Skip to content

৪ঠা মে, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ | শনিবার | ২১শে বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

কম্পিউটারকে প্রথম ভাষা দিয়েছিলেন অ্যাডা লাভলেস

কম্পিউটারকে প্রথম ভাষা দিয়েছিলেন অ্যাডা লাভলেস

বিখ্যাত ব্রিটিশ কবি লর্ড বায়রনের নাম শোনেনি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। তার কন্যা অ্যানা লাভলেসের খ্যাতিও নেহাৎ কম নয়। তবে শুধু পিতার খ্যাতির জন্যেই কিংবা পিতার উৎসর্গীকৃত কোনো রচনার জন্যেই লাভলেস এতটা জনপ্রিয় নন। বরং পৃথিবীর প্রথম কম্পিউটার প্রোগ্রামার হিসেবেই তিনি অধিক পরিচিত। হ্যাঁ, একথা সত্য উনিশ শতকে কম্পিউটারের মতো গণনাকারী যন্ত্রের আবিষ্কার ছিলো যুগান্তকারী। কিন্তু পৃথিবীর প্রথম প্রোগ্রামারের কথা কি কেউ কখনো খুঁজে দেখেছে? সম্ভবত কেউই দেখেনি। যন্ত্রের মাঝে প্রাণ সঞ্চার করার জন্যে প্রোগ্রামিং এর বিকল্প নেই। সেই প্রোগ্রামিং এর হাতেখড়ি যখন অ্যাডা লাভলেস সমগ্র বিশ্বকে দেখিয়ে গেছেন, তখন তার গল্প না জানাটা অন্যায়।

অ্যাডা লাভলেস ছিলেন একজন শখের গণিতবিদ। বিজ্ঞানের প্রতি কৌতূহলের পাশাপাশি তিনি কবিতাও লিখতেন টুকিটাকি। শক্তিমান কবির কন্যা বাবার লেখার প্রভাব অনেকটাই পাশ ফিরে যেতেন। সেখান থেকেই তার নিজের ব্যক্তিত্ব ও স্বাধীনচেতা মনের প্রকাশ পাওয়া যায়। সম্ভবত এই নিজেকে মেলে দেয়ার প্রবণতাই তাকে নতুন কিছু করে ফেলার ক্ষমতা জুগিয়েছিলো। একথা তো ভাবতেই হবে, উনিশ শতকের ইউরোপে নারীরা তখনো এতটা অধিকার সচেতন হয়ে উঠেন নি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাতেও তাদের অংশগ্রহণ এতটা সুনিশ্চিত এবং বাধা-বিঘ্নহীন ছিলোনা। তাই শখে কিংবা নিজ আগ্রহেই স্বশিক্ষিত হয়ে উঠতে হতো। অ্যাডা অবশ্য নিজেকে বিশ্লেষক এবং দার্শনিক দাবী করতেই পছন্দ করতেন। মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি, আবেগ ও সংবেদন প্রক্রিয়া নিয়ে তার বিষদ আগ্রহ ছিলো। নিজের গাণিতিক সংশয়গুলোর সাথে তিনি কবিতাকে গুলিয়ে ফেলতেন। সেখান থেকেই অনেক সমালোচক পয়েটিক্যাল সায়েন্স শব্দটি ব্যবহার শুরু করেন।

অ্যাডা অবশ্য যে সময়ের সে সময়ে কম্পিউটার তার আধুনিক রূপ লাভ করেনি। আরো প্রায় একশো বছর পর ১৯৩৫-৩৬ সালে পৃথিবী আধুনিক কম্পিউটার চাক্ষুষ দেখার সুযোগ লাভ করবে। তার আগে সামান্য গাণিতিক গণনাকারী যন্ত্র হিসেবে পরিচিত কম্পিউটারে ছিলোনা প্রাণ। আর কম্পিউটারকে নতুন ভাষা দেয়ার কাজটা খুব সহজ কিছুনা। অ্যাডা লাভলেস তার সংক্ষিপ্ত জীবনে সেই কঠিন কাজকেই করে দেখিয়েছিলেন।

