Skip to content

২৯শে জুন, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | বুধবার | ১৫ই আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

ভাগ্যবিড়ম্বিত অম্বা, প্রতিশোধপরায়ণ শিখণ্ডী

মহাভারতে ভাগ্যের বিড়ম্বিত নারী চরিত্রগুলোর একটি অম্বা। তিনি ছিলেন কাশিরাজের জ্যেষ্ঠ কন্যা। তার জীবনের একটি অংশ নিঃশেষ হয়েছে অবহেলা-অনাদরে। তার দ্বিতীয় জন্ম ছিল শিখণ্ডীরূপে প্রতিশোধের। অম্বার গল্প যেন নারীর সামাজিক ইতিহাসের একটি পরিবর্তন নির্দেশ করে। আর তার প্রতি অবহেলা নারীর সামাজিক অবস্থান ও প্রশ্নবিদ্ধ মর্যাদার বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে তোলে।

কোনো অন্যায় না করেও ভাগ্যের বিড়ম্বনায় দগ্ধ হতে হয়েছে অম্বাকে। এক জন্মের অবহেলার যন্ত্রণা তাকে এতটাই প্রতিশোধপরায়ণ করে তুলেছে যে, পরের জন্মে তিনি গঙ্গপুত্র ভীষ্মের বীরগতির কারণ হয়েও উঠেছিলেন। তবে, সেখানে তিনি নারী হয়ে জন্মাননি, জন্মেছিলেন বৃহন্নলা হয়েছে।

মহাভারতে হিড়িম্বার চরিত্রটি যেমন অবহেলিত তেমনি অম্বা ভাগ্য বিড়ম্বিত। এই দুটো চরিত্রকে দেখলেই চমকে উঠতে হয়। অম্বার জীবনে এই বিড়ম্বনা, অবহেলা আসার প্রশ্নই ছিল না। কুরুবংশের সঙ্গে সংযোগই যেন তার ভাগ্যের বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

শুরুটি স্বয়ম্বর সভা থেকেই। ওই সময় নারীরা স্বামী নির্বাচনের অধিকার রাখতেন। সামাজিকভাবে তাদের পণ্যের মতো দেখা হলেও অন্তত একটি স্থানে তার অধিকার ছিল।

কাশিরাজের তিন কন্যা। অম্বা, আম্বিকা ও অম্বালিকা। এই তিন কন্যার স্বয়ম্বর সভায় বিভিন্ন রাজ্যের রাজাদের আহ্বান করা হলেও কুরুবংশের সম্রাট বিচিত্রবীর্যকে কোনো নিমন্ত্রণ পাঠানো হয়নি। ওই সময় কুরুবংশের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করার মতো আর কোনো রাজবংশ ছিল না। এছাড়া কাশিরাজ্যের সঙ্গে বহু বছর ধরেই কুরুরাজ্যের বৈবাহিক সম্পর্ক চলে আসছিল। সেখানে একেবারেই নিমন্ত্রণ না পাওয়া কুরুরাজ্যের জন্যে ছিল অসম্মানজনক।

কিন্তু নিমন্ত্রণ কেন মেলেনি? তখনো ভীষ্মের মতো বীর কুরুবংশের সেনাধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু তিনি সারাজীবন অবিবাহিত থাকার পণ করেছেন। এদিকে কুরুবংশের রাজা বিচিত্রবীর্য। তিনি স্ত্রীলাভে অনিচ্ছুক ছিলেন বা স্ত্রীলাভে অক্ষম ছিলেন; এমন একটি কথা বহুল পরিচিত ছিল।

ভীষ্ম ঠিক করলেন স্বয়ম্বর ভেঙে তিন রাজকন্যাকেই তুলে নিয়ে আসবেন। এরপর ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ে দেবেন। স্বয়ম্বর সভাটি সুন্দর চলছিল। বহুদিন আগেই অম্বা তার মন শান্দুরাজ শল্বকে দিয়ে রেখেছিলেন। স্বয়ম্বরে বহু আগেই নিজের মালাটি শাল্বকেই দিয়েছিলেন। এমন সময় ভীষ্মের প্রবেশ ও তিন রাজকন্যাকে অপহরণের ঘোষণা।

