বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬
নারী

ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপনে কতটা এগোল বাংলাদেশ

ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপনে কতটা এগোল বাংলাদেশ

দেশের কর্মক্ষেত্র ও জনপরিসরে শিশুদের মাতৃদুগ্ধ পান করানোর জন্য উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হাইকোর্ট ২০২৩ সালে রায় দেন। ৯ মাস বয়সী শিশু উমাইর বিন সাদিকের পক্ষে তার আইনজীবী মা ইশরাত হাসান ২০১৯ সালে জনস্বার্থে এ রিট দায়ের করেন। রায়ে দেশের সব সরকারি-বেসরকারি কর্মস্থল, শপিংমল, বিমানবন্দর, বাস ও রেলস্টেশনে ব্রেস্ট ফিডিং ও বেবি কেয়ার কর্নার স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে রায় কার্যকরে অগ্রগতি হলেও বাস্তবায়নের পরিপূর্ণ চিত্র এখনও ধোঁয়াশায় রয়েছে। বহু প্রতিষ্ঠানে এখনও পর্যন্ত ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপন করা হয়নি যা শিশুদের মৌলিক অধিকার এবং মায়েদের স্বস্তিদায়ক কর্মপরিবেশ তৈরির পথে বড় বাধা হয়ে আছে।

২০১৯ সালের ২২ অক্টোবর রিট দায়ের করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান। রিটে বলা হয়েছিল, অনেক কর্মজীবী মা সরকারি ও বেসরকারি অফিস, বাস বা রেলস্টেশনে শিশুকে দুধ খাওয়ানোর নিরাপদ জায়গা পান না। যৌন হয়রানির আশঙ্কা, গোপনীয়তার অভাব ও ন্যূনতম পরিবেশের না থাকায় বহু মা প্রকাশ্যে দুধ খাওয়াতে পারেন না যা শিশুর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়। তিনি আরও বলেন, “ শিশুর জন্মের পর প্রথম দুই বছর মাতৃদুগ্ধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার না থাকায় অনেক মা এই মৌলিক অধিকার চর্চায় বাধাপ্রাপ্ত হন।”

২০১৯ সালের ২৭ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চায়, কেন সব কর্মস্থল, বিমানবন্দর, রেলস্টেশন, বাস স্ট্যান্ড, শপিং মলে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার ও বেবি কেয়ার কর্নার স্থাপন করা হবে না। নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ ৬টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে ৪ সপ্তাহের মধ্যে এ বিষয়ে জবাব দিতে বলা হয়। পরে ২০২৩ সালের ২ এপ্রিল বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী ও বিচারপতি কাজী ইবাদত হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রিটের পক্ষে চূড়ান্ত রায় দেন। একই বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর পূর্ণাঙ্গ ৬ পৃষ্ঠার রায় প্রকাশ হয় যেখানে স্পষ্ট করে বলা হয় সব ধরনের কর্মস্থল ও জনপরিসরে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপন বাধ্যতামূলক। রায়ে বলা হয়, “ শিশুদের মাতৃদুগ্ধ পানের বিষয়টি অস্বীকার করার উপায় নেই। কর্মজীবী মায়েদের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সকল প্রতিষ্ঠানে ব্রেস্ট ফিডিং রুম থাকা আবশ্যক।”

আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, “ রায়ের পর কিছু অগ্রগতি হয়েছে। বিভিন্ন শপিংমল, হাসপাতাল, রেলস্টেশন ও বিমানবন্দরে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার দৃশ্যমান হয়েছে যা সন্তোষজনক। তবে এখনো বহু সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এটি বাস্তবায়িত হয়নি। শিল্প কারখানা ও বেসরকারি অফিসগুলোতে এই নির্দেশনা কার্যকরে অনীহা রয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “ নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে সরকার কথা বললেও বাস্তবে কর্মক্ষেত্রে মায়েদের এই মৌলিক সুবিধাটি নিশ্চিত করা হয়নি। এতে শিশুর স্বাস্থ্য ও মায়ের মর্যাদা দুটিই উপেক্ষিত হচ্ছে।”

ব্যারিস্টার তাহসিনা তাসনিম মৃদু বলেন, “ ব্রেস্ট ফিডিং কর্নারের মতো মৌলিক বিষয় নিয়ে আমাদের এখনও আলোচনা করতে হয় এটাই প্রমাণ করে আমরা বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতে ব্যর্থ হয়েছি। যদি আমরা নারীর অংশগ্রহণ চাই তবে এই ধরনের অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।” তিনি আরও বলেন, “ শুধু ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার নয় পর্যাপ্ত সংখ্যক চাইল্ড কেয়ার সেন্টার স্থাপন নিয়েও সরকারি পরিকল্পনার অভাব রয়েছে।”

হাইকোর্ট রায়ে উল্লেখ করা হয়, “ এর আগে কখনও ৯ মাস বয়সী শিশু রিট দায়ের করেনি। এই শিশু ইতিহাস সৃষ্টি করেছে।” এটি কেবল একটি আইনি রায় নয় বরং এক সামাজিক আন্দোলনের সূচনা। একটি শিশুর মৌলিক চাহিদা নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হওয়া প্রমাণ করে সমাজের নানা স্তরে এখনও অনেক অপূর্ণতা রয়ে গেছে।

Advertisements
Advertisements