অ্যাডার শখের জ্ঞানচর্চা হয়তো অনেককেই ভুল ধারণা দিয়ে বসতে পারে। ব্যক্তিগত জীবনে অ্যাডাকে বহু ধকল সইতে হয়েছে। ১৮১৫ সালের ১০ ডিসেম্বর অ্যাডার জন্ম লন্ডনে। বড় হওয়ার আগ পর্যন্ত বাবার সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিলোনা অ্যাডার। এর কারণটুকু মর্মান্তিক। লর্ড বায়রন বেশ উচ্ছৃঙ্খল জীবন-যাপন করতেন। তার উপর প্রচণ্ড বদমেজাজি ছিলেন। অনেকটা উন্মাদ প্রকৃতির এই মানুষ অ্যাডার বয়স যখন এক বছর, তখনই গৃহত্যাগ করেন।

পিতার অন্তর্ধান অ্যাডার জন্যে দুর্ভোগ হয়ে দাঁড়ায়। সমগ্র ইউরোপ লর্ড বায়রনকে নিয়ে হৈ হৈ করলেও অ্যাডার জীবনে সেই সুযোগ ছিলোনা। মা ইসাবেলা বায়রন মেয়ের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। তাই তার বৃদ্ধ নানী এগিয়ে আসেন। পিতা-মাতা জীবিত তাও এতিমের মতোই আয়াদের পরিচর্যায় বড় হচ্ছেন অ্যাডা। লেডি বায়রন অবশ্য মেয়ের লেখাপড়ার খোঁজ নিতেন। তিনিই মূলত অ্যাডাকে গণিত ও বিজ্ঞান শিক্ষার দিকে গুরুত্ব দেয়ার তাগাদা দিতেন। মাত্র দশ বছর বয়সে অ্যাডার সুপ্ত সাহিত্য প্রতিভা লেডি বায়রনের মনোযোগ আকর্ষণ করে। অ্যাডা গোপন ডায়রিতে সাহিত্যচর্চা করতেন। তবে লেডি বায়রন তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই হয়তো বিশ্বাস করতেন সাহিত্য মানুষের নৈতিকতা চুরমার করে দেয়। তাই তিনি মেয়েকে সাহিত্য থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেন।

প্রাথমিক শিক্ষা শেষ হলেলেডি বায়রন তার মেয়ের সাথে থাকতে শুরু করে। কিন্তু অ্যাডার পরিচর্যার অভাব ছিলো। অপুষ্টিজনিত কারণে অনেক দুর্বল তিনি। মা ততদিনে ভীষণ বদমেজাজি। বাবার অবহেলার গ্লানি যেন তার ঘাড়েই বর্তায়। মা কোনোভাবেই সহ্য করতে পারতেন না অ্যাডাকে। একে তো প্রচুর বই পরার চাপ আবার ঘরের কাজেও প্রচণ্ড খাটতে হতো অ্যাডাকে। ইসাবেলা অবশ্য চাচ্ছিলেন অ্যাডাকে শক্ত ধাঁতে গড়তে। লর্ড বায়রনের উন্মাদ রক্তকে যেন বাগে আনতে চেয়েছেন। কিন্তু সেখানে একটু হৃদয় দিলে কি খুব ক্ষতি হতো?  

ইংল্যান্ডে তখন সম্ভ্রান্ত ঘরের মেয়েরাই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলো। অ্যাডাও ক্যাওমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ লাভ করেন। সতেরো বছর বয়সেই অ্যাডার জীবনে এক নতুন মোড় আসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের লুক্রেসিয়ান অধ্যাপক তখন চার্লস ব্যাবেজ। সম্মানে তিনি মোটেও কম নন। এই পদে এককালে নিউটন অধ্যাপনা করেছেন। একসময় তিনি অ্যাডা বায়রনের কথা শুনতে পান। লর্ড বায়রনের কন্যা শুনেই যে আগ্রহী হন তা কিন্তু না। গণিত বিভাগের উজ্জ্বলতম ছাত্রী হিসেবে অ্যাডার সুনাম ছিলো। এই সময় ব্যাবেজ ‘ডিফারেন্স ইঞ্জিন’ নিয়ে কাজ করছেন। তিনি অ্যাডাকে সহযোগী হিসেবে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে অ্যাডা এবং তার মাকে পত্র পাঠান। অ্যাডার কাছে এমন আহ্বান ছিলো স্বর্গের টিকেট পাওয়ার মতোই কিছু।

