Skip to content

২০শে ফেব্রুয়ারী, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ | মঙ্গলবার | ৭ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

মৃত মানুষ সাথে নিয়ে পালিত হয় যে উৎসব

ধর্ম যার যার উৎসব সবার এই প্রথা নিয়েই বাংলাদেশে সকল ধর্মের মানুষ পরিবারের সাথে একত্রে যেকোনো উৎসব উদযাপন করে। শুধু বাংলাদেশেরই নয় পৃথিবীর নানান দেশের মানুষ বিভিন্ন ভাবে পালন করে বিভিন্ন ধরনের উৎসব। বিশ্বজুড়ে রয়েছে বৈচিত্র্যময় কত শত উৎসব। তেমনি একটি উৎসব ফামাদিহানা। যে উৎসবে শুধু জীবিত মানুষই নয় যোগ দেন মৃতরাও।

 

আফ্রিকার একটি দেশ মাদাগাস্কারে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে 'ফ্যামিলি গেট টুগেদার'-এ পরিবারের জীবিত সদস্যদের সাথে সাথে মৃত সদস্যরাও যোগ দেয়। দেশটি ভৌগোলিক ভাবে একটি দ্বীপ এবং পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দ্বীপগুলোর মধ্যে এর অবস্থান চতুর্থ। দেশটির অদ্ভুত এই উৎসবে পরিবারের মৃত সদস্যদের মাটির নিচ থেকে উত্তোলন করে তাদের মৃতদেহ নিয়ে নাচ গান করা হয়। অদ্ভুত এই উৎসবের স্থানীয় নাম 'ফামাদিহানা'। 'ফামাদিহানা'র আক্ষরিক অর্থ "পূর্ব পুরুষদের দেহ ঘুরিয়ে দেওয়া "।

 

একটি পরিবারের সব সদস্যকেই এই উৎসবে একত্রিত করা হয় এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় একসময় পরিবারের সদস্য সংখ্যা প্রায় দু'শো ছাড়িয়ে গেছে। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে  দুই পরিবারের খাওয়া দাওয়ার খরচ বহন করা অনেক ব্যয়বহুল ব্যাপার। তাই একটি পরিবার উৎসবের প্রায় এক বছর আগে থেকেই প্রস্তুতি গ্রহণ  করে। মাদাগাস্কারের 'ফামাদিহানা' আফ্রিকার মৃতদেহকে নিয়ে করা লোকাচারের মধ্যে সবচেয়ে অদ্ভুত।

 

মাদাগাস্কারে মৃত মানুষকে কবর দেওয়ার বিষয়টি বেশ অদ্ভুত কারণ দ্বীপের বেশিরভাগ মানুষ তাদের পরিবারের জন্য দুইটা কবর খনন করে। একটি কবরে শুধু নারী সদস্যদের মৃতদেহ  এবং অপরটিতে পুরুষ সদস্যদের মৃতদেহ থাকে। ভুলেও নারীর কবরে পুরুষ এবং পুরুষের কবরে নারীকে শায়িত করা হয় নাহ। তবে স্বামী স্ত্রীর ক্ষেত্রে নিয়ম শিথিল করা হয়। 

 

প্রতিটি পরিবার ই কবরের পিছনে বিশাল পরিমাণের অর্থ ব্যয় করে। এতোই বেশি খরচ করে যে তাদের বাড়ির চেয়ে গত হওয়া মানুষের কবর বেশি জাঁকজমকপূর্ণ হয়। কারণ মাদাগাস্কারে ধরে নেওয়া হয় যে, বাড়ির সাথে সংযুক্ত কবর যত বেশি জাঁকজমকপূর্ণ ও দামী হয় তার সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান ও ততো উঁচুতে হয়।

 

সাধারণত জুলাই-সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে ফামাদিহানা উৎসব এর আয়োজন করা হয়। মাদাগাস্কার দ্বীপে এই সময় শীত থাকে এবং একজন স্থানীয় জ্যোতির্বিদের মাধ্যমে সময় ঠিক করে নেওয়া হয়। বর্ষাকালে বৃষ্টির আশংকা থাকে এবং গ্রীষ্মকালের উষ্ণ আবহাওয়ায় মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে নাচ-গান করা কষ্টসাধ্য ব্যাপার তাই শীতকালই বেছে নেওয়া হয়।

 

উৎসবের সময় মৃতদেহদের লাশ উত্তোলন করা হয় এবং লাশের কংকালকে উত্তোলনের পর নতুন সাদা কাপড়ে মুড়িয়ে ম্যাটের উপর রাখা হয়। ম্যাট ও সাদা কাপড় দুটোকেই সুগন্ধি মাখানো হয় এবং সুগন্ধি মাখানোর পরে এগুলো পবিত্র হয় বলে ধরে নেওয়া হয়। সাধারণত ম্যাটের বিভিন্ন পাশে পরিবারের সদস্যরা ধরে থাকে। লাশ উত্তোলন করার সময়  সবার হাতে মোমবাতি থাকে। লাশ উত্তোলনের পর যখন নাচ-গানের পর্ব শুরু হয় তখন ম্যাটের চারপাশে যারা ধরে তারা অনেক সাবধানে নড়াচড়া করে যাতে সাদা কাপড়ে মোড়ানো কংকাল পড়ে না যায়।

