সমস্যার উৎস না জানলে প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়

নারীর প্রতি সহিংসতা দিনদিন বেড়েই চলছে। সহিংসতা প্রতিরোধে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন আইন প্রণীত হচ্ছে কিন্তু আইন এর সঠিক প্রয়োগ ঠিকভাবে হচ্ছে কি না তা দেখতে হবে। নারীর প্রতি ন্যায়বিচার ও সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে আগে আমাদের সচেতন হতে হবে। সমাজকে সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি আইন ও কাঠামো শক্তিশালী হওয়া অপরিহার্য। তবে শুধু আইনের ওপর নির্ভর করে নারীর প্রতি ন্যায়বিচার ও সমঅধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সহিংসতা প্রতিরোধে আগে খুঁজে বের করতে হবে কেন সহিংসতা হচ্ছে, কারা করছে বা এর পিছনে কারা কাজ করছে। অর্থাৎ সমস্যাটার উৎস আগে চিহ্নিত করতে হবে এরপর সমাধান করা সম্ভব।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সম্প্রতি প্রকাশিত এক সমীক্ষায় নারী ও শিশু নির্যাতনের বিভিন্ন ধরনের অপরাধের উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। ধর্ষণ,যৌন হয়রানি,উত্যক্তকরণ,বাল্যবিবাহ ও যৌতুকের কারণে নির্যাতনের ঘটনা দিনদিন বেড়েই চলছে যা গতবছরকেও ছাড়িয়ে গেছে।
নির্যাতনের ধরন ও মাত্রা
প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৩ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের মোট ঘটনা ছিল ২ হাজার ৯৩৭টি। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ২ হাজার ৫২৫টিতে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন মাসেই ১ হাজার ৫৫৫টি ঘটনা ঘটেছে।
সমীক্ষা অনুযায়ী, ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা, যৌন হয়রানি, বাল্যবিবাহ, যৌতুক, গৃহকর্মী নির্যাতন ও সাইবার অপরাধ—এই আট ধরনের অপরাধ আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী ও অভিযুক্তদের বয়স
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সী কন্যারা সবচেয়ে বেশি ধর্ষণ, যৌন হয়রানি ও বাল্যবিবাহের শিকার হচ্ছেন। আবার বেশিরভাগ অভিযুক্তর বয়সও ১৬ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। অর্থাৎ ভুক্তভোগী ও অপরাধী উভয়েই কমবয়সী।
২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, ৩৬৪ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন—এর মধ্যে ২২০ জন কন্যা ও ১৪৪ জন প্রাপ্তবয়স্ক নারী। দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৪৮ জন, যার মধ্যে ৪৯ জন কন্যা। এছাড়া ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছেন ২১১ জন (১৩৪ জন কন্যা ও ৭৭ জন নারী)। যৌন হয়রানি ও উত্ত্যক্তকরণের শিকার হয়েছেন ২২৪ জন, এর মধ্যে ১২৫ জনই কন্যাশিশু।
ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্তদের মধ্যে ২১ থেকে ২৫ বছর বয়সীরা বেশি। সাইবার অপরাধের ক্ষেত্রেও অধিকাংশ অপরাধীর বয়স ১৬ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে।
কোন পেশার নারীরা বেশি ভুক্তভোগী
ঘটনার শিকার হওয়া নারীদের মধ্যে পেশাভিত্তিক কোনো পার্থক্য নেই। গৃহিণী, চাকরিজীবী, ষাটোর্ধ্ব নারী থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী—সবাই সহিংসতার শিকার হচ্ছেন।
শহর নাকি গ্রামে এ ধরনের সহিংসতা বেশি
পরিসংখ্যান তথ্য অনুযায়ী, ধর্ষণসহ অন্যান্য সহিংসতার মূল ক্ষেত্র গ্রাম বা উপজেলা পর্যায়। উপজেলা পর্যায়ে ধর্ষণের ঘটনার হার ৫৭ শতাংশ। মেট্রোপলিটনে সেই হার ১২ শতাংশ। অপরাধে জড়াচ্ছে মূলত ২১ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণেরা। ২০২৪ সালে ধর্ষণের ঘটনা ছিল ৩৬৪টি। এ বছরের প্রথম ছয় মাসে তা দাঁড়িয়েছে ৩৫৪টিতে। এই প্রবণতা ভয়াবহতার দিকেই ইঙ্গিত করে।
সহিংসতার উৎস জেনে এরপর সমাধান
সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—স্কুল বা কলেজে যাতায়াতের পথে উত্ত্যক্ত ও ধর্ষণের ঝুঁকি বেশি।সহপাঠী বা প্রেমিকের দ্বারা ধর্ষণের শিকার সর্বোচ্চ। সামাজিক পরিসরে সহিংসতার আশঙ্কা বেড়েছে গণপরিবহনে। রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এলাকায় প্রভাব খাটিয়ে ধর্ষণ বা উত্ত্যক্তের ঘটনা বেশি ঘটায়। নিজের বা প্রতিবেশী বাড়ি শিশুদের জন্য বিপজ্জনক জায়গা হয়ে উঠেছে। তাই কীভাবে এসব সহিংসতা কমানো যায় এজন্য সচেতনতা ও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে পাশাপাশি সহিংসতা রোধে আইন এর সঠিক প্রয়োগ করতে হবে।
তবে সমীক্ষার ফল বিশ্লেষণে কিছু ইতিবাচক দিক দেখা যায়। ধর্ষণের ঘটনায় মামলা করার প্রবণতা কিছুটা বেড়েছে। বর্তমানে ৬২ শতাংশ ঘটনায় মামলা হচ্ছে। তবে পারিবারিক সহিংসতার অনেক ঘটনা সংবাদমাধ্যমে আসছে না। অনেক ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীর বয়স, পেশা কিংবা মামলার অগ্রগতি উল্লেখ করা হয় না।



