Skip to content

১৭ই মে, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ | শুক্রবার | ৩রা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

কন্যাসন্তানের প্রতি বৈষম্য দূর হবে কবে

সমাজ আজও পরিবর্তন হয়নি। কন্যা সন্তানের জন্য রয়েছে অবজ্ঞা, অবহেলা। কিন্তু ছেলে সন্তানের জন্য ঠিক ততোটাই প্রাগাঢ় ভালোবাসা। আমরা জানি, পরিবার শিশুর প্রাথমিক শিক্ষালয়। তবে এই পরিবারেই শুরু কন্যা শিশুর সঙ্গে বৈষম্য। একটি পরিবারে যদি ছেলে ও মেয়ে সন্তান উভয়ই থাকে তবে সেক্ষেত্রে এই বৈষম্য স্পষ্ট পরিদৃশ্যমান হয়। ছেলে শিশুর ক্ষেত্রে যা শোভনীয় কন্যা শিশুর ক্ষেত্রে তা একেবারেই অশোভন। শুধু তাই নয় কন্যা শিশুর ক্ষেত্রে বিধিনিষেধের এত প্রবল-প্রকট বোঝা আরোপিত হয় যে, তা বহন করতে করতে মেয়েরা একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়ে। আমাদের সমাজে আজও এর নগ্ন চিত্র প্রতিটি ঘরে-ঘরে বিদ্যমান। কেন বাবা-মা তারই ঔরসজাত -গর্ভজাত সন্তানের প্রতি এমন বৈষম্য করেন? কেন মা-বাবা ছেলে সন্তানের ক্ষেত্রে যেরকম আচরণে অভ্যস্ত মেয়ের ক্ষেত্রে ঠিক তার বিপরীত?

এর উত্তরগুলো এককথায় দেওয়া আদৌ সম্ভব নয়। তবে এ সমাজে আজও মেয়ে এবং ছেলের মধ্যে পার্থক্য করা হয়। স্বয়ং বাবা-মাই তা বিশেষভাবে করেন। যার ফল সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হয় একজন নারীকে। একটি পরিবারে যদি তিনজন কন্যা সন্তান এবং একজন ছেলে সন্তান থাকে তবে স্বাভাবিকভাবেই এই কন্যাদের কপালে নানাবিধ দুঃখ দেখা দেয়। তবে এ প্রসঙ্গে অনেকে বলতেই পারেন বাবা-মায়ের আদরের একমাত্র ছেলে ফলে তার ওপর ভালোবাসা-যত্ন বেশি হবেই। তবে ঠিক বিপরীত চিত্রও যদি দেখা দেয় সেখানেও মেয়েকে অবহেলিত হতে হয়। অর্থাৎ তিনজন ছেলে এবং একজন মেয়ে হয় তাহলে নিশ্চিত অর্থেই মেয়েকে আদরে রাখার কথা! কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি তা কখনোই ঘটে না।

প্রকৃতার্থে কয়জন ছেলে বা মেয়ে বিষয়টা তা নয়। মূলত ব্যাখ্যাটা এরকম যে, মেয়ে হলেই তাকে বৈষম্যের শিকার হতে হবে। বাবা-মা – আত্মীয়-স্বজনের একটাই বুলি পরের বাড়ির আমানত এত পড়াশোনা করে কী হবে! আর তার আদর-আবদার পূরণ করেই বা কী হবে! অধিকাংশ নারী এর সঙ্গে একমত হবেন যে, মেয়েরা যদি বাবা-মায়ের কাছে ঘুরতে যাওয়ার আবদার করেন অধিকাংশ বাবা-মা আজও মেয়েকে বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে দেশ-বিদেশ পরিভ্রমণের মুলো ঝুলিয়ে দেন!

এ সমাজের কিছু বদ্ধমূল ধারণা আজও কন্যা সন্তানের জন্য অভিশাপ। তবে এর দায় প্রথমত পরিবারের। বাবা-মা তারই ছেলে এবং মেয়ের মধ্যে পার্থক্য করেন। শৈশবে ছেলে সন্তানের জন্য গ্রাম বা শহরের সবচেয়ে ভালো স্কুলে ভর্তি করানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু মেয়ের ক্ষেত্রে একটি হলেই হলো! অর্থাৎ বর্তমান সময়ে এসে যে পর্যন্ত না পড়ালে পাত্রস্থ করা দায় ঠিক সে পর্যন্ত তার সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী পড়াতে চেষ্টা করেন। কোন মেয়ে যদি ভালো অবস্থান করেন – মেধার দৌঁড়ে সেই নারীর কাছেও শোনা যায়, পরিবারের বৈষম্যের নগ্ন চিত্র। একজন ছেলেকে প্রতিষ্ঠিত-ভালোভাবে গড়ে তোলার জন্য যতটা যত্ন-আত্তি প্রয়োজন তার চেয়ে অনেক বেশিই করে থাকেন পরিবার-পরিজন।

