রক্ষণশীল সমাজে আধুনিকতার পথ দেখিয়েছিলেন যে নারী

রক্ষণশীল সমাজে আধুনিকতার পথ দেখিয়েছিলেন যে নারী
ছবি: সংগৃহীত
জ্ঞানদানন্দিনী দেবী পশ্চিমা সংস্কৃতির অনেক কিছুই গ্রহণ করেছিলেন কিন্তু তিনি সাহেবিয়ানা পছন্দ করতেন না। আদর্শ জীবনযাপনের জন্য যতটুকু প্রয়োজন ততোটুকুই তিনি গ্রহণ করেছেন এবং সারাজীবন ইংরেজদের অনুগ্রহ ভিক্ষা করে কাটিয়ে দেওয়াকে অপছন্দ করতেন। তিনি জন্মদিন পালন, বিকেলে বেড়াতে বেড়ানোর দৃষ্টি স্থাপন করেছেন যা বর্তমান সময়ে স্বাভাবিক বিষয় হলেও দেড়শো বছর আগে স্বাভাবিক ছিলো না।

তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজের একজন নারী জ্ঞানদানন্দিনী দেবী। যিনি বাংলার নারীদের দেখিয়েছেন আধুনিকতার পথ। মেয়েদের পোশাকে পরিবর্তন এনে তৈরি করেছেন আধুনিক এবং আরামদায়ক শাড়ি পরার কৌশল। ছোটদের জন্যেও তিনি সমৃদ্ধ সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করতে থাকেন এবং একের পর এক সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে থাকেন  অন্ধকার থেকে আলোর মশাল হাতে রাস্তায় বেরিয়ে পরা এই নারী। তার দেখানো আধুনিকতার ছোঁয়াতেই আজও আমরা আলোকিত হই।


যশোর জেলার নরেন্দ্রপুর গ্রামে ১৮৫০ সালের ২৬ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন জ্ঞানদানন্দিনী দেবী। বাবা অভয়চরণ মুখোপাধ্যায় এবং মা নিস্তারিনী দেবী। মাত্র আট বছর বয়সে কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মেজপুত্র সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন জ্ঞানদানন্দিনী দেবী। অভিজাত ঠাকুর বাড়ির পুত্রবধূর তকমা চাপিয়ে দেওয়া হয় আট বছরের শিশুর উপর এবং শৈশবেই পরতে হয় কঠোর পর্দার মাঝে। 


ঠাকুর বাড়ির পুরনো দাসীদের বধূ নির্বাচনে যশোর পাঠানোর প্রথাটি জ্ঞানদানন্দিনীর ক্ষেত্রেও বহাল ছিলো। বিয়ের সময় সত্যেন্দ্রনাথের বয়স ছিলো সতেরো বছর। পাশ্চাত্য শিক্ষার সঙ্গে সত্যেন্দ্রনাথের ইতিমধ্যে পরিচয় হয়ে গিয়েছিলো এবং নতুন রকমের জীবনযাপন পদ্ধতির ঝলকানি দেখা যাচ্ছিলো তার চোখে। 

মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর বিভিন্ন বিষয়ে রক্ষণশীল হলেও স্ত্রীশিক্ষার ব্যাপারে খুবই উদারমনা ছিলেন। তার প্রথম কন্যা সৌদামিনী দেবী বেথুন স্কুলের একদম প্রথমদিকের ছাত্রী। বাড়ির বৌদের স্কুলে না পাঠালেও তাদের শিক্ষার আয়োজন চলত বাড়িতে। মেয়েদের শিক্ষার জন্য বাড়িতে নিয়মিত বৈষ্ণব এবং ইংরেজ মহিলারা আসতেন। 


মহর্ষির সেজ ছেলে হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মেয়েদের পড়ানোর ব্যাপারে বেশ উৎসাহ ছিল এবং বাড়ির মেয়েরা মাথায় এক হাত ঘোমটা দিয়ে দক্ষিণের বারান্দায় মাদুর বিছিয়ে পড়তে বসতেন। মহর্ষি নিজের উদ্যোগে ব্রাহ্ম সমাজে নবীন আচার্য অযোধ্যানাথ পাকড়াশিকে নিযুক্ত করেন মেয়েদের গৃহশিক্ষক হিসেবে। শুধুমাত্র মেয়েদের শিক্ষার জন্য অনাত্মীয় পুরুষের অন্দরমহলে প্রবেশ  সেই সময়ে সমাজে যথেষ্ট আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলো। সকলের তত্ত্বাবধানে জ্ঞানদানন্দিনীর পড়াশোনা মাইকেলের মেঘনাদবধ কাব্য পর্যন্ত এগলো।