 

পরিবারের কোন সদস্য কে যদি বাড়ি থেকে দূরে কোথাও কবর দেওয়া হয় তাহলে সেটি পরিবারের সদস্যদের জন্য দুর্ভোগ বয়ে আনবে বলে বিশ্বাস করে মাদাগাস্কার দ্বীপের অধিবাসীরা। তারা আরও বিশ্বাস করে 'ফামাদিহানা' উৎসব এর সময় যদি মৃত ব্যক্তির লাশের সাথে ভালো ব্যবহার করা না হয়,তবে পরজন্মে তাদের আরও বড় বিপদের সম্মুখীন হতে হবে।

 

এই উপমহাদেশে মৃত ব্যক্তির লাশের সাথে অনেক শোক জড়িয়ে থাকে, যখন কোন ব্যক্তিকে চিতায় আগুনে পোড়ানো হয় বা কবরে দাফন করা হয় তখন পরিবেশ আবেগঘন হয়ে যায় এবং আত্মীয়স্বজনরা অতীতের বিভিন্ন স্মৃতি মনে করে কান্নায় ভেঙে পড়েন। মাদাগাস্কারে ঘটনা টি পুরো উল্টো ঘটে। যখন পরিবারের মৃত সদস্যদের লাশ কবর থেকে উত্তোলন করা হয় তখন সবাই হাসতে থাকেন, সেখানে মৃত্যু কোন শোকের বিষয় এ নয়।

 

এই উৎসব এর সময় প্রচুর মদ্যপান করা হয় এমনকি যারা কবরে লাশ উত্তোলন করতে যায় তাদের হাতেও আফ্রিকান রামের বোতল থাকে। যারা লাশকে কাঁধে নিয়ে নৃত্য করেন তারাও আগে মনমতো মদ্যপান করে নেন। মৃতদেহ কবরে শায়িত করার পূর্বে যে ম্যাটটিতে বহন করা হয়েছিল সেটি উৎসবে অংশগ্রহণকারী সকলে স্পর্শ করেন। সবশেষে ম্যাটটিকে পরিবারের সদস্যরা রেখে দেন এই বিশ্বাসে যে এটি পরিবারে সৌভাগ্য বয়ে আনবে। 

 

এই উৎসব এর সময় পরিবারের কর্তা পশু উৎসর্গ করে থাকেন এবং উৎসর্গকৃত পশুর মাংস দিয়ে অতিথিদের আপ্যায়ন করা হয় এবং বাড়তি মাংস স্থানীয় দরিদ্র মানুষের মাঝে বিলিয়ে দেওয়া হয়। 

 

ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, আঠারো শতকের পর এই প্রথা চালু হয়েছে, তবে সঠিক সময়ের খোঁজ কোথাও পাওয়া যায়নি। একটি যুদ্ধের পর নিহত সেনাদের মৃতদেহ দ্বিতীয়বার কবর দেওয়ার ঘটনা থেকেই এই প্রথার প্রচলন হয় বলে ধারণা করা হয়। ঔপনিবেশিক শাসনামলে যখন খ্রিষ্টান মিশনারীদের আগমন ঘটে তখন তারা এই প্রথার বিরোধিতা করেছিল বটে, কিন্তু স্থানীয় মানুষেরা কখনো এই প্রথা পালন থেকে সরে আসে নি।

 

ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় আফ্রিকার দেশগুলোতে মৃতদেহ নিয়ে অদ্ভুত সব প্রথার প্রচলন রয়েছে। মিশরের বিখ্যাত পিরামিডের প্রতিষ্ঠাতা ফারাওদের কথা ধরলেই দেখা যায়, পরকালের জীবনে যাতে কোন কষ্ট না হয়, সেজন্য দাসী ও পোষা প্রাণীদের মমি বানিয়ে ফারাওয়ের মমির পাশে রেখে আসা হতো এবং  সেই সাথে অসংখ্য দামী জিনিসপত্রও দেওয়া হতো। 

 

তবে মাদাগাস্কার দ্বীপের 'ফামাদিহানা' উৎসব বাকি সবকিছুকে ছাড়িয়ে গিয়েছে।  শুধুমাত্র মানুষের বিশ্বাস এর উপর ভর করে এবং অতিরিক্ত খরচ ও ক্যাথলিক মিশনগুলো থেকে বিরোধিতা সত্ত্বেও এই প্রথা বছরের পর বছর চলে আসছে।

 

 

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