ছয় মাসেই যৌন সহিংসতার সংখ্যা গত বছরের মোট পরিসংখ্যানের কাছাকাছি

নারী ও শিশু নির্যাতনের বিভিন্ন ধরণের অপরাধে উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের এক সাম্প্রতিক সমীক্ষায়। বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের প্রথম ছয় মাসেই ধর্ষণের সংখ্যা প্রায় গত বছরের সমান হয়ে গেছে। যৌন হয়রানি, উত্ত্যক্তকরণ, বাল্যবিবাহ ও যৌতুকের কারণে নির্যাতনের ঘটনাও ইতোমধ্যেই গত বছরের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে।
মঙ্গলবার রাজধানীতে মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত “বাংলাদেশে নারী ও কন্যা নির্যাতন: ২০২৪ সমীক্ষা” প্রতিবেদনের প্রকাশ অনুষ্ঠানে এ তথ্য জানানো হয়। সমীক্ষাটি ১৪টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ পর্যালোচনার ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে।
নির্যাতনের সামগ্রিক পরিসংখ্যান
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের মোট ঘটনা ছিল ২ হাজার ৯৩৭টি। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ২ হাজার ৫২৫টিতে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন মাসেই ১ হাজার ৫৫৫টি ঘটনা ঘটেছে।
সমীক্ষা অনুযায়ী, ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা, যৌন হয়রানি, বাল্যবিবাহ, যৌতুক, গৃহকর্মী নির্যাতন ও সাইবার অপরাধ—এই আট ধরনের অপরাধ আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী ও অভিযুক্তের বয়স
প্রতিবেদন বলছে, ১৮ বছরের কম বয়সী কন্যারা সবচেয়ে বেশি ধর্ষণ, যৌন হয়রানি ও বাল্যবিবাহের শিকার হচ্ছেন। আবার বেশিরভাগ অভিযুক্তর বয়সও ১৬ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। অর্থাৎ ভুক্তভোগী ও অপরাধী উভয়েই কমবয়সী।
২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, ৩৬৪ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন—এর মধ্যে ২২০ জন কন্যা ও ১৪৪ জন প্রাপ্তবয়স্ক নারী। দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৪৮ জন, যার মধ্যে ৪৯ জন কন্যা। এছাড়া ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছেন ২১১ জন (১৩৪ জন কন্যা ও ৭৭ জন নারী)। যৌন হয়রানি ও উত্ত্যক্তকরণের শিকার হয়েছেন ২২৪ জন, এর মধ্যে ১২৫ জনই কন্যাশিশু।
ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্তদের মধ্যে ২১ থেকে ২৫ বছর বয়সীরা বেশি। সাইবার অপরাধের ক্ষেত্রেও অধিকাংশ অপরাধীর বয়স ১৬ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে।
মামলা করার প্রবণতা বেড়েছে
সমীক্ষায় আরও বলা হয়, ধর্ষণের ঘটনায় মামলা করার প্রবণতা কিছুটা বেড়েছে। বর্তমানে ৬২ শতাংশ ঘটনায় মামলা হচ্ছে। তবে পারিবারিক সহিংসতার অনেক ঘটনা সংবাদমাধ্যমে আসছে না। অনেক ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীর বয়স, পেশা কিংবা মামলার অগ্রগতি উল্লেখ করা হয় না।
উদ্বেগ ও পর্যবেক্ষণ
অনুষ্ঠানে মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলেন, দেশে নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের মাত্রা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। একইসঙ্গে কমবয়সীরা বেশি ভুক্তভোগী হচ্ছে আবার অভিযুক্তদের মধ্যেও তরুণদের সংখ্যা বেশি—যা উদ্বেগজনক। তিনি উল্লেখ করেন, অনেক অপরাধী বারবার অপরাধে জড়াচ্ছে, এর পেছনে রাজনৈতিক ও ক্ষমতাসীনদের মদদ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার পাশাপাশি নারীবিদ্বেষী সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। “কেন টিপ পরছে, কেন কী পোশাক পরছে”—এই ধরনের সামাজিক নজরদারি নারীদের আরও ঝুঁকিতে ফেলছে।
মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, নারী নির্যাতনের মামলায় দীর্ঘসূত্রতা কমাতে সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ঘরে-বাইরে শিশুরা দিন দিন অনিরাপদ হয়ে পড়ছে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ—সীমা মোসলেম, রীনা আহমেদ, রেখা সাহা ও দীপ্তি শিকদার। সঞ্চালনা করেন প্রশিক্ষণ ও গবেষণা পরিচালক শাহজাদী শামীমা আফজালী।