প্রথমবারের মতো ব্রিটিশদের সাথে ভারতীয়রাও সর্বভারতীয় স্তরে আইসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। ১৮৬২ সালে ভারতবাসী যুগান্তকারী খবর পেলো যে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি প্রবেশনারি ট্রেনিং এর জন্য যখন ইংল্যান্ড যান তখন স্ত্রী জ্ঞানদানন্দিনীকেও সাথে নিয়ে যেতে চাইলেন কিন্তু পিতা দেবেন্দ্রনাথ সেটি মানলেন না।

 

১৮৬৪ সালে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন প্রথম ভারতীয় সিভিল সার্ভিস সদস্য হিসেবে ইংল্যান্ড থেকে ফিরলেন তার কর্মস্থল ঠিক হয় বোম্বাই।জ্ঞানদানন্দিনী স্বামীর সাথে বোম্বাইতে গিয়ে বসবাস শুরু করলেন। সেই প্রথমবার রক্ষণশীল বাড়ির চার দেয়ালের বাইরে পা রাখলেন জ্ঞানদানন্দিনী দেবী। কিন্তু বাইরে যাবেন কোন পোশাক পরে?  ঘরের কোণে যাদের জীবন কাটবে, যাদের সাজসজ্জা নিয়ে মাথা ঘামানো অর্থহীন। কোনোক্রমে একটি শাড়ি পেঁচিয়ে রাখতেন যা বাইরে বের হওয়ার উপযুক্ত নয়। অনেক ভাবনা চিন্তার পর ফরাসি দোকানে অর্ডার দিয়ে কিমভুতকিমাকার ওরিয়েন্টাল ড্রেস বানানো হলো কিন্তু পোশাকটি যথেষ্ট অস্বস্তিকর। 

 

সেই সময়ে জ্ঞানদানন্দিনী ভেবেছিলেন, বাঙালি নারীর সর্বত্র স্বাচ্ছন্দ্যে বিচরণের জন্য একটি আদর্শ পোশাক দরকার। বোম্বাইয়ের পারশি পরিবারে গিয়ে জ্ঞানদানন্দিনী লক্ষ্য করলেন তারা শাড়ির আঁচল ডান কাঁধের উপরে পরে।তিনি পদ্ধতিটির সামান্য পরিবর্তন করে আঁচল কাঁধের উপর দিয়ে শাড়ি পরার অভিনব কৌশল তৈরি করেন। জ্ঞানদানন্দিনীর পর কেশবচন্দ্র সেনের কন্যা মহারানী সুনীতি দেবী শাড়িতে আরেক মাত্রা যোগ করেন। সামনের দিকে দুটি ভাঁজ না দিয়ে তিনি বাড়তি কাপড়টুকু কুঁচি দিয়ে পরার সিদ্ধান্ত নেন এবং এ রীতিই এখনও পর্যন্ত প্রচলিত রয়েছে। 

 

জ্ঞানদানন্দিনী দেবী 'বামাবোধিনি পত্রিকা' নামে একটি ম্যাগাজিনে বিজ্ঞাপনও করেছেন তার মতো করে শাড়ি পরার প্রশিক্ষণ দিতে। কলকাতায় তার অনুগত প্রথম দিককার ছাত্রীদের মধ্যে একজন বিহারী লাল গুপ্তা আইসিএস এর স্ত্রী সৌদামিনী গুপ্তা। কলকাতার ব্রাহ্ম নারীদের মধ্যে তা দ্রুত জনপ্রিয়তা পেতে থাকলো "ব্রাহ্মিকা শাড়ি " নামে। এটি পরার ধরনে পরিবর্তিত হয়ে  "বোম্বাই দস্তুর " এবং শেষে ঠাকুরবাড়ির শাড়ি নাম হয়।

 

