প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে নতুন বিধিমালা জারি, বাদ পড়েছে নারী কোটা, নূন্যতম যোগ্যতা স্নাতক ডিগ্রি

গত বৃহস্পতিবার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা, ২০২৫-এর প্রজ্ঞাপন জারি হয়। প্রজ্ঞাপনে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগে নারীর ৬০ শতাংশ কোটা বাদ দেওয়া হয়েছে। এবং সেই সঙ্গে পোষ্য ও পুরুষ কোটাও বাদ দেওয়া হয়েছে।
বিধিমালার তথ্য অনুযায়ী, সহকারী শিক্ষকের ৯৩ শতাংশ নিয়োগ হবে মেধার ভিত্তিতে। এর মধ্যে ২০ শতাংশ পদ বিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রিধারীদের দ্বারা এবং ৮০ শতাংশ পদ অন্যান্য বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রিধারীদের দ্বারা পূরণ করা হবে। আর বাকি ৭ শতাংশ কোটার মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনার সন্তানদের জন্য ৫ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের জন্য ১ শতাংশ এবং ১ শতাংশ থাকবে শারীরিক প্রতিবন্ধী এবং তৃতীয় লিঙ্গের প্রার্থীদের জন্য। তবে কোটায় প্রার্থী পাওয়া না গেলে মেধাক্রম অনুযায়ী এসব পদ পূরণ করা হবে। প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা হতে হবে ন্যূনতম স্নাতক। শিক্ষাজীবনের কোনো পরীক্ষায় তৃতীয় শ্রেণি থাকা যাবে না।
গতকাল শুক্রবার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার বলেন, উচ্চ আদালতের রায়ের আলোকে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটাব্যবস্থা পরিবর্তন করা হয়েছে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগে এত দিন নারীরা ৬০ শতাংশ কোটা সুবিধা ভোগ করে আসছিলেন। এটি শিক্ষকতা পেশায় নারীর উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে। সর্বশেষ ‘প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা, ২০১৯’ এ সরাসরি নিয়োগযোগ্য পদের ৬০ শতাংশ মহিলা প্রার্থী, ২০ শতাংশ পোষ্য প্রার্থী এবং অবশিষ্ট ২০ শতাংশ পুরুষ প্রার্থীদের দিয়ে পূরণের কথা উল্লেখ ছিল। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রাথমিক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার মানোন্নয়নে গঠিত পরামর্শক কমিটিও শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনায় নারী শিক্ষককে অগ্রাধিকার সুপারিশ করেছে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদের নেতৃত্বাধীন এই কমিটি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তাদের প্রতিবেদন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়। প্রতিবেদনে প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষার শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনায় নারী শিক্ষককে অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়। কিন্তু নতুন প্রজ্ঞাপনে সেই সুপারিশের প্রতিফলন নেই।
শিক্ষক নিয়োগে নারী কোটা বাদ দেওয়ায় বিরোধিতা করেছেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সীমা মোসলেম। তিনি বলেন, বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, কর্মজীবী নারীর সংখ্যা কমছে। তিনি আরও বলেন, সব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগে নারী কোটা পুনর্বহালের দাবি জানাচ্ছি।
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে গত বছরের জুলাইয়ে আন্দোলনে নামে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন; যা ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। ওই আন্দোলনের মধ্যেই হাইকোর্টের রায়ের ভিত্তিতে মেধায় ৯৩ শতাংশ এবং কোটায় ৭ শতাংশ নিয়োগের নিয়ম রেখে গত বছরের ২৩ জুলাই প্রজ্ঞাপন জারি করে তৎকালীন সরকার। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারও সরকারি চাকরিতে নিয়োগে এটি অনুসরণ করে চলেছে, যার ভিত্তিতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা, ২০২৫-এর প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
নারীরা তো একদিকে কর্মক্ষেত্রে পিছিয়ে আবার প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে নারী কোটা বাতিল করায় নারীরা কর্মক্ষেত্রে আরও পিছিয়ে পড়ছে। কেননা অনেক নারীরা শিক্ষকতা পেশাকেই বেছে নেয়। আবার নারীরা অন্যান্য পেশায় যতটা না স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করতে পারে তাঁর চেয়ে বেশি শিক্ষকতা পেশায় বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। ফলে ধারণা করা হচ্ছে এই কোটা বাতিল হওয়ায় নারীরা কর্মক্ষেত্রে আবারও পিছিয়ে পড়ছে।
নারী কোটা বাতিল করে ৭ শতাংশ রাখা এবং মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের বিষয়টি নিয়ে শিক্ষক সংগঠনগুলোর মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে, এবং কেউ কেউ এই কোটা বহাল রাখার দাবিতে আন্দোলনও করছে।



