'অস্টিওপোরোসিস' হাড়ের রোগ

'অস্টিওপোরোসিস' হাড়ের রোগ
ছবি: সংগৃহীত
আমাদের সবারই ৪০ বছর বয়সের পর থেকে হাড়ের ভেতরের ক্যালসিয়াম, ফসফেটের পরিমাণ কমে যেতে থাকে। হাড় হয়ে পড়ে ভঙ্গুর। কোনো ধরনের লক্ষণ প্রকাশ ছাড়াই এই ক্ষয় নীরবে বাড়তে থাকে। সামান্য আঘাতে যখন হাড়ে ফাটল দেখা দেয়, তখনই কেবল ধরা পড়ে অস্টিওপোরোসিস বা হাড় ক্ষয়।

বর্তমানে সারাবিশ্বে অস্টিওপোরোসিস হাড়ের একটি ভয়ংকর রোগ হিসেবে পরিচিত। অস্টিওপোরেসিস হাড়ের ঘনত্ব কমে হাড় ছিদ্রযুক্ত, দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। প্রতি বছর এ রোগে বিশ্বে প্রায় ৯০ লাখেরও বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিবেচনায় বিপজ্জনক রোগের তালিকায় দশম স্থানে রয়েছে অস্টিওপোরোসিস। কিন্তু অনেকই আছেন যারা এ রোগটিকে তেমন গুরুত্ব দেন না। আবার বেশিরভাগ মানুষই রোগটি সম্পর্কে অসচেতন।

 

আমাদের সবারই ৪০ বছর বয়সের পর থেকে হাড়ের ভেতরের ক্যালসিয়াম, ফসফেটের পরিমাণ কমে যেতে থাকে। হাড় হয়ে পড়ে ভঙ্গুর। কোনো ধরনের লক্ষণ প্রকাশ ছাড়াই এই ক্ষয় নীরবে বাড়তে থাকে। সামান্য আঘাতে যখন হাড়ে ফাটল দেখা দেয়, তখনই কেবল ধরা পড়ে অস্টিওপোরোসিস বা হাড় ক্ষয়। অস্টিওপোরেসিসে কোমরের হাড়, মেরুদণ্ড ও হাতের কবজির হাড় ভাঙার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। বিশ্বব্যাপী পঞ্চাশোর্ধ্ব প্রতি তিনজন নারীর মধ্যে একজন এবং প্রতি পাঁচজন পুরুষের মধ্যে একজন ক্ষয়জনিত হাড় ভাঙার সমস্যায় আক্রান্ত। মাত্র ২০ শতাংশ ক্ষয়জনিত হাড় ভাঙা রোগী যথাযথ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার সুযোগ পান।

 

অস্টিওপোরেসিসের ঝুঁকিগুলো বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অস্টিওপোরোসিস বা হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়লেও অন্যান্য কিছু কারণে কারও কারও ক্ষেত্রে বেশি ঝুঁকি দেখা যায়। বংশানুক্রমিক হাড় ক্ষয়ের প্রবণতা, কম ওজন, ধূমপান ও অ্যালকোহল সেবন, হরমোনজনিত রোগ যেমন থাইরয়েড বা প্যারাথাইরয়েড গ্রন্থির জটিলতা, টেস্টোস্টেরনের ঘাটতি, অল্প বয়সে মেনোপজ, কুশিং সিনড্রোম, অন্যান্য রোগ যেমন রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, অন্ত্রের রোগ যেমন ইনফ্লামেটরি বাওয়েল ডিজিজ, সিলিয়াক ডিজিজ, দীর্ঘমেয়াদি কিডনি জটিলতা, দীর্ঘমেয়াদে স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ সেবন, প্রোস্টেট ক্যান্সার ও স্তন ক্যান্সারে ব্যবহৃত ওষুধ, পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি'র ঘাটতি, কায়িক শ্রমের অভাব।

 

অস্টিওপোরোসিস রোগের লক্ষণ:

 