কলকাতায় থাকাকালীন বাংলায় পড়াশোনা চললেও ইংরেজি একেবারেই জানতেন না জ্ঞানদানন্দিনী দেবী। সত্যেন্দ্রনাথের তত্ত্বাবধানে ইংরেজি, মারাঠি,গুজরাটি,হিন্দি ভাষায় তিনি সাবলীল হয়ে উঠেন। ১৮৬৬ সালে ভাইসরয় লর্ড লরেন্সের দেয়া  ভোজনসভায় স্বামীর সাথে যোগ দিয়ে কলকাতায় জ্ঞানদানন্দিনী উচ্চবর্ণের পরিবারের রীতিনীতি ভাঙলেন। পাথুরিঘাটার প্রসন্ন কুমার ঠাকুর সেখানকার আমন্ত্রিতদের মধ্যে একজন ছিলেন এবং জ্ঞানদানন্দিনীর দৃঢ়তায় তিনি গভীরভাবে ক্ষুব্ধ হলেন এবং ভাইসরয় আবাস ত্যাগ করে চলে যান।


আহমেদাবাদ, সিন্ধুদেশ,কানাডা,মহারাষ্ট্র প্রভৃতি স্থান ঘুরে দু'বছর পর আবার কলকাতায় ফিরলেন জ্ঞানদানন্দিনী। ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে অপরূপ বেশবাসে, পায়ে জুতা ও বিলেতি মোজা পরিহিতা যে নারী ঠাকুর বাড়িতে প্রবেশ করে তার সাথে দু'বছর আগের মেয়েটির আকাশ পাতাল তফাৎ। বাড়ির অধিকাংশ নারী জ্ঞানদানন্দিনীর সঙ্গ বর্জন করলেও তার শাড়ি পরার অভিনব ভঙ্গিমাটি কেউই উপেক্ষা করতে পারে নি। তার শ্বশুর দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরও তার স্বাধীনচেতা মনোভাবকে উদারভাবে মেনে নিতে পারেন নি ফলে ঠাকুর পরিবারে এক ধরনের মতভেদ দেখা যায় বলে শোনা যায়। 


জ্ঞানদানন্দিনী নিজের মতো করে থাকতে জোড়াসাঁকো ছেড়ে কাছেই পার্ক স্ট্রীটে চলে যান।এতো নৈকট্য সত্ত্বেও তাদের দুজনের মধ্যে কখনোই আর দেখা সাক্ষাৎ হয় নি। এসময় তার ছোট দেবর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে তার স্নেহের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পার্ক স্ট্রীটের বাড়িতে তিনি নিয়মিত ভাবেই আসতেন। ১৮৬৯ সালে জ্ঞানদানন্দিনী তার স্বামীর সাথে বোম্বেতে ফিরে যান। সে বছরই তার প্রথম সন্তানের জন্মের কয়েকদিনের মধ্যে তাকে হারান । 

 

১৮৭২ সালে পুত্র সুরেন্দ্রনাথের জন্মের সময় এই দম্পতি পুনায় থাকতেন। পরের বছর কন্যা ইন্দিরা দেবী বিজাপুরে জন্মগ্রহণ করেন। সেসময় ভারতীয় অভিজাত পরিবারগুলোতে শিক্ষিত হিন্দু সম্প্রদায়ের নার্স কিংবা গভের্নেসদের তত্ত্বাবধানে বাচ্চা রাখার একটি সাধারণ রীতি ছিলো। ১৮৭৬ সালে পরিবার থেকে দূর প্রবাসে সিন্ধু প্রদেশের হায়দ্রাবাদে তার তৃতীয় পুত্র কবীন্দ্রনাথের জন্ম হয়।


১৮৭৭ সালে জ্ঞানদানন্দিনী গর্ভবতী অবস্থায় তার তিন সন্তানকে নিয়ে ইংল্যান্ডের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। কোনো পুরুষ সঙ্গবিহীন একা ভারতীয় নারীর সাগর পাড়ি দেওয়া সেই সময়ে শোনা যেত না। তার এই সাহসিকতা সামাজিকভাবে আলোড়ন তৈরি করে। ১৮৭৮ সালের অক্টোবরে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছুটিতে ছোট ভাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে ইংল্যান্ডে যান। রবীন্দ্রনাথ এর সাথে তার সন্তানদের দ্রুত সখ্যতা গড়ে ওঠে। সত্যেন্দ্রনাথের ছুটি শেষে সুরাটে বদলী হয়ে যান এবং জ্ঞানদানন্দিনী সন্তানদের নিয়ে কলকাতায় ফিরে আসেন। 


