Skip to content

২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | শনিবার | ৯ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

শেষ সময়ের গল্প

আমি রিজান কোরেশী। একটা বড় বাংলোর ছাদে বসে শীতের সকালে রোদ পোহাচ্ছি। বয়স অনেক হয়ে গেছে দেখতে দেখতে। এখন লাঠি লাগে চলতে, চশমা লাগে দেখতে। ছেলের সাথে থাকি, আর একটা মেয়ে আছে, তার স্বামীর সাথে থাকে। স্ত্রী মারা গেছে ৬ বছর হবে সামনের মাসের ২৩ তারিখে। জীবন প্রচণ্ড নিঃসঙ্গ হয়ে যাচ্ছে দিন। ছেলেটার কাজের খুব চাপ, সাথে বসে দুদণ্ড কথা বলবে, সুযোগ নেই। বাসায় আসলেই ক্লান্ত শরীর নিয়ে বিশ্রাম করে৷ আমার কোন প্রয়োজনে কমতি রাখে না সে, আল্লাহর কাছে অজস্র শুকরিয়া এত ভালো সন্তান দেওয়ার জন্য কিন্তু আমার নিঃসঙ্গতাটা পূরণে সে কিই বা করতে পারে। 

 

আজ ফোনের গ্যালারি তে গেলাম অনেকদিন পর। বয়স হয়ে গেছে, স্মার্ট ফোন এখন আর জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসের কাতারে নেই। আমার কৈশোরের ছবি গুলো খুব দেখতে ইচ্ছে হচ্ছিল আজ। আঙ্গুল টেনে চলে গেলাম সেই ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে। ক্লাস এইটের জেএসসি দেওয়ার পর বাবা কিনে দিয়েছিল, খুলে ছিলাম ফেসবুক, মেইল, হোয়াটসঅ্যাপ ইত্যাদি। সেই থেকে ছবিগুলো এখনো রয়ে গেছে মেইল এ। ছবিগুলো কতরকমের অনুভূতিতে যে ভরা! একটা ছবি আমার নজর কেড়ে নিল। আমার কৈশোরকালের সবচেয়ে ক্লোজ ফ্রেন্ডদের সাথে ছিল ছবিটি। ওদের কারো বাসার ছাদে তোলা পিক। আমি সেল্ফিটি তুলছি, পেছনে প্রত্যেক বান্দরদের আলাদা আলাদা পোজ, তাদের মধ্যে থেকে একজন আমার কান টেনে ধরেছে। 

 

সোহাগ! ওই হারামিটার নাম সোহাগ। ও আমার কোন একসময়ের বেস্ট ফ্রেন্ড। ওর সাথে যে কত স্মৃতি আছে। কিশোর বয়সটা ওই কেড়ে নিয়েছে। আধাপাগলা ছিল শালায়। গ্যালারিতে সোহাগ নামের ফোল্ডারটায় চলে গেলাম৷ প্রায় ২১০০ ছবি আছে। ওর সাথে পরিচয় হয়েছিল ক্লাস এইটে, স্কুলে। কিন্তু আমরা ফ্রেন্ড ছিলাম না। শুধুই পরিচিত। তারপর জেএসসির পর যখন গ্রামে বেড়াতে যাই তখন সেখানে আমি ওকে আবিষ্কার করি। আমি গ্রামে খুব একটা যেতাম না আর সোহাগও গ্রামের বাড়িতে এসেছিল ৬ বছর পর। ওখানে আমার কোন বন্ধু না থাকায় একই স্কুলের একটা ক্লাসমেট পাওয়া অনেক আনন্দের ছিল। কারো সাথে বন্ধুত্ব হওয়ার প্রথম শর্ত, 'দুজনের মধ্যে কোন কিছুর সাদৃশ্যতা আবিষ্কার করা'। আমাদের ক্ষেত্রে তা গ্রামের বাড়ি দিয়ে শুরু হয়। গ্রামের বাড়িতে আমি প্রায় ২১ দিন ছিলাম। আর তাতেই আমার ওর সাথে খুব ক্লোজ ফ্রেন্ডশিপ হয়ে গেল। এই কয়দিনে একসাথে ফুটবল খেলা, রাতে ব্যাডমিন্টন, নদীতে গোসল, একসাথে মসজিদে যাওয়া ইত্যাদি ঘটতে থাকে আমাদের মধ্যে। অনেক বিষয়েই নিজেদের মধ্যে মিল পাই, অনেক কিছুই আমাদের মধ্যে শেয়ার করা হতে থাকে। তারপর আমি চলে আসি আবার ঢাকাতে। আসার পর শুরুর কিছুদিন খুব মন খারাপ থাকতো। সময় কাটতো না। 

 

