বাংলা সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি জহির রায়হানের জন্মদিন আজ

শুধু একজন সাহিত্য নির্মাতা ও চলচ্চিত্র নির্মাতাকারই নন একজন ঔপন্যাসিক, একজন ছোটগল্পকার ও সাংবাদিক হিসেবে অসাধারণ প্রতিভার মানুষ ছিলেন জহির রায়হান। বহুমাত্রিক এই সৃজনশীল মানুষের ৯০তম জন্মবার্ষিকী আজ।
সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অবদান
জহির রায়হান সবসময় সমাজের অসাম্য, অন্যায় ও রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে লিখতেন। তিনি সমাজের মানুষের কষ্ট, দারিদ্র্য ও অসাম্যের বিরুদ্ধে সজাগ ছিলেন। তার গল্প ও নাটকে সাধারণ মানুষের জীবনের সত্যতা, দুঃখ, আনন্দ, আশা-নিরাশা ফুটে ওঠে। তিনি উচ্চবিত্ত বা রাজনৈতিক নেতাদের চোখে নয়, সাধারণ মানুষের চোখে সমাজ দেখিয়েছেন। তার রচনায় মানুষের অধিকার, সামাজিক ন্যায়ের কথা বারবার এসেছে। তিনি সাধারণ মানুষের জীবন ও সমস্যার কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করেছেন। ছাত্র-যুব আন্দোলন ও বিভিন্ন বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগে সক্রিয় ছিলেন। তিনি রাজনীতিকে বাস্তব জীবনের সঙ্গে সংযুক্ত করেছেন। তিনি পাকিস্তানি শাসনের সময় বাংলার জনগণের ওপর নিপীড়ন ও সাম্যবিরোধী অবস্থা তুলে ধরতে সাহিত্যের মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টি করেছেন।
জন্মদিনের আয়োজন
জহির রায়হান ফিল্ম ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে রাজধানীতে আয়োজিত হয়েছে বিশেষ অনুষ্ঠান। ‘বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনে চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের দর্শন ও সংগ্রাম’ শীর্ষক এ আয়োজনে থাকবে প্রবন্ধ উপস্থাপন, আবৃত্তি, সংগীত, আলোচনা ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনী। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন জাতীয় শিক্ষা-সংস্কৃতি আন্দোলনের সদস্য সচিব রুস্তম আলী খোকন। আলোচনায় অংশ নেবেন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি মাহির শাহরিয়ার রেজা, সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র সমালোচক বিধান রিবেরু, উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহমুদ সেলিম এবং জহির রায়হানের ছেলে অনল রায়হান।
১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট ফেনীর মিজানগরে জন্মগ্রহণ করেন জহির রায়হান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্যে পড়াশোনা করলেও খুব অল্প বয়স থেকেই যুক্ত হন রাজনীতি, সাহিত্য ও সাংবাদিকতার সঙ্গে। জীবদ্দশায় তিনি উপন্যাস, ছোটগল্প, চলচ্চিত্র নির্মাণ ও সাংবাদিকতায় রেখেছেন অসামান্য দাগ। তাঁর রচিত জনপ্রিয় উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে– হাজার বছর ধরে, আর কয়টা দিন, কয়েকটি মৃত্যু, তৃষ্ণা, সূর্যগ্রহণ, আরেক ফাল্গুন, বরফ গলা নদী প্রভৃতি। লেখক হিসেবে তিনি খ্যাতি পান ‘বরফ গলা নদী’, ‘আরেক ফাল্গুন’, ‘হাজার বছর ধরে’র মতো উপন্যাসের মাধ্যমে। এর মধ্যে ‘হাজার বছর ধরে’ বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সেরা সৃষ্টি হিসেবে স্বীকৃতি পায় এবং ১৯৬৪ সালে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কারে ভূষিত হন।
সাহিত্যের পাশাপাশি তিনি চলচ্চিত্রেও অসামান্য অবদান রাখেন। সহকারী পরিচালক হিসেবে যাত্রা শুরু। কিন্তু অল্প সময়েই হয়ে ওঠেন দেশের সবচেয়ে আধুনিক ও সাহসী নির্মাতাদের একজন। ১৯৬১ সালে ‘কখনো আসেনি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পরিচালনায় আসেন তিনি। এরপর একে একে উপহার দেন কাঁচের দেয়াল (১৯৬৩), সংগ্রাম, বাহানা (১৯৬৫), বেহুলা (১৯৬৬), আনোয়ারা (১৯৬৬), দুই ভাই (১৯৬৮), জীবন থেকে নেয়া (১৯৬৯), লেট দেয়ার বি লাইট (১৯৭০)সহ একাধিক কালজয়ী ছবি। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এসব চলচ্চিত্র এখনও মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।
জীবন থেকে নেয়া চলচ্চিত্রটি যেন ছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিবাদের দলিল। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কয়েকটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন। স্টপ জেনোসাইড, লিবারেশন ওয়ার, ইনোসেন্ট মিলিয়ন্সসহ আরও অনেক। তবে স্টপ জেনোসাইড প্রামাণ্যচিত্রটি বাংলাদেশের গণহত্যার খবর বিশ্ব দরবারে তুলে ধরে।
স্বাধীনতার পর নিখোঁজ হন জহির রায়হান। আজও তিনি বাঙালির ইতিহাসে এক রহস্যময় বেদনার অধ্যায়। সত্য ও স্বাধীনতার জন্য লড়াই করা এক অনন্য কণ্ঠস্বর যার সৃষ্টিকর্ম আজও অনুপ্রেরণার উৎস।



