Skip to content

২১শে মে, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ | মঙ্গলবার | ৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

স্বপ্নের সমান উচ্চতায় যে নারীরা!

২৯ শে মে বিশ্ব এভারেস্ট দিবস। ২০০৮ সালে সর্বপ্রথম এভারেস্ট দিবস পালন করা হয়। ১৯৫৩ সালের এই দিনে নিউজিল্যান্ডের এডমন্ড হিলারি এবং নেপালের শেরপা তেনজিং নোরগে একসঙ্গে প্রথম এভারেস্ট জয় করেন। ১৯৮৬ সালে তেনজিং নোরগে ও ২০০৮ সালে স্যার এডমন্ড হিলারি মারা যাওয়ার পর তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে নেপাল সরকার এই দিনটিকে “এভারেস্ট ডে” হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেন। 

 

স্বপ্নের সমান উচ্চতায় যে নারীরা!

 

শৃঙ্গ জয়ের অন্য নাম 'জুনকো তাবেই' 

 

নারী হিসেবে জাপানের জুনকো তাবেই প্রথম পা রাখেন এভারেস্টে। সে যুগে বিভিন্ন দেশের পুরুষরাই সাধারণত পর্বতারোহণে আসতেন। সেখানে পাহাড়ে এক গরিব মেয়ের পাহাড়ে চড়ার দাপট তাই মেনে নিতে পারেনি জাপানের ধনী পুরুষ পর্বতারোহীরা। পদে পদে হেনস্থা হতে হয়েছে তাকে। অল্প বয়সে সে পাহাড়কে ভালবেসে ফেলেছিল। পাহাড়-পর্বত নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল। ক্লাইম্বিংয়ে আগ্রহ থাকলেও, পরিবারের পক্ষে তার এই অভিজাত শখ পূরণের সামর্থ্য ছিল না। এমনিতেই সাত ভাইবোনের সংসারে অভাবের ছাপ সর্বত্র। খাবার জোটে তবে অতিকষ্টে। সবাই তাকে বোঝান, পাহাড় চড়া বড়লোকদের খেলা। অত পয়সা তাদের কই! বাড়ির লোকেরা বলেন, হয় পড়াশুনা কর, না হয় হাতের কাজে মন দাও। কিন্তু পাহাড় যে তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। রোগা-পাতলা মেয়েটা আস্তে আস্তে যেন পালটে যায়। যত বড় হয় ততই সে জেদি হয়ে ওঠে। একদিন ঠিক করে ফেলে পাহাড়ে সে যাবেই। বরফে ঢাকা সাদা পাহাড়, তার শৃঙ্গে পৌঁছে তাকিয়ে দেখবে পৃথিবীটাকে।

 

স্বপ্নের সমান উচ্চতায় যে নারীরা!

 

স্কুল শেষ করে শোয়া ওমেনস ইউনিভার্সিটি থেকে ইংরেজি বিষয়ে স্নাতক হন তিনি। সামান্য টাকা জোগাড় করতে পারলেই ছুটে যান পাহাড়ে। জাপানের কয়েকটি শৃঙ্গও আরোহণ করে ফেলেন কেবলমাত্র স্কি-পোল নিয়ে। তাঁর ইউনিভার্সিটিতে ছেলে শিক্ষার্থীদের একটা গ্রুপ ছিল। সেখানে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা ছিল তার, কিন্তু দেননি। ১৯৬৯ সালে গ্রাজুয়েশনের পরে তিনি লেডিস ক্লাইম্বিং ক্লাব: জাপান (এলএলসি) প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রতিষ্ঠানটির স্লোগান ছিল- "চলো নিজেরাই একটা বিদেশী অভিযানে যাই।" ওই ক্লাবটা তৈরি করার পিছনের কারণ তার প্রতি পুরুষ পর্বতারোহীদের আচরণ। 

 

স্বপ্নের সমান উচ্চতায় যে নারীরা!

