অধিকাংশ নারী এখনো মুখ বুজে নির্যাতন সহ্য করেন

দেশে সহিংসতার শিকার নারীর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। এমনকি পরিবারের হাত থেকেও রক্ষা পাচ্ছে না নারীরা। জরিপ বলছে, প্রযুক্তির সহায়তায় নারী নির্যাতন বাড়ছে। নানা ডিভাইসের মাধ্যমে সংবেদনশীল ব্যক্তিগত ছবি বা অযাচিত অন্তরঙ্গ মেসেজের মাধ্যমে বাড়ছে নারী নির্যাতন। অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবেও নারী নির্যাতন করা হচ্ছে। তবে শহরের চেয়ে গ্রামে নারী নির্যাতনের হার বেশি। ধারণা করা হচ্ছে দরিদ্রতাসহ নানা কারণে গ্রামে নারী নির্যাতনের হার বেশি। কিন্তু বর্তমানে সেই চিত্রেরও পরিবর্তন হয়েছে। শহরেও এই নির্যাতনের হার বেড়েই চলছে। নারীরা আর্থিকভাবে সচ্ছল হলেও কমেনি নারী নির্যাতন।
কিন্তু নারীরা দিনের পর দিন সহ্য করে যাচ্ছেন নির্যাতন। পরিবারের সুনাম রক্ষা, সন্তানদের ভবিষ্যৎ, এমনকি নিজেদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তাঁরা সহ্য করে যাচ্ছেন। এমনকি তাঁরা এই সহিংসতার কথা কারো সামনে সেভাবে প্রকাশও করেন না, নীরব থেকে সহ্য করেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) বাংলাদেশের সমন্বয়ে প্রকাশিত নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ-২০২৪ এ এমন তথ্য উঠে এসেছে। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি এ জরিপের ফলাফল প্রকাশিত হয়। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, নারীরা আয় করলেও সেই টাকায় কর্তৃত্ব থাকে পুরুষের। গ্রামের সঙ্গে এক ধরনের পাল্লা দিয়ে শহরেও বেড়ে চলেছে নারী নির্যাতনের হার। দেশে জাতীয়ভাবে জীবনে একবার হলেও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন দেশের ৭৫ দশমিক ৯ শতাংশ নারী। এই হার শহরে ৭৫ দশমিক ৬ শতাংশ ও গ্রামে ৭৬ শতাংশ। ফিজিক্যাল, সেক্সুয়াল, ইমোশনাল, কন্ট্রোলিং বিহ্যাভিয়ার, ইকনোমিক ভায়োলেন্স মিলিয়ে দেশে ৭৫ দশমিক ৯ শতাংশ নারী নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল বাংলাদেশের সমন্বয়ে প্রকাশিত নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ-২০২৪ এর মূল ফলাফল উপস্থাপন করেন বিবিএসের প্রকল্প পরিচালক ইফতেখারুল করিম। জরিপটি তৈরিতে দ্বৈবচয়নের ভিত্তিতে দেশের ২৭ হাজার ৪৭৬ জন নারীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘শহরায়নের ফলে গ্রাম ও শহরে নারী নির্যাতনের হার সমান। নারী নির্যাতনের ধরনও পাল্টেছে। প্রযুক্তির সহায়তায় নারী নির্যাতন বাড়ছে। অনেক সচ্ছল স্বামী নারীর প্রয়োজন অনুসারে হাত খরচ দেন না। স্ত্রী চাইলো পাঁচ হাজার, দেওয়া হলো এক হাজার। এছাড়া নারী আয় করলেও টাকা খরচের দায়িত্ব থাকে স্বামীর হাতে। ফলে আর্থিকভাবে নারীরা এক ধরনের সহিংসতার শিকার হচ্ছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘সহিংসতার শিকার ৬৪ শতাংশ নারী কিন্তু নীরব থাকেন। সমাজের ভয়ে, পরিবারের কথা চিন্তা করে বাচ্চাদের কথা চিন্তা করে তারা কথা বলেন না।’
নির্দিষ্ট কয়েকটি বিভাগে নির্যাতন বেশি
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, যৌন নির্যাতনের ঘটনা সবচেয়ে বেশি বরিশাল বিভাগে, ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ। বরিশালের পরেই চট্টগ্রাম বিভাগে ৩৪ দশমিক ১ শতাংশ। এছাড়া খুলনায় ২৯ দশমিক ৯, ঢাকায় ২৭ দশমিক ৮, রাজশাহীতে ২৭ দশমিক ২, ময়মনসিংহে ২৩ শতাংশ, রংপুরে ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ ও সিলেটে যৌন নির্যাতনের হার ২৮ দশমিক ২ শতাংশ।
গ্রামের চেয়ে শহরে নির্যাতনের হার বেশি
একসময় গ্রামের নারীরা বেশি নির্যাতনের শিকার হতো। কিন্তু বর্তমানে এ চিত্র পাল্টে গেছে। গ্রামের চেয়ে শহরের নারীরা বেশি সহিংসতার শিকার হচ্ছে। শহর ও গ্রামে যৌন নির্যাতনের হারে খুব বেশি পার্থক্য নেই। শহরে যৌন নির্যাতনের হার ৩১ দশমিক ১ এবং গ্রামে ২৮ শতাংশ।