এ সমাজের এটাই পরিচিত চিত্র কিন্তু কোন একটি পরিবারের নয়৷ বরং অধিকাংশ পরিবারের চিত্রই এক। মেয়ে সন্তানের ক্ষেত্রে কেন বাবা-মায়ের এত বৈষম্য?

কেন এতটা যন্ত্রণা সহ্য করতে হয় মেয়েদের? নারীর হৃদয়ের হাহাকার কবে বাধার দেওয়াল ভেঙে গুড়িয়ে দিতে পারবে? অনেকের মনে হতেই পারে, পরিবার যদি এতই বৈষম্য করবে তবে নারীরা কিভাবে এত তরতরিয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে? তবে এককথায় উত্তর হবে সেটা সম্পূর্ণ সেই নারী বা মেয়েটির নিজস্ব যোগ্যতা। তার অদম্য লড়াকু মনই তাকে সামনের দিকে এগুতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে সক্ষম ।

কিন্তু অধিকাংশ বাবা-মা আজও সেই অন্ধকার জগতের বাসিন্দা। বর্তমান সময়টা খুবই অস্থিতিশীল। নারী-পুরুষের স্বাধীনচেতা মন, নিজেকে প্রাধান্য দেওয়া, অশান্তিকে এড়িয়ে যাওয়া, মন-চিন্তা-চেতনার মিলের যথেষ্ট অভাবের কারণে সংসার ভাঙছে। তবে এক্ষেত্রে সমাজে আজও আজব কিছু বিষয় খুবই স্পষ্ট। ছেলে সন্তানের ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের শতভাগ সাপোর্ট থাকলেও মেয়ের ক্ষেত্রে তিল পরিমাণও নেই! বাবা-মা তথা পরিবার-পরিজন চান না ছেলে সন্তান অশান্তিতে ঘর করুক। বরং তারাই দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে তাকে অশান্তি থেকে সরিয়ে আনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। এই একই ঘটনা মেয়ের ক্ষেত্রে দেখলে খুব বেশি আশ্চর্য হতে হয়। বাবা-মা তথা পরিবারবর্গ বুঝিয়ে-সুঝিয়ে কন্যাকে তার স্বামীর কাছে পাঠানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। অর্থাৎ তখন তাদের মান-সম্মান-অপমান-অপদস্ত হওয়ার নানারকম প্রথা-কথা প্রচলিত হয়। মেয়ের সমস্যা সম্পর্কে কাকপক্ষীও যেন টের না পান সে ব্যবস্থাও এই পিতা-মাতা তথা পরিবার বর্গই করে থাকেন। কিন্তু এই একি পরিবারে যে ছেলে সন্তানকে বাবা-মা অশান্তি থেকে মুক্ত করতে লাফিয়ে – ঝাঁপিয়ে পড়লেন তাকে আবার পূর্বের তুলনায় চর্তুগুণ অনুষ্ঠান-আতিথেয়তা করে বিয়ে দেওয়া হয়। কারণ একটাই পূর্বের পাত্রীপক্ষকে একটা উচিত জবাব দেওয়া। বিষয়টি হাস্যকর-আশ্চর্যজনক হলেও এ সমাজের চিত্র এটি। অর্থাৎ কন্যা সন্তানের সঙ্গে কোথায় ন্যায় করে পরিবার?