জ্ঞানদানন্দিনী দেবী পশ্চিমা সংস্কৃতির অনেক কিছুই গ্রহণ করেছিলেন কিন্তু তিনি সাহেবিয়ানা পছন্দ করতেন না। আদর্শ জীবনযাপনের জন্য যতটুকু প্রয়োজন ততোটুকুই তিনি গ্রহণ করেছেন এবং সারাজীবন ইংরেজদের অনুগ্রহ ভিক্ষা করে কাটিয়ে দেওয়াকে অপছন্দ করতেন। তিনি জন্মদিন পালন, বিকেলে বেড়াতে বেড়ানোর দৃষ্টি স্থাপন করেছেন যা বর্তমান সময়ে স্বাভাবিক বিষয় হলেও দেড়শো বছর আগে স্বাভাবিক ছিলো না। 

 

জ্ঞানদানন্দিনী দেবী শিশুদের ছবি আঁকায় উৎসাহ দিতে লিথো প্রেস বসিয়েছিলেন যার ব্যয় তিনি নিজে বহন করতেন। ভারতে কিন্ডারগার্ডেন ও স্ত্রী শিক্ষা নামে দুটি প্রবন্ধ ছাপা হয়। 'ভাউ সাহেবের খবর' মারাঠি রচনার বঙ্গানুবাদ করেন তিনি। এছাড়া তিনি 'ইংরেজ নিন্দা ও স্বদেশ অনুরাগ' নামক একটি প্রবন্ধ লিখেছেন এবং 'সাত ভাই চম্পা',ও 'টাক ডুমাডুম' নামক দুটি রূপকথার নাট্যরূপ দিয়েছিলেন। 

 

জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর সহজভাবে সব কিছু নিজের আয়ত্তে নেওয়ার ক্ষমতা ছিলো। তিনি রবীন্দ্রনাথের নাটক মঞ্চস্থ করার বিষয়েও সাহায্য করেন। তারই প্রেক্ষিতে ঠাকুরবাড়িতে একের পর এক মঞ্চস্থ হতে থাকে 'বাল্মিকী প্রতিভা', 'কালমৃগয়া', 'রাজা ও রাণী ', 'মায়ার খেলা', 'বিসর্জন' ইত্যাদি। 'রাজা ও রাণী' নাটকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাজা বিক্রমের ভূমিকায় এবং জ্ঞানদানন্দিনী দেবী রাণী সুমিত্রার ভূমিকায় অভিনয় করেন। এ অভিনয়কে কেন্দ্র করে তার নামে বঙ্গবাসী পত্রিকায় সেসময় যথেষ্ট কটাক্ষ করা হয়েছিল। 


১৯০৭ সালে জ্ঞানদানন্দিনী দেবী এবং সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, জ্যোতিন্দ্রনাথ ঠাকুর রাঁচিতে বেড়াতে গিয়ে তাদের জায়গাটি ভালো লাগে এবং শেষ জীবন সেখানে কাটানোর মনস্থির করেন। তাঁরা সেখানকার মোরাবাদী পাহাড় কিনে রাস্তা বানান এবং ১৯১০ সালে পাহাড়ের উপর জ্যোতিন্দ্রনাথ 'শান্তিধাম' আর পাহাড়ের নিচে সত্যেন্দ্রনাথ ও জ্ঞানদানন্দিনী 'সত্যধাম' বাড়ি বানান। 


১৯১১ সাল থেকে তাঁরা সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ১৯২৩ সালের ৯ জানুয়ারি সত্যেন্দ্রনাথ পরলোক গমন করেন এবং ১৯২৫ সালে ৪ মার্চ জ্যোতিন্দ্রনাথ প্রয়াত হন।এরপর রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর দুই মাস পরে ১৯৪১ সালের ১ অক্টোবর কলকাতার পাম অ্যাভিনিউ র 'লাল বাংলা' নামে পরিচিত সুরেন্দ্রনাথের বাড়িতে ৯১ বছর বয়সে বার্ধক্যজনিত কারণে মারা যান জ্ঞানদানন্দিনী দেবী।