Skip to content

১৭ই এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ | বুধবার | ৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

বিশ্বের প্রথম হিজাবি সুপারমডেল

সব দেশেই মডেলিংয়ে আমরা যেসব নারীদের দেখি তারা বাহারি পোশাকের মধ্যে নিজেকে নিজেকে উপস্থাপন করে। খোলামেলা পোশাকেই তাদের বেশি দেখা যায়। বৈশ্বিক এই প্রথার ব্যতিক্রম হলেন মার্কিন-আফ্রিকান নারী হালিমা আদেল। খোলামেলা পোশাকের পরিবর্তে ঢাকা পোশাক ও হিজাব পরিধান করেই বিশ্বমঞ্চে নিজেকে সুপারমডেল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন এই নারী। শুধুমাত্র মুখ এবং হাত-পায়ের তালু অনাবৃত রেখে র‌্যাম্পে হাঁটেন তিনি। পৃথিবীর ইতিহাসে তিনিই হিজাব পরিহিত প্রথম সুপারমডেল।

 

মডেলিংকে যেখানে খোলামেলা পোশাকের সমার্থক হিসাবে ভাবা হয়, সেই ধারণা ভেঙে ফেলেছেন হালিমা। মডেলিংয়ের জন্য নিজেকে না বদলে বরং কাজের ধরনকে বদলাতে বিশ্বাসী হালিমা। সেই বিশ্বাসে ভর করে কেরিয়ারের শুরু থেকে নানা হেনস্থার মুখোমুখি হয়েও আজ তিনি সুপারমডেল।

 

১৯৯৭ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর কেনিয়ার এক শরণার্থী শিবিরে জন্ম হালিমার। মা-বাবা দু’জনেই সোমালিয়ার নাগরিক। হালিমার বয়স যখন ৬ তখন তার পরিবার অভিবাসী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটায় আসে। এখানেই কৈশোর অতিক্রম করেছেন হালিমা আদেন। মিনেসোটার সেন্ট ক্লাউড স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। তার পর সেন্ট ক্লাউড স্টেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হয়েছেন।  স্কুলে প্রথম মুসলিম হোমকামিং কুইনের খেতাবও জিতেছিলেন তিনি।

 

১৯ বছর বয়সে ২০১৬ সালে প্রথম বার বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন হালিমা। মাথায় হিজাব এবং গায়ে বুরকিনি চাপিয়ে ‘মিস মিনেসোটা ইউএসএ’ প্রতিযোগিতায় যখন র‌্যাম্পে হেঁটে আসছিলেন তিনি, তাঁকে দেখে চমকে গিয়েছিলেন বিচারকরা। খোলামেলা পোশাক পরিহিত মডেলদের ভিড়ে তিনিই ছিলেন প্রথম সর্বাঙ্গ আবৃত মডেল। প্রতিযোগিতায় বোরকা আর হিজাব পরে অংশগ্রহণ করেন তিনি। প্রতিযোগিতার পুরোটা সময় শুধু চেহারা বাদে আপাদমস্তক কাপড়ে ঢাকা ছিল এই তরুণীর। সুন্দরী প্রতিযোগিতার অন্যতম পর্ব হলো ‘সুইমস্যুট রাউন্ড’। এ পর্বে প্রতিযোগীরা বিকিনি পরে নিজেদের শারীরিক সৌন্দর্য প্রদর্শন করেন। আর সেখানেই বোরকা আর হিজাব পরে অংশ নেন হালিমা। দুই দিন ধরে চলা এই প্রতিযোগিতায় হালিমার শুধু চেহারাই দেখা গেছে। এবারই প্রথম মিস মিনেসোটা ইউএসএ প্রতিযোগিতার সেমিফাইনালে কোন প্রতিযোগী হিজাব পরে অংশ নিলেন। আর এবারের প্রতিযোগিতার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল— ‘আত্মবিশ্বাসই নারীর সৌন্দর্য’। এদিক দিয়ে হালিমা আদেন পুরোপুরি সফল। বোরকা আর হিজাব পরে কোন সুন্দরী প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া এক অর্থে নিজের আত্মবিশ্বাসেরই প্রতিফলন। এর পরই একটি মডেলিং সংস্থা তাঁকে তিন বছরের চুক্তিতে সই করিয়ে নেয়।

 

মডেলিং ইন্ডাস্ট্রির দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর যে পদক্ষেপ তিনি করেছিলেন ইতিমধ্যেই তা বেশ ফল দিতে শুরু করে দিয়েছিল। কখনও নিউ ইয়র্ক ফ্যাশন উইক, কখনও মিলান ফ্যাশন উইক, কখনও কোনও আন্তর্জাতিক স্তরের ম্যাগাজিনের জন্য ফটোশ্যুট কিংবা বিভিন্ন বিজ্ঞাপনী সংস্থার হয়ে মডেলিং- এই ইন্ডাস্ট্রিতে ক্রমশ তাঁর নাম হচ্ছিল। ২০১৮ সালে ইউনিসেফ-এর ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর হন। ইউনিসেফ-এর সঙ্গে শিশুদের অধিকার নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন। এমনকি বিশ্বের অন্যতম ফ্যাশনভিত্তিক মার্কিন ম্যাগাজিন ‘ভোগ’-এর প্রচ্ছদ কন্যা হয়েছিলেন হালিমা। ‘ভোগ’ এর প্রচ্ছদকন্যা হিসেবেও তিনি ছিলেন প্রথম হিজাবধারী মডেল।

 

তবে তার এই যাত্রায় অনেকেই তাকে অনেক কথা বলেছেন। হালিমা বিশ্বাস করেন, কোন কাজ করতে হলে বাধা আসবেই। তাই বলে লোকের কথা শোনার কোন মানে নেই। যার এগিয়ে যাওয়ার সে এগিয়ে যাবেই। ধর্মীয় বিধি-নিষেধ মেনে কাজ করার জন্য তিনি সুন্দরী প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেন বোরকা আর হিজাব পরিধান করার জন্য। কর্তৃপক্ষ এতে সম্মতিও দেয়। বিভিন্ন আলোচনা- সমালোচনা উপেক্ষা করেই তিনি নিজে যা, তাই উপস্থাপন করেছেন। সবসময়ই হিজাবকে তিনি মাথার মুকুট হিসেবে দেখেছেন।

 

তবে ২০২০ সালে হালিমা মডেলিং ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। হালিমা চেয়েছিলেন তাঁর মতো আরও অনেক মহিলা যারা শুধুমাত্র খোলামেলা পোশাকের কথা বিবেচনা করে মডেলিংয়ে আসতে পারছিলেন না, তাঁদের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠতে। এদিক দিয়ে তিনি অনেকটাই সফল। মুসলিম নারীদেরকে তাদের ধর্মবিশ্বাস আর কাজের মধ্যে সামঞ্জস্য রাখার উপদেশ দিয়ে নিজেই হয়ে দাঁড়ান মুসলিম হিসেবে অনুসরণীয়।

 

 

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