Skip to content

২২ মে, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | রবিবার | ৮ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল: আধুনিক নার্সিং সেবার অগ্রদূত

ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল। ছিলেন আধুনিক নার্সিং সেবার অগ্রদূত। তিনি একাধারে লেখক, পরিসংখ্যানবিদও। যিনি ‘দ্য লেডি ইউথ দ্য ল্যাম্প’ নামে পরিচিত ছিলেন।

ফ্লোরেন্সের বয়স যখন ১৭ বছর, তখন উচ্চশিক্ষার জন্য তাকে পাঠানো হলো লন্ডনে। কিন্তু গতানুগতিক শিক্ষার প্রতি তার কোনো আগ্রহ ছিল না। সেবাকেই জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করবেন, এই ছিল প্রতিজ্ঞা।

ছোটবেলা থেকে নাইটিঙ্গেলের স্বপ্ন ছিল নার্স হওয়ার। তার বাবা-মা চাননি ফ্লোরেন্স নার্স হোক। কারণ ওই সময়ে নার্সিংকে সম্মানের চোখে দেখা হতো না। তাই তিনি বাড়ি থেকে বের হয়ে যান।

কিভাবে তিনি লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প উপাধিতে ভূষিত হন
কিন্তু সরকার তাকে অনুমতি দিতে চায়নি। কারণ, তখন নারীদের এমন স্বাধীনতা ছিলা না । কিন্তু নাইটিঙ্গেলের অপরিসীম আগ্রহের কারণে শেষমেশ সরকার তাকে প্রিমিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার অনুমতি দিতে বাধ্য হয় ।

যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছে নাইটিঙ্গেল দেখলেন সর্বত্র অব্যবস্থাপনা । নােংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে অবস্থিত হাসপাতাল।

নাইটিঙ্গেল ক্রিমিয়াতে পৌঁছেই হাসপাতাল নামধারী ব্যারাকটিকে একটি পরিপূর্ণ । আধুনিক হাসপাতালে রূপান্তরিত করার চেষ্টা করলেন । নাইটিঙ্গেল তার সঙ্গীদের নিয়ে আহত সৈনিকদের সেবায় সর্বাত্মক আত্মনিয়ােগ করলেন । মা-বােনের ভূমিকা ও দাবি নিয়ে তিনি দাঁড়ালেন আহত, পঙ্গু, যন্ত্রণাকাতর ও ক্ষুধার্ত সৈনিকদের পাশে।

সেখানে যাওয়ার পর ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল আহত সৈনিকদের নােংরা রক্তাক্ত পােশাক ধােলাই করার জন্য নিজেই একটি লিগ স্থাপন করলেন ।

ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল হাসপাতালের সেবাকর্মের ও কর্মপদ্ধতির আমূল পরিবর্তন আনলেন । তিনি আহত সৈনিকদের অবস্থা দেখার জন্য প্রতি রাতে আলাে হাতে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন তাদের শয্যার পাশে। পরম স্নেহে ও মমতায় তাদের সেবা করতে লাগলেন।

তিনি তার সেবা ও মমতায় আহত সৈনিকদের এতাটা শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন যে, ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল যখন আলাে হাতে শয্যার পাশ দিয়ে হেঁটে যেতেন, তখন শয্যায় যে ছায়া পড়তাে, সৈনিকরা পরম শ্রদ্ধায় সেই ছায়ায় চুম্বন করতেন । তারা তাকে ‘লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প’ উপাধিতে ভূষিত করেন।

ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের কর্মজীবন
এই হাসপাতালে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল তার অসাধারণ নিষ্ঠা, শ্রম ও সেবার মনােবৃত্তি দিয়ে অল্প সময়ে সবাইকে বিস্মিত চমৎকৃত করে দিলেন । এরপর নাইটিঙ্গেল লন্ডনের হারল স্ট্রটের এক হাসপাতালে । যােগ দেন সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে ।

ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল বহু হাসপাতালে ও নার্সিং হােমে যাওয়ার ও রােগীদের সেবা ও চিকিৎসা পদ্ধতি দেখার সুযােগ পেয়েছিলেন । এসব হাসপাতালে ব্যাধিগ্রস্ত যন্ত্রণাকাতর মানুষের দুঃখ-কষ্ট দেখেছেন। দেখেছেন অনেক অসহায় মৃত্যু। এসব দেখে দেখেই তার প্রাণে আর্ত মানবতার প্রতি সৃষ্টি হয় গভীর মমতা। অসহায় মানুষের জন্য কেঁদে উঠলো তার হৃদয় । আর তখন থেকেই ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল মানবতার সেবায় নার্সিংকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করার জন্য মানসিকভাবে তৈরি হতে থাকেন ।

বাবা উইলিয়াম এডওয়ার্ড নাইটিঙ্গেল ও মা ফ্রান্সিস নাইটিঙ্গেলের অভিজাত পরিবারে ১৮২০ সালের ১২ মে মাসে ইতালির ফ্লোরেন্সে জন্মগ্রহণ করেন। মা-বাবা ইটালির ফ্লোরেন্স শহরের সঙ্গে মিলিয়ে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের নামকরণ করেন৷

ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের স্বপ্ন
ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের আশা ছিলা তিনি একটি নার্সিং স্কুল প্রতিষ্ঠা করবেন । এজন্যে তিনি ৪০ হাজার পাউন্ডও সংগ্রহ করেছিলেন । কিন্তু আকস্মিকভাবে তিনি প্যারালাইসিসে পঙ্গু হয়ে পড়েন।

নাইটিঙ্গেল নব্বই বছর বেঁচেছিলেন । কিন্তু জীবনের অর্ধেকেরও বেশি সময় কেটেছে পঙ্গু অবস্থায় । তবু পঙ্গু অবস্থাতেও বিছানায় শুয়ে শুয়ে চালিয়ে গেছেন তার সেবার কাজ ।

তার আন্তরিক চেষ্টায় অসুস্থ অবস্থায়ও ১৮৬৯ সালে লন্ডনের সেন্ট টমাস হাসপাতালে স্থাপিত হয় নার্স ট্রেনিং স্কুল ।

তারই অনুপ্রেরণায় দেশে-বিদেশে গড়ে উঠেছে নার্সিং আন্দোলন, প্রতিষ্ঠিত হয়েছে নার্সিং স্কুল। অবহেলিত নার্সিং-ই হয়ে উঠেছে সম্মানের ও আদরণীয় পেশা । নতুন যুগের মেয়েরা এই পেশাকেই এখন গ্রহণ করেছেন ব্রত হিসেবে ।

ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের মৃত্যু

অবশেষে ১৯১০ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ আগস্ট ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল তার স্বদেশের মাটিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন । ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল মারা গেলেও তার সেবার আদর্শের কথা সারা বিশ্বের মানুষের মনে জাগরুক হয়ে আছে ।