Skip to content

৫ই মে, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ | রবিবার | ২২শে বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

তাদের বেঁচে থাকা আমাদের হাতে

বনভূমি রক্ষা ও বাঘ সুরক্ষার প্রতি আহবান জানিয়ে  ২০১০ সালের ২৯ জুলাই সেন্ট পিটার্সবার্গে  একটি সম্মেলনের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ২৯ জুলাই বিশ্ব বাঘ দিবস হিসেবে পালন করা হয়। বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১২টি বাঘ সমৃদ্ধ দেশ এ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করে। এই দিবসটিকে, আন্তর্জাতিক বাঘ সম্মেলন দিবস ও বলা হয়। বৈশ্বিক মহামারী করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে এ বছর বাঘ দিবসের কোন জাঁকজমকপূর্ণ  অনুষ্ঠান না হলেও ভার্চুয়ালি নানা সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে। দিবসটির এবারের আন্তর্জান্তিক প্রতিপাদ্য বা স্লোগান  ‘তাদের বেঁচে থাকা আমাদের হাতে’।

 

ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ড লাইফ ফান্ডের তথ্যমতে, একশত বছর আগে পৃথিবীতে বাঘ ছিল এক লাখেরও বেশি। তবে বর্তমানে সে সংখ্যা ৯৬ শতাংশ কমে ৩ হাজার ৯০০টিতে দাঁড়িয়েছে। বন্য প্রাণী সংরক্ষণ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা, গ্লোবাল টাইগার ফোরামের তথ্য  মতে, আগে ১৩ টি বাঘ সমৃদ্ধ দেশ থাকলেও, বর্তমানে  Tiger Range Country (TRC) বা বাঘ সমৃদ্ধ দেশের তালিকা থেকে ভিয়েতনাম বাদ পড়েছে।  বাঘের নয়টি প্রজাতি থেকে বর্তমানে মাত্র ছয়টি প্রজাতি বেঁচে আছে,  সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়েছে তিন প্রজাতি। এর মধ্যে রয়েল বেঙ্গল টাইগার কেবল সুন্দরবনেই পাওয়া যায়। ২০১০ সালের জরিপে সুন্দরবনে  সাড়ে চারশো বাঘ থাকলেও ২০১৫ সালে  পাগমার্ক সমীক্ষা বলছে, সুন্দরবনের বাঘ আছে ১০৬ টি ।

 

অবৈধ শিকার,  বন নষ্ট হওয়া, বন্য প্রাণী ও বাঘের স্থিতির প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস,বনে মিঠা পানির অভাব, বাণিজ্যিক কারণে হত্যা, জলবায়ু পরিবর্তন ও সংরক্ষণের অভাবে বিলুপ্ত হচ্ছে বাঘ। সর্বশেষ  ২০১৯ সালের বাঘ শুমারিতে ক্যামেরা ট্র্যাপিং জরিপ বলছে, সুন্দরবনে ১১৪ টি বাঘ আছে। অর্থাৎ  প্রতি একশ বর্গকিলোমিটারে বাঘ আছে মাত্র দুটি।

 

জাতিসংঘের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সুন্দরবনে চোরা শিকারি ও বাঘের আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে হুমকির মুখে রয়েছে বাঘ। পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নে বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। এ অবস্থায় হারিয়ে যেতে পারে সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার। তাপমাত্রার ক্রমাগত বৃদ্ধিসহ উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সুন্দরবনে টিকে থাকা কয়েকশত বাঘ বিলীন হওয়ার জন্য যথেষ্ট বলছে বিশেষজ্ঞরা।গবেষকদের ধারণা মতে,  ২০৭০ সালের পরে বাংলাদেশে বাঘের জন্য কোন উপযুক্ত জায়গা নাও থাকতে পারে।

 

বাংলাদেশে দিবসটির এবারের স্লোগান ‘বাঘ বাঁচাবে সুন্দরবন, সুন্দরবন বাঁচাবে লক্ষ প্রাণ’। বন সংরক্ষক তপন কুমার দে বলেন, "আমরা বলে থাকি,বাঘ বাঁচলে বন বাঁচবে। কেন বলি? বাঘ হল বনের সার্বক্ষণিক পাহারাদার। যেখানে বাঘ আছে, সেখানে মানুষ যায় না। অর্থাৎ মানুষ না গেলে বন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সুযোগ থাকে না। ফলে বন রক্ষা পায়। বন রক্ষা পেলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে দেশ রক্ষা পায়।"

 

সুন্দরবনের আশপাশের ১৭টি উপজেলার পাঁচ থেকে ছয় লাখ মানুষ সরাসরি বনের ওপর নির্ভরশীল। এদের বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করা খুবই জরুরি। সরাসরি যারা বনের ওপর নির্ভরশীল, এরা বনের বৃক্ষ ও বন্য প্রাণী ধ্বংস করে। প্রায়ই পত্রপত্রিকায় দেখা যায়, বনের হরিণ শিকার হচ্ছে। এভাবে যদি বাঘের খাদ্য কমে যায়, তাহলে বাঘও একসময় বিলুপ্ত হবে।  নিয়ন্ত্রিত যান চলাচল,বাঘ রক্ষায় আবাসস্থল সংরক্ষণ, বনের মধ্যে নিয়ন্ত্রিত পর্যটনের বিকাশ, বিষ দিয়ে মাছ ধরা বন্ধসহ নানা সুপারিশ করেছেন বন বিশেষজ্ঞরা।

 

তাছাড়া এবছর থেকেই শুরু হচ্ছে বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্প, তৈরি করা হয়েছে সেক্টরাল গাইডলাইন। বন অধিদপ্তরের বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের বন সংরক্ষক মোল্যা রেজাউল করিম বলেন, "করোনা পরিস্থিতির কারণে শুধুমাত্র ভার্চুয়াল আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে বাঘদিবসের কার্যক্রম। তবে বাঘ রক্ষায় সরকার ও বন বিভাগ খুবই আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে। এজন্য ইতোমধ্যে আমরা সুন্দরবনের ৫২ শতাংশ বনভূমিকে অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয়েছে। স্মার্ট পেট্রোলিং নানা উদ্যোগে সুন্দরবনে চোরা শিকারিদের দৌরাত্ম্য কমেছে। বাঘ রক্ষায় জনসচেতনতামূলক নানা কার্যক্রম রয়েছে বন বিভাগের। বাঘের জন্য যেসব হুমকি রয়েছে আমরা সেগুলোকে কম করার চেষ্টা করছি। আশা করছি, বন বিভাগের সব কার্যক্রম চলমান থাকলে বাঘ রক্ষায় আমরা সফল হবো।"

 

২০১২ সালের বন্য প্রাণী রক্ষার আইনে শাস্তির বিধান মতে, বন্য প্রাণী  শিকারিদের সর্বনিম্ন তিন বছর ও সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড পাবে। কেউ যদি দ্বিতীয়বার বাঘ হত্যা করে, তাহলে তাদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডও হতে পারে। ভবিষ্যতে সুন্দরবনের বাঘ বাঁচিয়ে  রাখার জন্য আমাদের সচেতন হতে হবে।

 

 

 

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