Skip to content

১লা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | শনিবার | ১৬ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

বিবাহিত নারীরা যে কারণে অপুষ্টিতে ভুগছেন

আমাদের দেশের নারীদের স্বাস্থ্য নিয়ে সুখকর কোনো তথ্য আপাতত নেই। অতীতেও ছিল না। বরাবরই নারীরা ভঙ্গুর স্বাস্থ্যের অধিকারী। কন্যাশিশু থেকে শুরু বিবাহিত নারী বেশিরভাগই অপুষ্টিতে ভুগছেন। তবে বিবাহিত নারীরা সবচেয়ে বেশি অপুষ্টিতে ভুগছেন।

গত মঙ্গলবার (১৬ আগস্ট) আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশে (আইসিডিডিআরবি) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দেশের নারীদের পুষ্টি পরিস্থিতি নিয়ে এ তথ্য দেওয়া হয়।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, দেশে ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী বিবাহিত নারীর সংখ্যা তিন কোটি ৮০ লাখ। তাদের মধ্যে ৫০ লাখ নারীর ওজন প্রয়োজনের তুলনায় কম, অর্থাৎ তারা অপুষ্টিতে ভুগছেন।

অন্যদিকে এক কোটি ২০ লাখ নারীর ওজন প্রয়োজনের চেয়ে বেশি। তারা নারী স্থূল। অপুষ্টির কারণেই তারা স্থূল। এর অর্থ হচ্ছে ওই বয়সী ৪৫ শতাংশ নারী অপুষ্টিতে ভুগছেন।

২০০৭ থেকে ২০১৭ সালের জনমিতি, স্বাস্থ্য ও পুষ্টির তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশে বিবাহিত নারীদের মধ্যে ওজন স্বল্পতাজনিত অপুষ্টি উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। ২০০৭ সালে ছিল ৩০ শতাংশ । ২০১৭-১৮ সালে তা কমে ১২ শতাংশে দাড়ায়। অন্যদিকে ২০০৭ সালে ওই বয়সী ১২ শতাংশ নারী ছিল স্থূল। ২০১৭-১৮ সালে তা বেড়ে হয় ৩২ শতাংশ। অর্থাৎ ১০ বছরের ব্যবধানে সার্বিকভাবে পুষ্টি পরিস্থিতির কিছুটা হলেও অবনতি হয়েছে।

ডা. লেলিন চৌধুরী

জানতে চাইলে ‘হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতাল’-এর চেয়ারম্যান ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘সাধারণ পরিবারগুলোতে একজন বিবাহিত নারী খাবার খায় স্বামী সন্তানকে খাওয়ানোর পরে। এক্ষেত্রে খাবারের অবশিষ্টাংশই তারা গ্রহণ করে। এটি তাদের অপুষ্টিতে ভোগার একটি বড় কারণ। দ্বিতীয়ত, আমাদের দেশের নারী বা পুরুষ কেউ সুষম খাবার বলতে কী বোঝায়, তা জানে না। তারা ভাত খাওয়ার জন্য তরকারি খায়। শাকসবজি ও ফলমূল যে খাবারের একটি অংশ, সে হিসেবে তারা খায় না। অর্থাৎ পুষ্টিসম্পর্কিত পূর্ণাঙ্গ ধারণা না থাকায় কোন খাবার খেতে হবে, সে ব্যাপারে তাদের জানাশোনা কম।’

ডা. লেলিন চৌধুরী আরও বলেন, ‘আবার অনেকেই ভালো খাবার বলতে মাছ-মাংসই বোঝেন। মাছ-মাংস বাদে শাকসবজি বা ডালের মাধ্যমেও যে প্রোটিন পাওয়া যায়, তাও তারা জানে না৷ দ্বিতীয়ত নিজের শরীর নিজেকেই দেখতে হবে এই বোধের অভাব।’

একইভাবে স্বামাজিক নিয়মনীতিকেই দায়ী করেন ডাক্তার মাহবুব ময়ূখ রিশাদ। তার মতে, পরিবারের সবার শেষে নারীর অবিশিষ্টাংস খাওয়াকে অনেকাংশে দায়ী। তিনি বলেন, ‘ নারীর শারীরিক কিছু প্রক্রিয়া ও রোগও রয়েছে। যেমন, পিরিয়ড, জরায়ুজনিত কিছু রোগ, গর্ভধারণ ইত্যাদি। এমন বিশেষ বিশেষ কিছু সময়ে বেশি নিউট্রশনেট দরকার হয়। কিন্তু তারা শরীরকে তা পরিপূর্ণভাবে দিতে পারে না। আবার অনেকের পিরিয়ডের অস্বাভাবিকতা থাকে।’

মাহবুব ময়ূখ রিশাদ

ডা. রিশাদ বলেন, ‘অপুষ্টিতে ভোগা নারীর সংখ্যা শহরের দিকে একটু কম দেখা যায়, তবে গ্রামের দিকে অপুষ্টিতে ভোগা নারীর সংখ্যা বেশি। ’

দেশে সরকারি, বেসরকারি এত উদ্যোগ, এত সচেতনতা সৃষ্টির প্রচেষ্টা। তবুও কেন উন্নতি নেই? এমন প্রশ্নের জবাবে লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘পুষ্টি সম্পর্কিত যে আচরণ, তা বদলাতে হলে শুধু বাইরের কোনো উদ্যোগেই কাজ হবে না। এটি পরিবারের সদস্যদের মর্মমূলে পৌঁছাতে হবে, বিশেষ করে পুরুষ সদস্যদের। কারণ, পুরুষ সদস্যরা যদি তাদের পরিবারের নারী সদস্যদের একই অবস্থানে তুলে না আনে, তবে নারীরা অগ্রসর হতে পারবে না।’

ডা. লেলিন চৌধুরী আরও বলেন, ‘আমাদের দেশে এখনো বিবাহিত নারীরা দ্বিতীয় লিঙ্গের ভূমিকা পালন করে। আমাদের সমাজে পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে পুরুষেরা এবং সেটিকে কেবল সহযোগিতা করে নারীরা। এই জায়গা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। অর্থাৎ সমগ্র অর্থে নারীর শিক্ষা, নারীর অর্থনৈতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নারীর স্বাধীনতা; সব মিলিয়ে নারীর ক্ষমতায়নকে প্রাধান্য না দিলে তাদের সামনে আনা যাবে না। সেটা যে ক্ষেত্রেই হোক।’