শল্ব বাধা দেওয়ার চেষ্টায় ভীষ্মকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করেন। বলা বাহুল্য শল্ব এই যুদ্ধে পরাজিত হন। ভীষ্ম তাকে হত্যা না করে বরং তিন রাজকন্যাকে নিয়ে হস্তিনাপুরে ফিরে আসেন। অম্বা দেখলেন সারাজীবন তাকে বিচিত্রবীর্যের স্ত্রী হয়ে বাঁচলে হলে ভীষণ যন্ত্রণা সহ্য করতে হবে। তাই তিনি ভীষ্মকে শল্বের প্রতি নিজের ভালোবাসার কথা জানালেন।

ভীষ্ম একথা জানার সঙ্গে সঙ্গেই অম্বাকে সসম্মানে শান্দুরাজার কাছে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। কিন্তু শান্দুরাজ আর অম্বাকে মেনে নেননি। প্রেমাষ্পদ অম্বা এখন বিজিত এক পণ্য মাত্র। তাকে গ্রহণ করলে বরং অপমান। মুখের ওপর বলেই দিলেন, আমি পরাজিত হয়েছি। এখন দান গ্রহণ করলে আমার অপমান।

উদ্ভিযৌবনা এক নারী হঠাৎ করেই বিজিত পণ্য হয়ে উঠলো। অম্বার নিজ পরিবারে ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেই। ফিরলেন ভীষ্মের কাছে। ভীষ্মও সারাজীবন বিয়ে না করার পণ করেছেন। তার পক্ষে অম্বাকে বিয়ে করা সম্ভব নয়।

অম্বার এই বিড়ম্বনা নারীর প্রতি নিজের কৃতকর্মের দায় এড়ানোর এক নতুন ধারা সৃষ্টি করে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে। এই দায় কার? ভীষ্মের দায় তো আছেই। অম্বার বাবারও আছে। শান্দুরাজের সঙ্গে অনেক আগেই গোপনে বিয়ে দেওয়া সম্ভব ছিল। অথচ নিজ ঐশ্বর্য ও প্রতাপের জৌলুস দেখাতেই এই স্বয়ম্বর আয়োজন করা। এমনকি বিধাতাও যেন বিধির বিধানে নারীকে বিড়ম্বনায় ঠেলে দিয়েছেন।

অম্বার ভেতর এলো ভীষ্মের প্রতি এক অদম্য প্রতিশোধস্পৃহা। যেকোনো মনস্তাত্ত্বিকের বিবেচনায় এমন ক্রোধ একদম অবিবেচিত নয়। এই ঘটনায় অম্বার প্রচণ্ড মানসিক শক্তির পরিচয় দেয়।

তিনি পরশুরামের কাছে তপস্যার জন্যে গেলেন। পরশুরামের আরেক শিষ্য ভীষ্ম। নিজ শিষ্যের এই কাজে ক্রোধান্বিত হয়েছিলেন। দুজনের মধ্যে প্রায় তেইশ দিন যুদ্ধ চলে। ওই যুদ্ধে পরশুরামকে পরাজিত করেন ভীষ্ম।

অম্বা সিদ্ধান্ত নিলেন তিনিই ভীষ্মকে হত্যা করবেন। তপস্যার ক্ষেত্রে সুন্দরী নারীদের নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। অম্বা সে সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন ছিলেন। নারী হয়ে ভীষ্মকে হারাতে পারবেন না জানতেন। কঠোর তপস্যায় তিনি বর পেলেন পুনর্জন্মে ভীষ্মকে বধ করার ক্ষমতা। কিন্তু তার পুনর্জন্মে তিনি জন্ম নেবেন শিখণ্ডিনী হয়ে। সে আরেক গল্প।