এলএলসি’র অভিযানের জন্য দলের স্পন্সর খোঁজার দায়িত্ব পড়েছিল তাঁর ওপর। অনেক চেষ্টা করেও পাচ্ছিলেন না। তাকে তখন প্রতিনিয়ত শুনতে হয়েছে, এসব না করে মেয়েদের উচিত সন্তান পালন করা। টাকা বাঁচাতে তারা রিসাইকেল গাড়ির সিট ব্যবহার করতেন ছোট ছোট ওয়াটারপ্রুফ ব্যাগ ও দস্তানা বানাতে। চায়না থেকে রাজহাঁসের পালক কিনেছিলেন, সেটা ব্যবহার করে নিজেদের স্লিপিং ব্যাগ বানিয়েছিলেন তারা। ওই দলের নেতৃত্বে ছিলেন জুনকো তাবেই। তিনি জানান, যখন তাঁর সন্তানের বয়স তিন বছর, ওই সময়ে জাপানের মেয়েদের ঘরের বাইরে যাওয়া বারণ ছিল। তারা ঘরে রান্না করবে আর স্বামী ও পরিবারের লোকেদের চা এগিয়ে দেবে। এই তাদের কাজ। ভিনদেশের পাহাড়চূড়ায় উঠতে যাব শুনে ফুকুশিমা উপত্যকায় তাই ঢি ঢি পড়ে গেল। সমস্যা হল পাড়া-প্রতিবেশীদের না হয় সামলানো গেল, কিন্তু এত ছোট্ট বাচ্চা রেখে কীভাবে পাহাড়ে যাবে? সাহস জোগালেন স্বামী মাসানুভো তাবেই। তিনি নিজেও পাহাড়ে উঠতে পছন্দ করতেন। সেই স্বামীর ভরসায় বোনের কাছে বাচ্চাকে রেখে রওনা হয়েছিলেন এভারেস্ট প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে। দীর্ঘ ট্রেনিংয়ের পর, ১৯৭৫ সালে কাঠমান্ডু দিয়ে দলটি তাদের অভিযান শুরু করে। তাবেই ছিলেন দলের ডেপুটি লিডার। ১৯৫৩ সালে স্যার অ্যাডমন্ড হিলারি এবং তেনজিং নরগে যে পথে এভারেস্টে ওঠেন তারা সেই পথই অনুসরণ করেন। মে মাসের শুরুর দিকে তারা যখন মাটি থেকে ৬,৩০০ মিটার উচ্চতায় ক্যাম্প করেন, একটা বরফ ধ্বস তাদের ক্যাম্প তছনছ করে দেয়। দলের গাইড এবং মেয়েরা বরফের নিচে চাপা পড়েন।

 

স্বপ্নের সমান উচ্চতায় যে নারীরা!

 

তাবেই ঠিক ৬ মিনিটের জন্যে অজ্ঞান ছিলেন, ততক্ষণে তার শেরপা গাইড তাকে বরফের নিচ থেকে বের করে আনেন। বরফ ধ্বসের ১২ দিন পর, ১৯৭৫ সালের ১৬ মে শেরপা আন শেরিং’কে সঙ্গে নিয়ে জুনকো তাবেই পৃথিবীর প্রথম নারী হিসেবে এভারেস্টের সর্বোচ্চ চূড়া জয় করেন। তখন এভারেস্টের নীচে থেকে ওপর পর্যন্ত দড়ি ফিক্সড করে রাখার ব্যাপার ছিল না। আইসফল ডক্টররা ছিলেন না অ্যালুমিনিয়ামের মই নিয়ে। স্যাটেলাইটের পাঠানো ওয়েদার রিপোর্ট ছিল না। এভারেস্টের ক্যাম্পে ক্যাম্পে এজেন্সির ফাইভ-স্টার আতিথেয়তা ছিল না। কিন্তু তা স্বত্বেও সব বাধা পেরিয়েছিলেন  জুনকো তাবেই।

শৃঙ্গ জয়ে বঙ্গ ললনা 

ওয়াসফিয়া নাজরীন ও নিশাত মজুমদারকে এক নামে চেনে বিশ্ব। বাংলাদেশের এ দুই কৃতী সন্তান বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ এভারেস্ট জয় করে শুধু দেশবাসীকেই নয়, গোটা পৃথিবীকে দেখিয়ে দিয়েছেন বাংলার নারীদের গৃহবন্দী করে রাখার দিন শেষ। আর সে কারণেই এখন সংসারের কাজ করার পাশাপাশি পরিবারের সচ্ছলতা আনতে এবং দেশের জন্য নিজ মেধাকে ব্যবহারের উদ্দেশ্য নিয়ে গতানুগতিক পেশার বাইরেও চ্যালেঞ্জিং, সৃষ্টিশীল ও বৈচিত্র্যপূর্ণ পেশায় নারীরা সফলভাবে কাজ করছেন। বুদ্ধিজীবী দের মতে, গত এক দশকে বিভিন্ন পেশার নারীর সরব অংশগ্রহণে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটেছে বাংলাদেশে। মেধা ও যোগ্যতা থাকলে সব বাধা-বিপত্তিই যে মোকাবেলা করা সম্ভব, বাংলাদেশের বিভিন্ন পেশার কর্মজীবী নারীরা তা প্রতিনিয়ত প্রমাণ করে যাচ্ছেন। বহির্বিশ্বে বাংলাদেশকে তুলে ধরেছেন এমনই দু’জন নারী হলেন এভারেস্ট জয়ী নিশাত মজুমদার ও ওয়াসফিয়া নাজরীন। 

 

স্বপ্নের সমান উচ্চতায় যে নারীরা!