তারপর দেখি সোহাগরাও চলে এসেছে। ওর নাকি গ্রামে ভালো লাগছিল না আমাকে ছাড়া। তারপর থেকে ঢাকাতেও একসাথে ঘুরে বেড়ানো শুরু হল আমাদের। একের পর এক ছবি দেখতে লাগলাম। আবারো আটকে গেলাম একটি ছবিতে। আমাদের কোচিং এর সামনে, আমি আর সোহাগ। আমাদের কোচিং এর দিনগুলো! আহ সেই সময় কিছুতেই আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব না। চোখ ভিজে আমার ঢিলেঢালা কুঁচকানো চামড়া বেয়ে পড়ছে। জানি না স্মৃতি মানুষকে এতটা আবেগী কিভাবে করে ফেলে। ক্লাস নাইন-টেন সব ছেলেদের জীবনেই আমূল পরিবর্তন এনে দেয়। এই দুই বছর আমরা হাইস্কুল জীবনকে পুরোদমে আস্বাদন করি। একসাথে স্কুলে কোচিং এ সোহাগসহ অনেক বন্ধুদের সাথে আড্ডা হতো। একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল। সোহাগ ছিল প্রেমিক পুরুষ। কোচিং এর একটা মেয়েকে ওর প্রচণ্ড ভালো লেগে গিয়েছিল। নাইন-টেনে ছেলে মেয়ে আলাদা পড়াতো। ছুটির সময় দেখেছিল পাগলায়। মেয়েটার নাম ছিল অনিতা। সোহাগ প্রায় ১ মাস যাবৎ মেয়েটাকে পছন্দ করার পর ওর সাথে কথা বলতে চেয়েছিল। কিন্তু ও খুব ভীতু ছিল। আর আমাদের গ্রুপে এসব বিষয়ে আমি ছিলাম খুব সাহসী। ওকে আমরা সবাই মিলে খুব জোরাজোরি করার পরও বান্দায় গিয়ে কথা বলতে পারে না পরে আমি ওকে বলি,"দেখ কাকা শিখ আমার কাছ থেইক্কা" বলে একটানে অনিতার কাছে গিয়ে কথা বলতে থাকি। মেয়েটা ঠিক মতো কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমি কথা শেষ করে চলে আসি, এবং তারপর একপর্যায়ে মেয়েটা আমাকে পছন্দ করে ফেলে এবং নাইনের বছর প্রায় ৫ মাস ওর সাথে আমার প্রেম চলেছিল। বেচারা সোহাগ! ওর জীবনের প্রথম ভালোলাগাটা আমার ভালোবাসা হয়ে গিয়েছিল। হাসি পাচ্ছে!

 

ফোল্ডারের ছবিগুলাতে চোখ বুলিয়ে এগুতে থাকি। ২০১৯ সালের ১২ ডিসেম্বরের এক ছবিতে আমি সোহাগ আর সোহাগের হাত ধরে একটা মেয়ের দাঁড়িয়ে থাকার ছবি পেলাম। এটা তো মনিরা। ওর প্রথম প্রেম। তখন অবশ্য আমার অনিতার সাথে প্রেম ছিল না, আমি বাদ দিয়ে দিয়েছিলাম। মনিরা মেয়েটা খুব ভালো ছিল। সোহাগের সাথে ওর দারুণ একটা বোঝাপড়া হয়ে গিয়েছিল। এবং মনিরার সাথেই সোহাগের বিয়ে হয়েছে। প্রথম প্রেমকে বউ বানানোর মত ভাগ্য কম মানুষেরই হয়, আমার বন্ধু তাদের একজন। মনিরার জন্য আমাদের বন্ধুত্বে একটুও সমস্যা বা দূরত্বের সৃষ্টি হয় নি। বরং ও যতদিন মনিরার সাথে দেখা করতে যেত আমাকে পাহারাদার রেখে যেত। এই কাজটা একটা ছেলের লাইফে করা সবচেয়ে বিরক্তিকর কাজ। ভালোবাসা বন্ধুর, দেখা করবে বন্ধু, আনন্দ পাবে বন্ধু অথচ আমাদের এতিমের মত রাস্তায় রেখে চলে যেত। একবার ধরা খেয়েই ফেলেছিল প্রায়, আমি না থাকলে সেদিন কি যে হতো। দুইজনে সেদিন সে কি দৌড়! 

 

