Skip to content

২৮শে জুন, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | মঙ্গলবার | ১৪ই আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

ঋতুপর্ণ ঘোষের চলচ্চিত্র: গভীর বিষাদ আমাদের অন্তর্গত রক্তের মাঝে খেলা করে!

নারী মনকে যেন শৈল্পিক এক প্রতিচ্ছবি দিয়েছেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। শুধু তাই নয় ঋতুপর্ণ ঘোষের প্রতিটি চলচ্চিত্রই মনের এক গহীন কোণে জায়গা করে নেয়। জীবনের একটি পরম অভিজ্ঞতাও বটে, ঋতুপর্ণ ঘোষের চলচ্চিত্র উপভোগ করা।

কেউ যদি জীবনের বোধ নিয়ে কখনো কারও সঙ্গে কোনো বাক্য বিনিময় করতে যায়, তাহলে সে বলতে পারবে ঋতুপর্ণ ঘোষের অমুক চলচ্চিত্রে দেখেছিলাম, তিনি অমুক মানুষকে এভাবে উপস্থাপন করেছেন।

বাংলা চলচ্চিত্রের গতানুগতিক ধারার পরিবর্তনও তিনি নিয়ে এসেছেন তার চলচ্চিত্রে। একদমই বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্র থেকে যে নন্দনতত্ত্ব দিয়েও উপস্থাপন করা যায়, সেটা ঋতুপর্ণ ঘোষ বুঝিয়ে গেছেন ।

প্রশ্ন আসতেই পারে ঋতুপর্ণ ঘোষের কাজ কিভাবে অন্য কারও কাজ থেকে আলাদা! তিনি ভিন্ন মতাদর্শী মানুষ ছিলেন কারণ আমরা যেভাবে বাঁচতে চাই, সেই বেঁচে থাকার সময়ে আমাদের স্বাধীন মন যা করতে চায় কিন্তু পরিবার ও সসমাজীর চাপে পিষ্ট হয়ে করতে পারি না, সে কাজটিই তিনি করে দেখিয়েছেন চিত্রাঙ্গদা চলচ্চিত্রে। একজন শারীরিক দিক থেকে বেড়ে ওঠা মানুষ নিজেকে নারী হিসেবে চিহ্নিত করতে চাওয়ার যে প্রবল স্বাধীন মনোভাব এবং নিজের সত্তার স্বাধীনতাকে কিভাবে নিজের পরিচয়ের সঙ্গে সংযুক্ত করা যায়, সেটাই তিনি তুলে ধরতে চেয়েছেন এই চলচ্চিত্রটিতে।

তিনি মূল চরিত্রের আমূল পরিবর্তন কখনো দেখাননি বটে। তবে মানুষের অন্তর্নিহিত সত্তাকে আরও বেশি আলোকিত করতে বেশ সাহায্য করতে পারে। ঋতুপর্ণ ঘোষের চলচ্চিত্রে এক গভীর বিষাদ আমাদের অন্তর্নিহিত রক্তের মাঝে খেলা করে। মনের কোথায় যেন উদাস ও স্বাধীন সত্তার না পাওয়ার এক বেদনা তুলে ধরেন তিনি তার চলচ্চিত্রের মূল চরিত্রে।

এমনি আরেকটি চরিত্র পারমিতার একদিন। একজন পুরুষ মনোভাবাপন্ন পৃথিবিতে বড় হয়েও কিভাবে তিনি একজন নারীর মনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনুভুক্তিগুলো এত সুন্দর করে ব্যক্ত করতে পেরেছেন? নিজের মনে এক নারী সত্তা না থাকলে সেটা কখনোই সম্ভব হতো বলে মনে হয় না। নারীর জীবনের বিষাদ নিয়ে তিনি যেভাবে বর্ণনা করেছেন, সেটা দেখতে মনে হয় , তিনি নিজেই যেন সেই জীবন বেঁচে এসেছেন বেশ কয়েকদিন।