এই আমন্ত্রণের ফলে মা ও মেয়ের সম্পর্ক কিছুটা গাঢ় হয়। ডিফারেন্স ইঞ্জিন দেখে দুজনেই মুগ্ধ। একে নিয়ে কিভাবে কাজ করা যায় তা নিয়েই দুজনে মেতে উঠেন। বরং নানা রকমের যন্ত্রের কলাকৌশল বুঝতেই তারা বিভিন্ন কলকারখানায় যাতায়াত শুরু করেন। এই সময় তারা ‘জ্যাকার্ড লুম’ নামে একটি কাপড় বোনার যন্ত্র দেখে অনুপ্রেরণা লাভ করেন। এই যন্ত্রটি একটি পাঞ্চকার্ডের মাধ্যমে পরিচালনা করা হতো। নির্দিষ্ট পাঞ্চকার্ড নির্দিষ্ট বয়ন শুরু করতো। এখান থেকেই অ্যাডা তার ভবিষ্যৎ আবিষ্কারের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজে পান। একে তিনি নাম দেন “মেশিন কোড।” 

এখানেই পৃথিবীর প্রথম প্রোগ্রামারের জন্ম। নিজের সৃষ্টিক্ষুধাকে টিকিয়ে রাখতে ব্যাবাজের সাথে কাজ করার লোভনীয় সুযোগ ত্যাগ করেন। বরং গণিতের উচ্চতর শাখা-প্রশাখায় নিজের বিচরণভূমি বানিয়ে নেন। গণিত শেখার খাতিরেই সময়ের সেরা গণিতবিদ সমারভিলের সাথে তার গাঢ় বন্ধুত্ব হয়। সমারভিলের সহায়তায় গণিতের জটিলতম সমস্যাগুলো তিনি সমাধান করতে থাকেন। যদিও বায়বেজের ডিফারেন্স ইঞ্জিনকে তিনি একেবারে ভুলে যাননি।

১৮৩৫ সালে লাভলেসের আর্ল উইলিয়াম কিং এর সাথে অ্যাডার বিয়ে হয়। সেখান থেকেই অ্যাডা বায়রন হয়ে ওঠেন অ্যাডা লাভলেস। ১৮৩৬-৩৯ সাল পর্যন্ত অ্যাডার জীবন সুখকর ছিলোনা। তিনটি সন্তান জন্মদানের পর এবং নিজের পরিচর্যা করতে না পারায় গণিত থেকে একদম দূরে চলে যান অ্যাডা। কিন্তু জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা তার কম না। ফিরে এলেন লন্ডনে এবং লন্ডন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক বিখ্যাত গণিতবিদ ডি মরগানের সাথে আবার কাজ শুরু করেন।

১৮৪১ সালেই চার্লস ব্যাবেজ অ্যানালিটিক্যাল ইঞ্জিন নামে আরো উন্নত যন্ত্রের ধারণা দেন। বিষয়টির প্রভাব বুঝিয়ে বলা মুশকিল। তবে ঐ সময়ে অনেকেই যন্ত্রটিকে বুঝে উঠতে পারছিলেন না। লুইজি মেনাব্রিয়া নামে এক ফরাসি ব্যাব্জের তথ্যের উপর ভিত্তি করে একটি বই লিখেন। এর নাম “দ্য স্কেচ অব চার্লস ব্যাবেজ’স অ্যানালিটিক্যাল ইঞ্জিন।” অ্যাডা ইংরেজিতে বইটির প্রাঞ্জল অনুবাদের প্রচেষ্টা করতেন। সফলতার মুখ দেখেছিলেন অ্যাডা। খোদ চার্লস ব্যাবেজ তাকে উৎসাহ দেন। দুবছরের মাথায় অ্যাডা এর দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করেন যেখানে নিজের অসংখ্য নোট দিয়েছিলেন।   