তারপর ক্লাস টেন গেল আমাদের দারুণ ভাবে। ওর কাছে আমি দুমাস টিউশন পড়েছিলাম কারণ, নাইনে আমার পড়ায় অনেক গ্যাপ হয়ে গিয়েছিল অমনোযোগী ছাত্র ছিলাম যে। ওকে মাসে ৫০০ করে দেওয়ার কথা ছিল। এখনো সেই ১ হাজার টাকা আমার আর দেওয়া হয় নি। বন্ধুত্ব এমনই। ক্লাস নাইনের শেষে আমার ফারিহা নামে এক মেয়ের সাথে আবার প্রেম শুরু হয়। সেই প্রেম টেনের জুনে শেষ হয়, কিন্তু এবার আমার খুব কষ্ট লেগেছিল। আমার ফারিহাকে খুব ভালো লেগেছিল। ওই বয়সে তো ভেতর থেকে ভালোবাসা আসে না কিন্তু তবুও ফারিহাকে একটু হলেও ভালবাসতাম। এরপর যখনই সোহাগ মনিরার সাথে দেখা করতে যেত, আমার পাহারা দেওয়ার সময় খুব কষ্ট লাগতো। ও কিছুদিন বিষয়টা লক্ষ করে একদিন বলেছিল, "আরে শালা বাদ দে ফারিহা, তোর জন্যে ফারিন আইনা দিবনি" তখনকার এক জনপ্রিয় অভিনেত্রী ছিল তাসনিয়া ফারিন। ওর কথাটা আমার খুব ভালো লেগেছিল। ও এখন পর্যন্ত আমার জন্য কোন গার্লফ্রেন্ড জোগাড় করে দিতে পারে নি, আর পারবেও না। এখন আর সম্ভব না তবে ওর কথাটা এখনো মূল্য রাখে। 

 

আরেকটা ছবি আমাকে থামিয়ে দিল। আমার ক্লাস এইটের বৃত্তির টাকার কিছু অংশ দিয়ে ওকে 'ওপ্পো এ থ্রি এস' ফোনটা কিনে দিয়েছিলাম। পোলায় কি যে খুশি হয়েছিল। তারপর আমার আর ওর কলেজ আলাদা হয়ে গেল। ও অনেক ভালো এক কলেজে চান্স পেয়ে গেল। ও আমার সাথে এক কলেজে পড়তে চেয়েছিল। কিন্তু আমিই ওকে জোর করে ওর ভালোর জন্য অন্য কলেজেই পড়তে বলি। কলেজের কাছাকাছি বাসা নিয়ে নিল ওরা। আমাদের প্রতিদিন কথাটা ঠিকই হতো, প্রায়ই দেখা করতাম কিন্তু আগের মতো প্রতিটা দিন প্রতিটা বিকাল যে একসাথে কাটানো সেটা বন্ধ হয়ে গেল। পড়াশোনার চাপও বাড়তে লাগলো। আমি সবসময়ই ওর চেয়ে একটু দুর্বল ছাত্র ছিলাম তাই ভয় হতো ও যদি ভালো ভার্সিটিতে চান্স পায় আর আমি যদি না পাই! ও বুয়েটের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল, কিন্তু আমি গণিতে ছিলাম দুর্বল। তাই খুব জোরেসোরেই পড়তে লাগলাম। তারপর ওর চান্স আসলো বুয়েটে কিন্তু আমার আসলো না। আমার আসল মেডিক্যাল এ। বগুড়া মেডিক্যাল কলেজে পড়তে লাগলাম। 

 

ভাগ হয়ে গেল জীবন। দূরত্বও অনেক বেড়ে যাচ্ছিল। কিন্তু যখনই সুযোগ পেতাম দেখা করতাম, আর কথা তো হতোই। কিন্তু জীবনের ব্যস্ততা বড় ভয়ঙ্কর জিনিস। কখন যে জীবনের সেই দিনগুলো আমরা দুজন দুজনকে ভুলে কাটিয়ে দিতে লাগলাম জানি না। তবে সত্য তো এটাই আমাদের বন্ধুত্ব অনেকটাই হুমকির মুখে চলে গিয়েছিল। তারপরও আমরা ক্লোজই ছিলাম। তারপর একদিন শুনলাম সোহাগ বিয়ে করতেছে, মনিরার সাথে। খুব খুশি লাগলো আমার। ধুমধাম করে বিয়ে করল পাগলাটায়। বিয়ের পরে জীবনের সবকিছু ঠিক থাকলেও বন্ধুত্ব কখনোই ঠিক থাকে না৷ এটাই প্রকৃতির নিয়ম, এটাই বাস্তবতা। দূরত্ব আরো বেড়ে গেল। 

 

তারপর একদিন আমাকে ছেড়ে নিউইয়র্ক চলে গেল। ওর সাথে শেষ দেখা হয়েছিল ২২ বছর আগে। ৬ বছর আগে দেশে এসেছিল পাগলাটায় কিন্তু আমি হজ্বে গিয়েছিলাম। অনেক মিস করি ওকে। জীবনের অর্ধেক ওর সাথেই চলে গেছে। হয়ত মরার আগে আর দেখা হবে না, আর গলায় ধরে হাটা হবে না, আর মেয়েদের পেছনে ঘোরা হবে না, আর একসাথে সেম কাপড় কেনা হবে না, ওর জন্য আমার আর কখনো মার খেতে হবে না, আর ফুটবল খেলা হবে না। জীবনটা পার করে চলেই এসেছি। হারামিটা যদি আজও পাশে থাকতো! প্রযুক্তির এত ব্যবহার থাকা স্বত্বেও এখন আর ভিডিও কলে কথা হয় না। আমরা নিজেদের জীবনে সবাই মৃতের মতো ব্যস্ত, শুধু স্মৃতি গুলো আজীবন জীবন্ত।