কিন্তু অম্বার ভাগ্য বিড়ম্বনা মহাভারতে নারীর সামাজিক অবস্থানে একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা করে। যদিও অনেকে বলেন নারীকে যথেষ্ট সম্মান দিতে নাহলে তার পরিণতি ভয়াবহ হবে। তবু অম্বার প্রতি অন্যায়টি ঠিক কার? সেটা সামাজিকভাবেই এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। অম্বার জীবনের ইতিহাস এখানেই যেন আরও ভয়াবহ রূপ নেয়।

মহাদেবের আরাধনার মাধ্যমে ভীষ্মের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার মনস্কামনা পূর্ণ হলো। কিন্তু সেটা ঠিক কবে? একই সময়ে দ্রুপদের রাজাও মহাদেবের আরাধনা করেন। দ্রুপদের রাজার ঘরেই জন্ম নেবে অম্বা। তবে তার নাম হবে শিখণ্ডী। কিন্তু তার লিঙ্গ একইসঙ্গে পুরুষ ও নারী। যদিও দ্রুপদরাজ মেয়েকে ছেলে পরিচয়ের বড় করবেন। বয়স হতেই তার সঙ্গে দর্শান দেশের রাজকন্যা হিরণ্যবর্মার বিয়ে হয়।

যেমনটা হওয়া স্বাভাবিক ঠিক তেমনটাই হলো। খুব দ্রুত শিখণ্ডীর পরিচয় ফাঁস হয়ে গেলো। ফলে দর্শান দেশের রাজা সিদ্ধান্ত নিলেন এমন প্রকৃতিবিরুদ্ধ কাজের জন্যে দ্রুপদরাজকে শাস্তি দিতে হবে। শিখণ্ডী পালিয়ে এলেন গভীর অরণ্যে। নিজ মাতৃভূমিকে বিপদে ফেলেছেন নিজ দোষে। কিন্তু শিখণ্ডী কখনোই পালিয়ে যাওয়ার মতো মনমানসিকতার পরিচয় দেননি। তিনি বনেই দেখা পেলেন যক্ষের। তার কাছে একমাত্র আবেদন, শিখণ্ডী পুরুষ হতে চান। যক্ষ এমন বর দিতে পারেন না। তাই তিনি তাকে সাময়িক সময়ের জন্যে পুংচিহ্ন ধারণের বর দেন। এভাবেই নারী ও পুরুষ এই দুই পরিচয়ের আটকে যেতে হয় তাকে। নিজ দেশকে মুক্ত করার পর তিনি আবার নারী হয়ে যান।

দর্শানরাজ নিশ্চিত হলেন যে শিখণ্ডী আসলে তার জামাতাই। এমনকি এমন বীরত্বের সঙ্গে যে লড়াই করে, সে অবশ্যই নারী হতে পারে না। তিনি জামাতাকে অনেক মহামূল্যবান উপঢৌকন দেন। কিন্তু তাতে শিখণ্ডী পরিতৃপ্ত নন। তিনি ভীষ্মকে হত্যা করবেনই। তাই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পাণ্ডবদের পক্ষ নিলেন। কুরুযুদ্ধের চতুর্থ দিন শিখণ্ডী ভীষ্মের মুখোমুখি হন। ভীষ্ম ঠিকই চিনতে পেরেছিলেন। নারীর বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলবেন না এই সংকল্প করেছিলেন। আর সেই একঘেয়েমিই তার কাল হলো। অর্জুন এই সুযোগে তাকে শরবাণে জর্জরিত করেন।

শিখণ্ডী তার প্রতিশোধ ঠিক পেয়ে যায়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে অপমান-অবহেলার যন্ত্রণা বহন করতে হয়েছিল তাকে। এখনো ভারতে তাকে বৃহন্নলা বা হিজড়াদের পূর্বপুরুষ হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। সেই অপমান আর অবহেলা এখনো কাটেনি। অথচ অম্বার হওয়ার কথা ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ এক প্রেমের গল্পের নায়িকা। সেটা হলো প্রতিশোধস্পৃহার লিগ্যাসি।

অনন্যা/এআই