শুধু কী তাই এছাড়াও হাজার হাজার উদাহরণ টানা যাবে, যেখানে মেয়ে এবং ছেলে সন্তানের মধ্যে বৈষম্যের দেওয়াল তোলে পরিবার। আরও কয়েকটি নগ্ন চিত্র দেখা যাক, কোন ছেলে যদি পরিবারে বিয়ে সম্পর্কীয় মত জানায় তবে এক বাক্যে তা গ্রহণ করতে প্রস্তুত পরিবার। এমনকি অনেক পরিবারে দেখা মেলে যে, ছেলের মেয়েবান্ধীর সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের আগেই যোগাযোগ, সাক্ষাৎ, আসা-যাওয়া ঘটে। কিন্তু একই পরিবারে মেয়ে বলা তো দূর ভয়ে সিঁটিয়ে থাকেন। এগুলো খুবই আলগা ঘটনা এ সমাজের। এবার একটু গভীরতা মাপা যাক, এই মেয়ের জন্য বাবা-মায়ের চিন্তা-দুঃশ্চিতার শেষ নেই। সেটা কী ধরনের? কোন পাত্রের হাতে কন্যাকে তুলে দেবেন। সকাল-বিকেল এক করে ভাবতে বসেন বাবা-মা তথা পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু অধিকাংশই একবারও কন্যাকে স্বাবলম্বী, উচ্চশিক্ষিত করার ব্যবস্থা করেন না!

সমাজের দিকে লক্ষ করলে নিমিষেই বুঝতে সক্ষম হবেন যে, কোন মেয়েই আজও বাবার বাড়ির সম্পত্তি শতভাগ বুঝে পান না। এক্ষেত্রে যেহেতু আইন করে সম্পদ বণ্টনের বিষয় প্রচলিত তথা ইসলামী আইনে যে পরিমাণ সম্পদ ভাগ পাওয়ার কথা বাবার সম্পত্তির – বণ্টনের ক্ষেত্রে মেলে তার উল্টো। বাবা-মা মেয়ে সন্তানকে যেটুকু একেবারেই না দিলে সমাজে সম্মান রাখা দায় হয়ে পড়ে ততটুকু দিতে চান। আর যাদের সম্মানের বালাই নেই তারা তো সেটুকুতেও ফাঁক রাখেন! তবে আমাদের পরিবারগুলো অতি চতুর কিছু যুক্তি-বুদ্ধি উপস্থাপন করেন। মেয়ে সন্তানকে এমনভাবে শৈশব থেকে ব্রেন ওয়াশ করতে থাকেন যে, একটা সময় গিয়ে অধিকাংশ মেয়ে তার ভাগটা ছেড়ে দেন স্বাচ্ছন্দ্যে৷ কারণ আবেগ! যদিও আবেগের ফলে তাদের ভাগ্যে কিছুই জোটে না কিন্তু আলগা আবেগে এই নারীরা ঠিক সেটা করে বসেন। আমাদের সমাজে পরিবারের তো অনেক দায়। কিন্তু তারা একজন মেয়ে সন্তানের জন্য কতটা দায়কে দায়িত্ব নিয়ে পালন করার বা পাশে থাকার চেষ্টা করেন?

শৈশব থেকে যে বৈষম্য ছেলে এবং মেয়ের মধ্যে শুরু হয় কোথায় তার শেষ? যে মা তারই মেয়ের সঙ্গে বৈষম্য করছেন তিনিও নারী! তাহলে তিনি কেন সোচ্চার হোন না? কারণ তিনি পুরুষতন্ত্রের আজ্ঞাবহ। স্বামী-সন্তানের কথার বাইরে তার কথা বলা সাজে না। সেটা এ সমাজে মারাত্মক পাপ! আর অধিকাংশ নারীই মজ্জাগতভাবে নিজের সঙ্গে যা ঘটে অন্য নারীর সঙ্গে তা ঘটবে বা ঘটুক এ বিষয় নিয়ে মাথা ঘামান না৷ কারণ তিনি শৈশব থেকেই কিছু বুলি শিখেই বড় হন।

এই নারীদের মধ্যে শিক্ষা, জানা-বোঝা-জ্ঞান বৃদ্ধি করতে হবে। যদি নারীরা জ্ঞান অর্জন করেন তবেই নিজের সম্পর্কে সচেতন হতে পারবেন। কন্যা সন্তানের প্রতি বৈষম্য দূর করতে হলেও নারীকে সোচ্চার হতে হবে। মায়ের সঙ্গে যা ঘটেছে মেয়ের সঙ্গে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলে তাহলে কোথায় নারী মুক্তি! নারী নয় মানুষ হয়ে উঠতে হবে। বাধার দেয়াল ডিঙিয়ে সব অপশক্তিকে চুরমার করে নারী তার আপন পৃথিবী রচনা করুক। নতুবা নারীর মুক্তি নেই, বৈষম্যের সুরাহাও নেই। তাই কন্যা সন্তানকে পূর্ণ মর্যাদা দিতে বৈষম্য দূরীকরণ আবশ্যক।

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