চার্লস ব্যাবেজের আবিষ্কার যুগান্তকারী হলেও একটি বিরাট সমস্যা তাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিলো। তার অ্যানালিটিক্যাল ইঞ্জিন আদপে কিভাবে গানীতিক সমস্যার সমাধান করবে? অ্যাডা এবার এগিয়ে আসেন। তিনিই মূলত অসংখ্য বীজগানিতিক উপায় যোগ করে দেন নোটে। এদিকে ব্যাবেজ বার্নোলি সংখ্যা নামে একটি জটিল সমস্যা কোনোভাবেই সমাধান করতে পারছেন না। এই সমস্যার সমাধান প্রথম করে ফেলেন অ্যাডা। বার্নোলি সংখ্যার অ্যালগরিদম আবিষ্কারের জন্যেই অ্যাডা পৃথিবীর প্রথম প্রোগ্রামার।

অ্যাডা তার সময় থেকে আরো সুদূরপ্রসারী চিন্তা যে করতে পারতেন তার প্রমাণ তার নোট। কম্পিউটার যে শুধু গাণিতিক সমস্যা করবে তাই না। তিনি দ্বিধাহীন কণ্ঠে জানান, গান, ছবি বা অন্যান্য কাজকেও সংখ্যায় রূপান্তর করে কম্পিউটার কাজ করবে। আধুনিক যুগে পরিচিত বাইনারি সংখ্যার এই কল্পনার জন্যেও অ্যাডা একটি অনুপ্রেরণার নাম। সামনে ছিলো অপার সম্ভাবনা। এসময় অ্যাডা অসুস্থ হয়ে পড়েন। জরায়ুর ক্যান্সার শনাক্ত করার মতো আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান তখনো হয়ে ওঠেনি। না বুঝেই ডাক্তাররা তার উপর গ্যালেনের রক্তক্ষরণ পদ্ধতি প্রয়োগ করেন। তাতে আয়ু বরং কমেছিলো অ্যাডার। ১৮৫২ সালে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন এই প্রতিভাবান নারী।

অ্যাডার মৃত্যুতে কাজ আর আগায়নি। চার্লস ব্যাবেজকে অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়তে হয়। অ্যালিটিক্যাল ইঞ্জিন সফল হয়নি। অ্যাডার সেই আফসোস ছিলো কিনা জানা নেই। নিজের বাবাকে তিনি ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন বাবার পাশেই তাকে যেন সমাহিত করা হয়। সেই ইচ্ছে পূরণ হয়েছিলো। নটিংহামের সেন্ট ম্যারি ম্যাগডালিন চার্চের সমাধিক্ষেত্রে পিতার পাশেই সমাহিত এই কৃতী নারী। হয়তো তিনি বেঁচে থাকলে কম্পিউটার আরো উন্নত হয়ে উঠতে পারতো।

তবে অ্যাডার জীবন একজন সাধারণ নারীর জীবনের সংগ্রামের মূর্ত প্রতীক। অ্যাডা প্রবল প্রতিভাবান একজন নারী। কিন্তু তাকেও অসংখ্য যন্ত্রণা, সমস্যা এবং বাধাবিঘ্নের মধ্যে এগিয়ে যেতে হয়েছে। তবু কবিতার জগতকে বিজ্ঞানের জগতের সাথে মিলিয়ে এক সমীকরণের জগত দেখিয়েছেন। পৃথিবীর যেকোনো নারীর জন্যে অ্যাডা একজন সাধারণ সংগ্রামী নারী কিন্তু অসামান্য প্রতিভাবান নারী হিসেবে দুইভাবেই প্রেরণা জুগিয়ে যাবেন। তবে তাকে নিয়ে আলোচনা কি অনেকটাই কম না? সেটাও কিন্তু ভেবে দেখা প্রয়োজন। 

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