে এগিয়ে যাওয়া কঠিন হবে। তাই নারী ও শিশুদের নিয়ে কাজ করছি, যাতে দারিদ্র্যের এই কঠোর শৃঙ্খল থেকে বেরিয়ে আসতে পারি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আরো বড় পরিসরে নারী ও শিশুদের নিয়ে কাজ করতে চাই।’
সুমীর মতো নারীরা যদি এমন উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন তাহলে গ্রামের নারীরা এখন আর পিছিয়ে থাকতেন না কর্মক্ষেত্রে। ঘরে বসে এভাবে উপার্জন করতে পারতেন। এতে একদিকে যেমন নিজেরাও স্বাবলম্বী হতেন অন্যদিকে পরিবারের দারিদ্রতাও ঘুচে যেত।