মুখ বুজে নির্যাতন শিকার করছেন নারীরা
বাংলাদেশে সিঙ্গেল নারী হিসেবে টিকে থাকা কিন্তু খুবই চ্যালেঞ্জিং। ফলে সংসার, সন্তান লালন-পালন করা, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার কারণে নারী অনেকাংশে মুখ বুজে নির্যাতন সহ্য করেন। সমাজে বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য নারীকেই দায়ী করা হয়। সমাজে ডিভোর্সড নারীকে ভালো চোখে দেখা হয় না ফলে মুখ বুজে নির্যাতন সহ্য করেন অনেক নারী। জরিপ বলছে, মুখ বুজে নির্যাতন সহ্য করেন ৬৪ শতাংশ নারী।
স্বামীর দ্বারা নারীরা নির্যাতনের শিকার বেশি হন
বাংলাদেশের অধিকাংশ নারীই জীবনসঙ্গী বা স্বামীর মাধ্যমে সহিংসতার শিকার হন। নারী যখন আয় করেন তখন খরচের সিদ্ধান্ত নেন পুরুষ সদস্যরা। নারীর আয় স্বামী নিয়ে নেয়। না দিলে স্বামী অনেক সময় মারধর করে। নারীর হাতে মোবাইল ডিভাইস থাকলেও নিয়ন্ত্রণ থাকে পুরুষের হাতে। নারী কীভাবে ব্যবহার করবে তা পুরুষ দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। জরিপে দেখা যায়, দেশের ৭০ শতাংশ নারী অন্তত একবার হলেও স্বামীর মাধ্যমে শারীরিক, যৌন, মানসিক এবং অর্থনৈতিক সহিংসতার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের শিকার হন। যা একজন নারীর জীবনে গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
সঙ্গী নন এমন ব্যক্তির মাধ্যমে নারীরা নির্যাতিত হচ্ছে
সঙ্গী নন (নন-পার্টনার) এমন ব্যক্তির মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন নারীরা বেশি। তবে এ হার শহর অঞ্চলে বেশি। বিশেষ করে ঢাকায়। ঢাকার পরেই রয়েছে চট্টগ্রামের অবস্থান। নন পার্টনার দ্বারা নির্যাতনের হার কম রাজশাহী বিভাগে। নন পার্টনার বলতে বাবা-মা, শ্বশুর-শাশুড়ি, আত্মীয়, বন্ধু, প্রতিবেশী, সহকর্মী, পরিচিত ও অপরিচিতদের দ্বারা নারীরা নির্যাতিত হচ্ছে।
নারী নির্যাতন কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ
সবার আগে আমাদের মন মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। নারী নির্যাতনের মূল শেকড় অনেক ক্ষেত্রে সমাজ ও পরিবারেই লুকিয়ে থাকে। তাই ছোটবেলা থেকে সন্তানকে শেখাতে হবে যে, ছেলে-মেয়ে সমান। মেয়েরা দুর্বল নয়, বরং সমান সক্ষম। এছাড়াও আমাদের পরিবার ও সমাজে অল্প বয়সে বিয়ে, জোরপূর্বক বিয়ে, যৌতুক প্রথার যে প্রচলন আছে তা বন্ধ করতে হবে। এজন্য স্থানীয় পর্যায়ে মসজিদ, মন্দির, স্কুল, ক্লাবের মাধ্যমে আলোচনা ও ক্যাম্পেইন চালাতে হবে।
এছাড়াও নারী নির্যাতনের অন্যতম কারণ হলো আর্থিক নির্ভরশীলতা ও শিক্ষার অভাব। এজন্য নারীদের কারিগরি ও পেশাগত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। মেয়েদের জন্য সেলাই, কম্পিউটার, হস্তশিল্প, ফ্রিল্যান্সিং ইত্যাদি বিনামূল্যে শিখানোর ব্যবস্থা করতে হবে যাতে তারা নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ আইন, কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা। পুলিশকে আরও বেশি সচেতন হতে হবে। নারী নির্যাতনের অভিযোগ গ্রহণে পুলিশ যেন গাফিলতি না করে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। নারী নির্যাতনের মামলায় দীর্ঘসূত্রিতা না রেখে দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা করা। নির্যাতনের শিকার নারীদের বিনামূল্যে আইনি সহয়তা দিতে হবে। দরিদ্র নারীরা যাতে সহজে মামলা করতে পারে।
তবে পরিবার ও সমাজের সচেতনতায় সম্ভব হবে এ নির্যাতনের হার কমানো। পাশাপাশি আইনের কঠিন প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন থাকতে হবে তাহলেই হয়তো নারীরা নির্যাতনের হাত থেকে বেঁচে যাবে।



