Skip to content

২২শে ফেব্রুয়ারী, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ | বৃহস্পতিবার | ৯ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

গণপরিবহনে নারীর দুর্ভোগ: প্রতিকারের উদ্যোগ নেই!

আমাদের সমাজে নারীরা বিভিন্নভাবে নিপীড়নের শিকার। তার মধ্যে অন্যতম ‘গণপরিবহনে নারী নির্যাতন’। দেশের ৫০.৪ শতাংশ নারী হলেও আজবধি গণপরিবহন নারীবান্ধব নয়। নারীরা প্রতিনিয়ত যৌন-হয়রানি, ধর্ষণের মতো ঘটনার শিকার হচ্ছে। অথচ প্রতিকারের কোনো উদ্যোগ আজও নেওয়া হয়নি! যা দিয়ে নারীরা এ ধরনের সমস্যা থেকে কিছুটা পরিত্রাণ পেতে পারে। পত্র-পত্রিকা, মিডিয়াতে, কলামে নানাভাবে নারীদের এমন দুর্ভোগের কথা গুরুত্বসহকালে বলা হলেও কর্তৃপক্ষ আজও যেন এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে নারাজ। নারীদের নিয়ে কাজ করা সংগঠনের চালানো এক জরিপে দেখা গেছে, প্রতিদিন ১০ লাখ নারী গণপরিবহনে যাতায়াত করেন। এই বৃহৎ অংশের প্রত্যেক নারীই কোনো-না-কোনোভাবে যৌন হেনস্তার শিকার!

আমরা জানি, জনবহুল ঢাকা শহরে গণপরিবহনে উঠতে-নামতে পুরুষের সঙ্গে পাল্লা দিতে হয়। এমনকি যখন অতিরিক্ত ভিড় হয় তখন বাসগুলো তাদের গেট লক করে রাখেন। এক্ষেত্রে নারীদের বিপাকে পড়তে হয়। আবার কোনো গণপরিবহনে যদি নারী উঠেও পড়েন সেখানে তাকে নানা কটূবাক্য শুনতে হয়। বিষয়টা এমন যে, নারীদের রাস্তায় বের হওয়ায় যেন খুব দোষের। অথচ সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশানুযায়ী, নারীদের জন্য বরাদ্দ কেবল ৯টি আসন যা চাহিদার তুলনায় খুব কম। তার ওপর বরাদ্দ সিট নারীরা অধিকাংশ সময় পান না। আবার যদি কোনো নারী সিটে বসেও থাকেন দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষ নানা মন্তব্য করেন! এ থেকে পরিত্রাণ পেতে নারীদের আর কতকাল অপেক্ষা করা লাগবে! এখনই কি নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত নয়!

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, কর্মজীবী নারীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫.৬ শতাংশ। তবে এই নারীদের অধিকাংশ মধ্যবিত্ত-নিম্ন মধ্যবিত্ত হওয়ায় তাদের প্রায় অধিকাংশই গণপরিবহনে যাতায়াত করেন। সামর্থ্য অনুযায়ী এই নারীরা যখন চলাচল করেন তখনই সমাজের কদর্য দৃষ্টি তাদের গিলে খায়। পুরুষদের সঙ্গে নারীরাও সমানতালে এগুতে গিয়ে পুরুষদের থেকেই হেনস্তার শিকার হতে হচ্ছে নারীকে।

প্রতিনিয়ত রাজধানী ঢাকা এবং বাংলাদেশের প্রায় সব এলাকায় নারীরা চলাচল করতে গণপরিবহন বেশি ব্যবহার করে থাকেন। তবে অধিকাংশ গণপরিবহন চালক এবং এর হেলপার, কন্ডাকটর নারীদের সঙ্গে বিশ্রী আচরণ করে। গণপরিবহনে ওঠা এবং নামানোর ক্ষেত্রে যেভাবেই হোক নারীকে স্পর্শ করা তাদের মোটিফ। এবং বিষয়টা এমন নাটকীয়ভাবে করে যেন সবই স্বাভাবিক!

ব্র্যাকের গবেষণা বলছে, গণপরিবহন চলাচলকৃত নারীদের ৯৪ শতাংশ নারীরা মৌখিক বা শারীরিক হয়রানির শিকার হন। ব্র্যাকের ‘নারীর জন্য যৌন হয়রানি ও দুর্ঘটনামুক্ত সড়ক’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে, শারীরিকভাবে যৌন -হয়রানির ক্ষেত্রে ৮১ শতাংশ নারীর বক্তব্য, তারা চুপ থাকেন এবং ৭৯ শতাংশ বলেছেন, তারা স্থান পরিত্যাগ করেন বা গণপরিবহন থেকেই নামতে বাধ্য হন।

এক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত যতটুকু উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে তা উপযুক্ত নয়। সরকারি হস্তক্ষেপে কিছুসংখ্যক বাসে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং তেরটি শহরে ১৬টি একতালা ও দোতালা মহিলা বাস সার্ভিস চালু করা হয়। এছাড়া বাসচালক ও হেল্পারের নামের তালিকাভুক্তও করা হয়। তবে তা যথেষ্ট নয়। শুধু তাই নয় বরং ২০১৮ সালে রাজধানীতে ‘দোলনচাঁপা’ মহিলা বাস সার্ভিস চালু হলেও তার মধ্যে শুধু ১টি সচল রয়েছে। যা খুবই হতাশাজনক। অন্যদিকে, বিআরটিসির ২২টি বাসের মধ্যে হাতে গোণা কয়েকটি চালু আছে। যা চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট নয়। নারীদের নিরাপত্তার কথা আমাদেরই ভাবতে হবে। সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। যাতে নারীকে নিরাপত্তাজনিত কারণে ভুগতে না হয়।

সময় এসেছে অন্যভাবে ভাবনা-চিন্তা করার। যেহেতু সরকার নারীর ক্ষমতায়ন বৃদ্ধির লক্ষে নানাবিধ উদ্যোগ গ্রহণ করছেন এবং সে মোতাবেক কাজ করার চেষ্টাও চলছে। যা সত্যি প্রশংসনীয়। তবে হ্যাঁ, নারীর ক্ষমতায়ন বৃদ্ধিতে, নারীকে আরও এগিয়ে নিতে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ জরুরি। নারীরা যদি অনিরাপদ থাকে বা নিরাপত্তার অভাববোধ করে তবে তাদের প্রতিবন্ধকতা আরও বাড়বে।

তাই নারীদের দুর্ভোগ কমাতে এখনই কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। পাশাপাশি নারীদের জন্য আলাদা বাস সার্ভিস চালু করতে হবে। এবং শুধু বাস সার্ভিস চালু করলেই হবে না, সেই বাসের ড্রাইভার, হেল্পার সবই নারী হতে হবে। তার জন্য নারীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে গণপরিবহনে নারীরা কোনরকম অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সম্মুখীন না হন। এলক্ষে সরকারকে নতুন প্রজেক্ট গ্রহণ এবং উপর্যুপরি বাস্তবায়ন করতে হবে। যেহেতু নারীদের এগিয়ে নিতে বর্তমান সরকার ভূয়সী প্রশংসার দাবিদার ফলে তার সরকারকে নারীদের নিরপত্তার স্বার্থে নতুন করে ভাবতে হবে এখনই।

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