Skip to content

২৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | বৃহস্পতিবার | ১৪ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

ঋতুর পরিবর্তন নিয়ে ট্যাবু কেন?

ভারতীয় বাংলা সিনেমার এক কিংবদন্তি নির্মাতা ছিলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। তৎকালীন বাংলা সিনেমায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছিলেন তিনি। কেবল পরিচালক হিসেবেই নয়, অভিনেতা, গীতিকার, লেখক হিসেবেও তার অবদান অনস্বীকার্য। টলিউড থেকে বলিউড পর্যন্ত রয়েছে তার কাজের বিস্তৃতি।

 

তার প্রথম সিনেমা হীরের আংটি মুক্তি পায় ১৯৯২ সালে। এরপর থেকে একে একে অসাধারণ সব সিনেমা তিনি আমাদের উপহার দিতে থাকেন। তার উল্লেখযোগ্য সিনেমাগুলো হল 'দ্যা লাস্ট লেটার’, 'চিত্রাঙ্গদা', 'উনিশে এপ্রিল', ‘সব চরিত্র কাল্পনিক’, ‘আবহমান’, 'অসুখ’, ‘উৎসব’, ‘শুভ মহরৎ’, ‘চোখের বালি’, 'রেনকোট', 'দহন', 'খেলা', 'আবহমান', 'অন্তরমহল', 'সত্যান্বেষী'। 

 

তবে বিখ্যাত এই নির্মাতাকে নিয়ে অনেকের মাঝেই রয়েছে কানাকানি। ঋতুপর্ণর লিঙ্গ নিয়ে শুরু থেকেই রয়েছে বিতর্ক। কেউ বলে তিনি নাকি পুরুষ, কেউ বলে তিনি নাকি নারী, আবার কেউ বা তাকি হিজরা বা ট্রান্সজেন্ডার হিসেবেও দাবি করে। আবার অনেকেই বলে তিনি ছিলেন একজন রূপান্তরিত নারী। অনেকেই বলেন তিনি ছিলেন সমকামী। এই প্রশ্ন নিয়ে বহু মতামত রয়েছে।

 

আবার অনেকে তাকে রূপান্তরিত নারী হিসেবেও দাবি করেছেন। কিন্তু তা ঠিক নয়। তিনি কখনো রূপান্তরিত হননি। তিনি কখনো নিজেকে পুরোপুরি নারী মনে করতে চাননি। হতেও চাননি। এ ব্যাপারে তিনি বলেছিলেন যে, 'ছোটবেলা থেকেই তো প্রচুর টাকা রোজগার করেছি রে বাবা! অনেকে সেক্স চেঞ্জ করাতে চেয়েও পারে না টাকার কারণে। আমার তো, তা হয়নি কখনো। বিজ্ঞাপনে যখন কাজ করতাম, এখন যা করি তার চেয়ে অনেক বেশি টাকা রোজগার করতাম। কিন্তু সচেতনভাবে সেক্স চেঞ্জ করা থেকে দূরে থেকেছি। প্রচলিত জেন্ডার আইডেনটিটি থেকে বের হয়ে নিজেকে মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতেও পেরেছি আমি।'

 

তিনি ছিলেন একজন স্বঘোষিত সমকামী। পুরুষ হলেও নিজের অন্তরেই লুকিয়ে ছিল নারীত্ব। তার লিঙ্গ নিয়ে হাজারও কুকথা সমালোচনার পরেও নিজের দৃঢ় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ঋতুর জবাব ছিল, 'শিল্পীর কোন লিঙ্গ হয় না'। তার কাছে  যৌনতার সংজ্ঞাটাই ছিল ভিন্ন। সামাজিক লিঙ্গ কোনও পরিচয় হতে পারে না। এটা তিনি শিখেছিলেন তার বাবা-মায়ের কাছে। কেবল সমকামিতা বা তৃতীয় লিঙ্গ নয়, যৌনতা, নারীকেন্দ্রিক চরিত্রের কঠোর সত্যকে বারে বারে পর্দায় তুলে ধরেছিলেন ঋতুপর্ণ। পুরুষতন্ত্র, নীতি-নৈতিকতা, নারী-পুরুষবাচক লিঙ্গ বৈষম্যে তিনি ছিলেন ক্ষুরধার সাহসী।

 

ঋতুপর্ণ মূলত ‘ইউনিসেক্স’ পোশাক পরতেন। পুরোপুরি ছেলেদের পোশাক নয়, আবার মেয়েদেরও নয় এমন পোশাক পরতেন। যেটি কামিজ, সালোয়ার নয় প্যান্ট শার্ট নয়, আবার পাঞ্জাবি, পাজামাও বলা যাবে না তাকে প্রচলিত।

 

বিতর্কের বাইরে ঋতুপর্ণ ঘোষ ছিলেন একজন মানুষ। একজন মানবিক মানুষ। শিল্পীর কোন জেন্ডার হয় না। বরং জেন্ডারকে একমাত্র মহান শিল্পীরাই অতিক্রম করে যেতে পারেন। এটি অতিক্রম করতে যে মহত্ব, মানবিকতা, বিপুল বিস্তারিত যৌনতার সীমারেখা অতিক্রম করা দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন হয়, তার মধ্যে তা বরাবরই ছিল।