বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬
নারী

হার না মানা এক সংগ্রামী নারী তানজিলা

হার না মানা এক সংগ্রামী নারী তানজিলা

ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন ছিল তানজিলা আক্তারের। কিন্তু এসএসসি পরীক্ষার আগেই বসতে হয় বিয়ের পিঁড়িতে। কলেজে ভর্তি হতে চাইলে শ্বশুরবাড়ির বাধা। তবে তানজিলা পিছু ছাড়ে নি। পাশে দাঁড়ান স্বামী আবু বকর মুন্সী। ভর্তি হন কলেজে।

বিয়ের এক বছর না যেতেই জন্ম নেয় তাঁদের ছেলে আলিফ বিন সিদ্দিক। প্রথমে সবই স্বাভাবিক মনে হয়েছিল। কিন্তু ছয় মাস বয়সেও বসতে পারছিল না আলিফ। হামাগুড়ি দেওয়া তো দূরের কথা, ঘাড়ও সোজা করতে পারছিল না। সময়ের সঙ্গে সব ঠিক হয়ে যাবে এই ভরসাতেই ছিলেন তানজিলা। কিন্তু আট মাসেও উন্নতি না দেখে নিয়ে যান চিকিৎসকের কাছে। একাধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ধরা পড়ে, আলিফ জুবার্ট সিনড্রোমে আক্রান্ত একটি বিরল রোগ, যার ফলে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হয়। ২০১৪ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসকরা জানান, দেশে এই রোগে আক্রান্ত প্রথম শিশু আলিফ।

একজন মায়ের সাধনা

প্রথমবার শুনেই যেন আকাশ ভেঙে পড়ে তানজিলার মাথায়। নিজেকে দোষারোপ করেন। কিন্তু থেমে থাকেননি। দেশ-বিদেশে চিকিৎসা করিয়েছেন। চিকিৎসকেরা জানান, নিয়মিত থেরাপি দিলে কিছুটা উন্নতি হতে পারে। ২০১৫ সালে তানজিলা আলিফকে নিয়ে চলে আসেন মিরপুর সিআরপিতে। ডাক্তারদের দেওয়া নির্দেশনা মেনে বাসায় চালিয়ে যান থেরাপি। ধীরে ধীরে আলিফ বসতে শেখে। দুই বছর পর তানজিলা যান সাভারের সিআরপিতে। উঠানে দুই পাশে বাঁশ বেঁধে শুরু করেন আলিফকে হাঁটা শেখানোর অনুশীলন। আট বছর পর সেই সাধনার ফল মেলে হাঁটতে শেখে আলিফ।

এখন সে ১১ বছরের এক চঞ্চল শিশু। নার্সারিতে পড়ে, স্কুলে যায়, নিজের কাজ নিজেই করতে চায়। বুঝতে পারে অনেক কিছু, যদিও কথা এখনও স্পষ্ট না।

লড়াইয়ের ফাঁকে পড়াশোনা

আলিফের যত্ন, অসুস্থ শাশুড়ির সেবা, সংসারের দায়িত্ব সবকিছুর মাঝেও থেমে থাকেননি তানজিলা। এইচএসসি পাস করেছেন এরপর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে হিসাববিজ্ঞানে বিবিএ ও এখন সাভার সরকারি কলেজ থেকে এমবিএ করছেন। ফ্রেঞ্চ ও ইংরেজি ভাষাতেও প্রশিক্ষণ নিয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা শিক্ষা ইনস্টিটিউট থেকে।

আলিফের চিকিৎসার সূত্র ধরে তানজিলা যুক্ত হন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জুবার্ট সিনড্রোম ফাউন্ডেশনে।

মায়েরাই মায়েদের শক্তি

সিআরপিতে আসা-যাওয়ার সময় তানজিলা লক্ষ্য করেন, আলিফের মতো বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের অধিকাংশ মা একা লড়ছেন। অনেকেই স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির কাছে পরিত্যক্ত। কেউ সবজি বিক্রি করছেন, কেউ বাসা-বাড়িতে কাজ করে সন্তানের চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছেন। তানজিলা ভাবেন কীভাবে এই মায়েদের পাশে দাঁড়ানো যায়। কথা বলেন সিআরপির পিয়ার সাপোর্ট ফোরামের সমন্বয়কারী মিজানুর রহমানের সঙ্গে। তাঁর সহযোগিতায় গড়ে তোলেন পিয়ার সাপোর্ট মাদারস গ্রুপ। এখানে কম্পিউটার, সেলাই, ব্লক-বাটিক, পাট ও সুতার কাজসহ মোট ৮টি বিষয়ের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। একে অপরকে শেখান। কেউ পিঠা বানাতে জানেন, কেউ পুঁতি দিয়ে গয়না তৈরি করতে পারেন।এখন এই গ্রুপে দেড় শতাধিক সদস্য।

প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মায়েদের তৈরি পণ্য বিক্রি হয় পিয়ার সাপোর্ট সেলস সেন্টারে। কেউ কেউ এখন আলাদা দোকানও খুলেছেন।

নতুন পথ নতুন সংগঠন

সম্প্রতি আলিফের যক্ষ্মা ধরা পড়ে। চিকিৎসার জন্য ফিরে যান গ্রামের বাড়ি বরিশালের মুলাদীতে। সেখানে দেখেন প্রতিবন্ধী শিশু ও তাঁদের পরিবাররাও নানা সমস্যায় জর্জরিত। আবারও তানজিলা নেমে পড়েন লড়াইয়ে। গড়ে তুলেছেন মাদারস অব ডিজঅ্যাবল চিলড্রেন নামের নতুন সংগঠন। ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর ৩০ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে শীতবস্ত্র দিয়ে যাত্রা শুরু করে সংগঠনটি।

তানজিলা ২০২৩ সালে সাভারে ও ২০২৪ সালে মুলাদীতে ‘শ্রেষ্ঠ জয়িতা’ হিসেবে সম্মাননা পেয়েছেন। নিজেকে পরিচয় দেন গর্বিতভাবে বিশেষ শিশুর মা হিসেবে। তাঁর বিশ্বাস, “এই শিশুদের একটু ভালোবাসা, যত্ন, আর সুযোগ দিলে তারাও আলোর মুখ দেখে।” তানজিলা বলেন, “সন্তান নিরাপদ না থাকলে মৃত্যুর পর ও শান্তি পাব না। তাই সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য লড়ছি, শেষ দিন পর্যন্ত।”

নারী