পারমিতার একদিন চলচ্চিত্রে পারমিতার নিজের সত্তাকে ঘিরে এবং নিজেকে নিয়ে যাবতীয় স্মৃতি নিয়ে অনুভূতি ব্যক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। এই চলচ্চিত্র দেখলে জীবনানন্দ দাশের কবিতার লাইন খুবই মনে পরে, ‘জানি তবু জানি, নারির হৃদয় প্রেম শিশু গৃহ নয় সবখানি। অর্থ নয়, প্রেম নয় সচ্ছলতা নয়, আরও এক বিপন্ন বিস্ময় আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভেতরে খেলা করে। আমাদের ক্লান্ত ক্লান্ত করে।’

আবার উনিশে এপ্রিল নামক সিনেমায় তিনি মা ও মেয়ের সম্পর্ককে দেখিয়েছেন। কন্যা সন্তান যখন প্রাপ্ত বয়স্ক হয় এবং মায়ের যখন একটু বয়স হয় তখন তাদের সম্পর্কটা কেমন হয়। কী হয় তাদের কথা বলার বিষয়? একজন আরেকজনকে মনের ভেতরে কিভাবে ধারণ করে নিয়ে বড় হয়, বুড়ো হয় ইত্যাদি।

ঋতুপর্ণ ঘোষ বাংলা চলচ্চিত্রে নিজের কর্মজীবন শুরু করেন বিজ্ঞাপন সংস্থার ক্রিয়েটিভ আর্টিস্ট হিসেবে। ১৯৯২ সালে তার প্রথম চলচ্চিত্র মুক্তি পায়। দ্বিতীয় ছবি উনিশে এপ্রিলের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। তার লিঙ্গ পরিচয় নিয়ে অনেকের অনেক রকম প্রশ্ন থাকলেও, অনেক বিতর্ক থাকলেও তিনি সব সময় জবাব দিয়ে গেছেন, ‘শিল্পীর কোনো লিঙ্গ হয় না।’

২০০৮ সালে প্রথম বলিউডের সিনেমা ‘রেইনকোট’ নির্মাণ করেন তিনি। সেখানে ঐশ্বরিয়া ও অজয় দেবগণ অভিনয় করেন। অনেকেই বলেন ঐশ্বরিয়াকে এত সুন্দর করে উপস্থাপন এর আগে অন্য কোনো ডিরেক্টর করতে পারেননি। এই ছবির জন্য তিনি হিন্দি বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। এরপর তিনি ‘দ্য লাস্ট ইয়ার’ নামের একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন । যার কাহিনি সূত্র শেক্সপেরিয়ান থিয়েটার অভিনেতার আদলে নির্মাণ করা হয়েছিল। সেখানে মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন অমিতাভ বচ্চন, অর্জুন রামপাল, প্রীতি জিন্তাসহ অনেকে।

তিনি সমকামিতা নিয়ে অনেক ছবি করেছেন, তার মধ্যে চিত্রাঙ্গদা এবং একটি প্রেমের গল্প বিশেষ সমাদৃত। জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সিনেমা নির্মাণ করার জন্য এবং তার সিনেমায় বিশেষ নিপুণতা এবং শিল্পের পরিচালনার জন্য তিনি সবার মনে জায়গা করে নিয়েছেন। আজ ঋতুপর্ণ ঘোষের মৃত্যু দিবস।

খুব অল্প বয়সেই তিনি বিদায় নিয়েছেন । কিন্তু অল্প কিছু সময়েই তিনি মানুষের জন্য যা দিয়ে গেছেন, সেটা কৃতজ্ঞতার। ২০১৩ সালের ৩০ মে তার কলকাতার বাড়িতেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ঋতুপর্ণ ঘোষের মৃত্যু ঘটে। মৃত্যুকালে ঋতুপর্ণ ঘোষের বয়স ছিল মাত্র ৪৯ বছর।

গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি তাকে। ঋতুপর্ণ ঘোষ আজীবন বেঁচে থাকবেন আমদের মাঝে।