বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনরবিবার, ৯ আগস্ট, ২০২৬
জীবনযাপন

মোবাইলহীনতায় অস্থিরতা! আপনি কি নোমোফোবিয়ায় ভুগছেন?

IMG_5636

আজকের দিনে প্রত্যেকের হাতেই একটি বা একাধিক মোবাইলফোন দেখা মিলবে। এমন বলা যায় যে মোবাইলফোন যেন মানুষের একটি ছোট অঙ্গ হয়ে গেছে। কারণ মোবাইলফোন ছাড়া আমাদের একটি মুহূর্তও চলে না। কোনো কারণে মোবাইলফোন হারিয়ে গেলে, বা নষ্ট হয়ে গেলে বুঝা যায় চিন্তা কাকে বলে। এমনি অনেকে আছো যাদের মোবাইলফোন হারিয়ে গেলে, বা কাছাকাছি না থাকলে এক ধরনের মানসিক অস্থিরতা, মানসিক চাপ তৈরি হয়। এ ধরনের অস্থিরতা যাদের হয় তাদের বলা হয় নোমোফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি।

নোমোফোবিয়া (Nomophobia) যেটার পূর্ণরুপ হলো, নো-মোবাইল ফোবিয়া। এর উদাহরণ প্রায়-ই দেখতে পাবেন। মোবাইলটা হাতের সামনে না পেলে কেমন পাগলের মতো করবে এই ফোবিয়ায় যারা ভুগে। হলিউড মুভি জুমান্জি -২ তে দেখতে পাবেন একটি মেয়ে যখন জঙ্গলে ফেসে যায় তার সব কিছু হাড়িয়ে যায়, কিন্তু সে পাগলামি করে শুধু তার মোবাইলের জন্য। এই সমস্যার কথা আমরা অনেকেই না জানলেও, আমাদের মধ্যেই অনেকেই এই রোগের শিকার। রোগটির দুই ধরনের লক্ষণ রয়েছে– মানসিক এবং শারীরিক। মানসিক কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে মোবাইল ফোন থেকে দূরে সরে গেলে হঠাৎ মনে ভয়, দুশ্চিন্তা কিংবা হতাশা ভর করা। হঠাৎ মোবাইল ফোন চোখের আড়ালে চলে গেলে আতঙ্কিত হয়ে যাওয়া। দীর্ঘ সময় মোবাইল ফোন চালাতে না পারলে মানসিক চাপ অনুভব করা। সাধারণত কোনো ভীতিকর পরিস্থিতিতে মানুষ যেসব শারীরিক লক্ষণ প্রকাশ করে থাকে, এই রোগের ক্ষেত্রেও সেগুলোই প্রকাশ পায়। যেমন- হঠাৎ কাঁপতে শুরু করা কিংবা স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস বাধাগ্রস্ত হওয়া। এছাড়াও জ্ঞান হারিয়ে ফেলা অথবা কোনো আবহাওয়াগত কারণ ব্যতিরেকে ঘামতে থাকাও এই রোগের শারীরিক লক্ষণগুলোর মধ্যে একটি। 

নোমোফোবিয়ায় আক্রান্ত মানুষেরা সাধারণত নানান সামাজিক সমস্যাতে ভোগেন। ফোন থেকে দূরে থাকলে এই রোগে আক্রান্তরা উদ্বেগে ভোগেন। যার ফলে উচ্চ রক্তচাপ সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া এর ফলে মনোযোগও নষ্ট হয়। যার ফলে কর্মস্থলে উৎপাদনশীলতাও কমে আসে। এছাড়া এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সময়ের অপচয় করে। নোমোফোবিয়ায় আক্রান্ত লোকেরা ত্বকের সমস্যায়ও আক্রান্ত হন। অনবরত ফোনের সংস্পর্শে থাকার ফলে ব্রন, অ্যালার্জি ও ডার্ক স্পট পড়তে পারে। 

কেন এটি হয়?

Advertisements

বিশেষজ্ঞদের মতে, মোবাইল ফোনের উপর অত্যধিক নির্ভরশীলতার ফলে একধরনের আসক্তি তৈরি হয় মানুষের মধ্যে যেটা হলো সব সময় মোবাইল ব্যবহার করা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগ আশার পর মোবাইল ফোনের উপর মানুষের আসক্তি আরও ১০গুন বেড়ে উঠেছে। হঠাৎ যখন একজন মোবাইল ফোনে আসক্ত ব্যক্তি অনুধাবন করেন যে তিনি মোবাইল ফোন হাড়িয়ে ফেলেছেন বা মোবাইল চালাতে পারছে না স্বাভাবিকভাবেই তার মধ্যে বেশ কিছু মানসিক পরিবর্তন এসে পরে, যেটি তার জন্য মোটেও সুখবর নয়। আমাদের দেহের একটি অতি প্রয়োজনীয় হরমোন হচ্ছে ডোপামিন৷ এটিও নোমোফোবিয়ার পেছনে বেশ কিছুটা দায়ী।