এ রোগ সাধারণত উপসর্গ-বিহীন অবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে থাকে। ভঙ্গুর হওয়ার দরুন সামান্য আঘাত এমনকি হাঁচি-কাশি বা জোরে কোনো কাজ করতে গেলে হাড় ভেঙে যায়। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় মেরুদণ্ড বা পিঠের আকৃতি সামনের দিকে ঝুঁকে যায় বা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উচ্চতা হ্রাস পায়। এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে।

 

কীভাবে নিরূপণ করা যায়:

 

খুবই সহজ, ব্যথা-বিহীন পরীক্ষার মাধ্যমে অস্টিওপোরোসিস নির্ণয় করা যায়। ডেক্সা বা বোন ডেন্সিওমেট্রির মাধ্যমে রোগীর কোমর, স্পাইনাল কর্ডসহ বিভিন্ন স্থানে হাড়ের ঘনত্ব দেখা হয়। এফআরএএক্স নামে অনলাইনভিত্তিক অ্যাপের সাহায্যে যে কেউ অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি নিরূপণ করতে পারেন। তা ছাড়া কারণ বা ঝুঁকি নির্ধারণের জন্য চিকিৎসক অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারেন।

 

প্রতিরোধের উপায়:

 

সঠিক খাদ্যাভ্যাস: ক্যালসিয়াম-সমৃদ্ধ বিভিন্ন খাবার যেমন দুধ, টক দই, পনির, বাদাম, সবুজ শাকসবজি, পালংশাক, ব্রুকলি, ছোট মাছ বেশি করে খেতে হবে। পাশাপাশি সুষম উৎস থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ ভিটামিন ডি গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি এর পাশাপাশি পর্যাপ্ত প্রোটিন গ্রহণ করতে হবে।

নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম : নিয়মিত হাঁটা, দৌড়ানো, জগিং, সাঁতারসহ শরীরচর্চার অভ্যাস করতে হবে।

ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি : কেউ যদি সুষম উৎস থেকে পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন খেতে না পারেন সে ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করতে হবে।

 

সূর্যের আলো ভিটামিন ডি'র খুব ভালো উৎস। তাই প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ মিনিট গায়ে রোদ লাগান। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ সেবন থেকে বিরত থাকুন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিতভাবে প্রয়োজনীয় পরীক্ষাগুলো করে ফেলুন। ধূমপান ও অ্যালকোহল সেবনের অভ্যাস থাকলে তা বর্জন করুন। শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন। বয়স্কদের পড়ে যাওয়া ও হাড় ভেঙে যাওয়া রোধ করতে বাথরুমের মেঝে শুকনো রাখুন ও উজ্জ্বল আলোর ব্যবস্থা রাখুন। বয়স্করা হাঁটার সময় প্রয়োজনে লাঠি ব্যবহার করুন। সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামার সময় রেলিং ব্যবহার করুন। পিচ্ছিল, উঁচু-নিচু স্থান, ভাঙা রাস্তাঘাট চলাচলের জন্য পরিহার করুন।

 

এ রোগের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো কোমরের হাড় ভেঙে যাওয়ার দরুন অনেকেই বহুদিন বিছানায় শুয়ে থাকেন ও নড়াচড়া করতে পারেন না। ফলে দেখা দেয় রক্ত জমাট বাঁধা, পালমোনারি এম্বোলিজম, ফুসফুসের সংক্রমণসহ নানা রকম শারীরিক জটিলতা। যার থেকে রোগীর মৃত্যুও হতে পারে।

 

অস্টিওপোরোসিসে একবার আক্রান্ত হলে তা কখনোই পুরোপুরি নিরাময় করা যায় না। তবে যথাযথ ওষুধ সেবন, নিয়মিত ব্যায়াম, ভিটামিন ডি ও ক্যালসিয়াম সেবনের মাধ্যমে হাড়ের ঘনত্ব বাড়ানো যায়, যা রোগের জটিলতা থেকে রোগীকে রক্ষা করে। তাই অস্টিওপোরোসিস সম্পর্কে আমাদের সবার সচেতন হওয়া প্রয়োজন।