বাংলাদেশের প্রথম নারী হিসেবে এভারেস্ট জয়ী নিশাত মজুমদার ২০০৩ সালে এভারেস্ট বিজয়ের ৫০ বছর পূর্তিতে বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের আয়োজনে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়া (৩,১৭২ ফুট) কেওক্রাডং জয় করেন। ২০০৬ সালের মার্চে বিশ্ব নারী দিবস উপলক্ষে বিএমটিসি আয়োজিত বাংলাদেশের নারী অভিযাত্রী দলের সঙ্গে ফের কেওক্রাডং চূড়ায় ওঠেন তিনি। একই বছরের সেপ্টেম্বরে বিএমটিসি আয়োজিত নারী অভিযাত্রী দলের সঙ্গে তিনি এভারেস্ট বেস ক্যাম্প (১৭ হাজার ৫০০ ফুট উচ্চতা) ট্র্যাকিংয়ে অংশ নেন। এরপর ২০০৭ সালের মে মাসে বিএমটিসির অর্থায়নে দার্জিলিংয়ের হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট থেকে মৌলিক পর্বতারোহণ প্রশিক্ষণ নিয়ে ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে হিমালয়ের মেরা পর্বতশৃঙ্গ (২১ হাজার ৮৩০ ফুট) জয় করেন। এভারেস্ট অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে পরের বছরের মে মাসে হিমালয়ের সিঙ্গুচুলি পর্বতশৃঙ্গে (২১ হাজার ৩২৮ ফুট) ওঠেন। একই বছরের সেপ্টেম্বরে তিনি ভারতের উত্তর কাশীর গঙ্গোত্রী হিমালয়ের গঙ্গোত্রী-১ পর্বতশৃঙ্গে (২১ হাজার ফুট) বাংলাদেশ-ভারত যৌথ অভিযানে অংশ নেন। নিশাত ২০০৯ সালের এপ্রিলে পৃথিবীর ৫ম উচ্চতম শৃঙ্গ মাকালুতে (২৭ হাজার ৮৬৫ ফুট) ভারত-বাংলাদেশ যৌথ অভিযানে অংশ নেন। নিশাত মজুমদার ২০১২ সালের ১৯ মে শনিবার বাংলাদেশ সময় সকাল নয়টা ৩০ মিনিটে এভারেস্ট চূড়ায় পা রাখেন।

 

স্বপ্নের সমান উচ্চতায় যে নারীরা!

বাংলাদেশ থেকে এভারেস্ট জয়ী দ্বিতীয় নারী ওয়াসফিয়া নাজরীন এর লক্ষ্য ছিল সাত মহাদেশের সাতটি চূড়া জয়। ২০১১ সালের ২ অক্টোবর তিনি আফ্রিকার সর্বোচ্চ পর্বত কিলিমানজারো এবং ২০১১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দক্ষিণ আমেরিকার সর্বোচ্চ পর্বত অ্যাকোনকাগুয়া জয় করেন। ২০১১ সালের জুলাই মাসে ইউরোপের সর্বোচ্চ পর্বত এলবার্সের চূড়ার ৩০০ মিটার নিচে থেকে খারাপ আবহাওয়ার জন্য ফিরে আসেন ওয়াসফিয়া। এছাড়া তিনি ২০০৯ সালে নেপালের লু রী পর্বত, ২০১০ সালে আইল্যান্ড পিক জয় করেন। ২০১৩ সালের ২৮ মার্চ ইউরোপের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এলব্রুস জয় করেন।

 

স্বপ্নের সমান উচ্চতায় যে নারীরা!

 

রাশিয়ার স্থানীয় সময় সকাল সাতটা ৫১ মিনিটে তিনি এলব্রুস চূড়ায় আরোহণ করে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা ওড়ান। ওয়াসফিয়া নাজরীন ২০১২ সালের ২৬ মে শনিবার বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টায় এভারেস্ট চূড়ায় পা রাখেন। তিনি তার এই সাফল্য বাংলাদেশের নারীদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেছিলেন।

 

 

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