নোমোফোবিয়া বর্তমানে পঞ্চম সংস্করণ (ডিএসএম-৫)-এ এটি একটি ‘নির্দিষ্ট ভীতি’ হিসেবে প্রস্তাবিত হয়েছে। মনোবিজ্ঞানী Adriana Bianchi and James G. Philips তাঁদের জার্নাল Psychological Predictors of Problem Mobile Phone Use-এ বলছেন, কিছু মানসিক কারণ মোবাইলফোনের অতিরিক্ত ব্যবহারের সঙ্গে জড়িত আছে। এই মানসিক কারণগুলোর মধ্যে ব্যক্তির আত্মসম্মানের অভাব (যখন আশ্বস্ত ব্যক্তিরা অনুপযুক্ত উপায়ে মোবাইলফোন ব্যবহার করে) এবং বহির্মুখী (এক্সট্রোভার্ট) ব্যক্তিত্ব (যখন স্বাভাবিকভাবেই সামাজিক ব্যক্তিরা মোবাইলফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার করে) অন্তর্ভুক্ত। সামাজিক ফোবিয়া বা সামাজিক উদ্বেগ ব্যধি, সামাজিক উদ্বেগ এবং প্যানিক ডিসঅর্ডারের মতো সমস্যাগুলোও তাদের মধ্যে দেখা যায় এবং পূর্বের মানসিক ব্যধিগুলোর কারণে মনস্তাত্ত্বিক উপসর্গগুলোও হতে পারে।

২০০৮ সালের United kingdom-এর গবেষণা সংস্থা IGov-এর গবেষণায় দেখা যায় যে, ব্রিটেনে প্রায় ৫৩% মোবাইলফোন ব্যবহারকারী উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে যখন তারা ‘তাদের মোবাইল ফোন হারায়, ব্যাটারি বা ক্রেডিট ছাড়ায়, বা কোনও নেটওয়ার্ক কভারেজ থাকে না’। গবেষণায় ২ হাজার ১৬৩ জন লোকের নমুনা থেকে পাওয়া গেছে, প্রায় ৫৮% পুরুষ এবং ৪৭% নারী ভয়াবহভাবে ভুগছেন এবং অতিরিক্ত ৯% লোক মোবাইলফোন বাড়িতে রেখে আসার কারণে মানসিক চাপে পড়েন। জরিপের ৫৫% লোক উল্লেখ করেছেন যে, তারা মোবাইলফোন বাড়িতে রেখে আসার কারণে তাদের পরিবার এবং বন্ধুদের যোগাযোগ রাখতে পারেন না। এই বিষয়টি তাদের মানসিক উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দেয়। আমেরিকায় মোট মোবাইলফোন ব্যবহারকারীর প্রায় ৬৬ শতাংশ ব্যক্তিই তাদের মধ্যে নোমোফোবিয়ার লক্ষণগুলো বিদ্যমান থাকার কথা স্বীকার করেছেন। বাসায় মোবাইল ফোন রেখে আসা ৫০ শতাংশ ব্যক্তি মানসিক অস্বস্তিতে ভুগে থাকেন।এমনকি ২৬ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষেত্রে চালকেরা দুর্ঘটনায় সময় মোবাইলফোন ব্যবহার করে থাকেন বলে পরিসংখ্যান দেখা গিয়েছে। ৬৯ শতাংশ মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী ঘুম থেকে উঠে কোনো কাজ করার আগে সবার প্রথমে মোবাইল ফোনে হাত দেন। 

লক্ষণ 

আপনি নোমোফোবিয়ায় আক্রান্ত যদি আপনি

১. রাতে প্রতি দুই ঘণ্টা পরপর আপনার ফোন চেক করার জন্য জেগে ওঠেন।

২. দুপুরের খাবার বা রাতেও খাবার খাওয়ার সময়ও যদি আপনি ফোন চেক করেন।

৩. ফোনের ব্যাটারির চার্জ শেষ হয়ে গেলে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং পুনরায় চার্জ না দেওয়া পর্যন্ত শান্ত হতে পারেন না।

৪. ফোনে কোনো সিগনাল না থাকলে আপনার এমন অনুভূতি হয় যে আপনার জীবনটাই বুঝি বৃথা।

৫. আপনি যত ব্যস্তই থাকেন না কেন ফোনে কল আসলে আপনি তা রিসিভ করার জন্য মুখিয়ে থাকেন।

৬. আপনি এমনকি ওয়াশরুমেও ফোন নিয়ে যান।

চিকিৎসানোমোফোবিয়া এখনো পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত কোনো রোগ নয়। তাই এই রোগ নির্ণয়ের জন্য যেসব বিশেষ কোনো পদ্ধতিও নেই এবং চিকিৎসাও নেই। তবে যেহুতু এটি একধরনের ফোবিয়া তাই ফোবিয়ার চিকিৎসা  অর্থাৎ মোবাইলের প্রতি আসক্তিটা নিজ থেকে কমাতে হবে। ২০১৫ সালে আইওয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির একজন শিক্ষার্থী এই রোগ নির্ণয়ের জন্য একটি প্রশ্নমালা তৈরি করেছিলেন। প্রায় তিন শ শিক্ষার্থীর ওপর সেই প্রশ্নমালা প্রয়োগ করে সেই শিক্ষার্থীর সফলও হয়েছিলেন। সাধারণত যেসব প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন, তারা যেকোনো ফোবিয়ার স্বাভাবিক লক্ষণগুলোর মাধ্যমেই রোগীর এই রোগ চিহ্নিত করে ফেলতে পারবেন। ওপরে যেসব লক্ষণের কথা বলা হয়েছে, সেসব হঠাৎ দেখা দিলেই একজন মানুষ নোমোফোবিয়ায় আক্রান্ত, এমনটা বলা যাবে না। তবে যদি লক্ষণগুলো ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে টানা বিদ্যমান থাকে, সেক্ষেত্রে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উত্তম।

Advertisements