স্কুলে টিফিন খেতে পারতেন না, এখন দেশের দ্রুততম মানবী

অভিজ্ঞতা বনাম তারুণ্যের লড়াইয়ে জয়ী হলো শেষ পর্যন্ত তারুণ্যই। দীর্ঘ এক যুগ ধরে জাতীয় অ্যাথলেটিকসের ট্র্যাক দাপিয়ে বেড়ানো কিংবদন্তি শিরিন আক্তারকে হারিয়ে দেশের দ্রুততম মানবীর মুকুট ফিরে পেয়েছেন ২১ বছর বয়সী সুমাইয়া দেওয়ান। গত বৃহস্পতিবার জাতীয় স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ১৭তম জাতীয় সামার অ্যাথলেটিকসে এই অর্জন আসে তাঁর।
শিরিন আক্তারের ১৬ বারের জাতীয় শিরোপা আর অভিজ্ঞতা—সবকিছুর মাঝেও সুমাইয়া ছিলেন আত্মবিশ্বাসী। মাঠে বিভ্রান্তি তৈরি হলেও শেষ হাসি হেসেছেন তিনিই। গ্যালারির উত্তেজনা কিংবা শিরিনের উদ্যাপন—কোনো কিছুই দমাতে পারেনি তাঁকে। নিজেকে আগেই প্রস্তুত রেখেছিলেন জয়ের জন্য।
শুরুর গল্প: গড়পাড়ার মেয়ে থেকে দ্রুততম মানবী
মানিকগঞ্জ সদরের গড়পাড়া আলী নগরের কৃষক পরিবারের মেয়ে সুমাইয়া। তিন বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। বাবা তজুমুদ্দিন দেওয়ান কৃষিকাজ করতেন, ২০২০ সালে হার্ট অ্যাটাকে মারা যান। বাবাই ছিলেন তাঁর সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। ছোটবেলা থেকেই আর্থিক কষ্ট ছিল নিত্যসঙ্গী। স্কুলের বেতন দিতে হিমশিম খেতে হয়েছে, এমনকি পরীক্ষার ফি জোগাড় নিয়েও অনিশ্চয়তা ছিল সব সময়।
একসময় স্কুলে টিফিন খাওয়ার টাকাও ছিল না তাঁর কাছে। বন্ধুরা যখন খেত, তিনি চেয়ে থাকতেন। এমনকি দৌড়ের জন্য প্রয়োজনীয় রানিং শু কেনার সামর্থ্যও ছিল না। অবশেষে ২০১৬ সালে বাবা সাড়ে চার হাজার টাকা খরচ করে কিনে দেন তাঁর জীবনের প্রথম রানিং শু। সেই জুতাতেই শুরু হয় সুমাইয়ার দৌড়ের যাত্রা।

বিকেএসপি থেকে জাতীয় মঞ্চ
ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় ইন্টার স্কুল অ্যাথলেটিকসে খেলতে নামেন সুমাইয়া। সেখান থেকেই শুরু তাঁর যাত্রা। ২০১৭ সালে ভর্তি হন বিকেএসপিতে। যদিও তত দিনে শিরিন আক্তার সেখান থেকে বেরিয়ে গেছেন। তবে জাতীয় পর্যায়ে তাঁদের মুখোমুখি হতে দেরি হয়নি। ২০২২ সালে প্রথমবার ন্যাশনালসে অংশ নিয়েই সুমাইয়া হারান টানা ১২ বারের দ্রুততম মানবী শিরিন আক্তারকে। তিন বছর পর আবারও ফিরে এলেন সেই মুকুটে।
প্রতিদ্বন্দ্বী না অনুপ্রেরণা?
শিরিন আক্তারকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়, বরং একসঙ্গে দুটো ভূমিকায় দেখেন সুমাইয়া—চ্যালেঞ্জ আর অনুপ্রেরণা। নৌবাহিনীর হয়ে দুজনেরই নিয়মিত অনুশীলন হয় একসঙ্গে। সুমাইয়া মনে করেন, শিরিনের অভিজ্ঞতা তাঁকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে, আবার তাঁর কাছ থেকেই শেখার আছে অনেক কিছু।
লক্ষ্য আরও বড়
জাতীয় পর্যায়ে দ্রুততম মানবীর খেতাব ফিরে পাওয়া সুমাইয়ার কাছে এক মাইলফলক হলেও এখানেই থেমে থাকতে চান না তিনি। সামনে এসএ গেমসে ভালো কিছু করার স্বপ্ন দেখেন। আর দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো অলিম্পিকে অংশ নেওয়া। তাঁর প্রিয় স্প্রিন্টার জ্যামাইকার শেলি অ্যান ফ্রেজারের মতোই তিনি চান বিশ্বমঞ্চে দৌড়াতে।

পরিবারের অনুপস্থিতি, স্বপ্নের দৌড়
অ্যাথলেটিকস ট্র্যাকের সাফল্যগুলোর সাক্ষী হতে পরিবারের কাউকে এখনো মাঠে পাননি সুমাইয়া। বোনেরাও যাননি। তবে মাঝে মাঝে কাজিনেরা তাঁকে দেখতে আসেন। তবু পরিবারের প্রত্যাশা আর বাবার স্বপ্নই তাঁকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী সুমাইয়া দেওয়ান এখন শুধু দেশের দ্রুততম মানবী নন, বরং এক অনুপ্রেরণার গল্প। টিফিনের টাকার অভাবে স্কুলজীবনে যে মেয়েটি না খেয়ে থেকেছেন, তিনিই আজ জাতীয় অ্যাথলেটিকসে দেশের দ্রুততম নারী। সামনে তাঁর দৃষ্টি আরও দূরে—অলিম্পিকের ট্র্যাকের দিকে।



