Skip to content

৩০শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | শুক্রবার | ১৫ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

রক্তচূর্ণ

রাজধানীতে পানির বিপুল সমস্যা হয় এই গ্রীষ্মকালে। সারা শীতে বৃষ্টি নাই আবার ওইদিকে এতো তাপ পানি যায় নীচে নেমে আর ওয়াসার লাইনের তো খবরই থাকে না…লিপি ভাবছিল! ইশশ এই দেশেই এমন থাকা যায় না আর মরুর দেশে না জানি  কি  ঘটে। তার বাবা তো প্রায় ১১ বছর হল আছে মরুর এক দেশে জর্ডানে। লিপির এইচএসসি পাস পর্যন্ত মা আর ছোট বোনটা এক সাথেই ছিল। বাবার একটা স্ট্রোক হল, আবার আসতেও পারছে না বিদেশ থেকে তাই মা বোনটাকে নিয়ে বাবার কাছে চলে গেলো। লিপির জন্য অবশ্য ভাল রকমের থাকবার ব্যবস্থা করে গিয়েছে। ওর বড় চাচার বাসাতেই থাকছে ঢাকাতে দারুণ এই পরিবারটা। চাচাতো ভাই একটা তার বউ আর ছেলে আছে পিচ্চি! এতো আদুরে, খুব লিপির ন্যাওটা! আর বড় দুবোন আছে, তাদের বিয়ে হয়ে অন্য জায়গাতে থাকে। বড় চাচা, চাচী, ভাই আর ভাবীর আদরে সাংঘাতিক ভালই দিন কাটে লিপির। লিপিকে বিদেশ না নেবার কারণটা হল, বাবা মা চান ও বাংলাদেশেই স্নাতকটা পড়ুক। এরপর বিয়েশাদী হয়ে যেখানে হোক যাবে। এই পর্যায়ে আসলে বিদেশ গেলে পড়ার ক্ষতিই হতে পারে। দেশি পড়ালেখার সাথে সেই দেশের পড়ালেখার নাকি বেশ পার্থক্য! শুরুটা আবার কঠিন হবে। মাত্র  তো চার বছর এসে গিয়ে মিলেঝিলে দেখতে দেখতেই পার হবে। সে অনার্স পড়ছে  রসায়নে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছাত্রী হিসেবে বেশ তুখোড়ই বলা চলে।

বাসায় পানি নাই গত আটদিন! ওয়াসার গাড়ি থেকে কিনে চলতে হচ্ছে। ভাইয়া অফিস থেকে ফিরবার সময় পানি আনে কিনে খাবারটুকু! রান্না কাপড় গোসল সম্ভব না। খাবারও কিনে খেতে হচ্ছে। মহা যন্ত্রণা লাগছে। লিপি একবার ভাবলও ভাইয়া ভাবীকে বলে যে, ও কিছুদিন ওর বান্ধবীর কাছে হোস্টেলে থাকবে। পরে আর বলে নি। এটা স্বার্থপরের মতো দেখায়। সবার এতো কষ্ট হচ্ছে আর ও সবাইকে ফেলে এই দুর্দিনে কিভাবে যায়। তবে এর ভিতর চাচা চাচীর জমিজমার কাজে দেশে গিয়েছেন আর আজ সকালে অফিস যাবার পথে ভাবী আর বাবুকে ভাইয়া ভাবীর বাবার বাসায় দিয়ে গিয়েছে। বেচারার শরীর খুব খারাপ তার উপর ছোট বাবু আবার প্রেগন্যান্ট! তাই বাবার বাসাতে একটু আরাম করতে গিয়েছে। লিপিও ঘরে ফিরল তখন মাগরিবের আযান প্রায় দেয় দেয়। ঢুকেই কেমন ফাঁকা লাগছিলো বাসাটাকে। কেউ নেই আবার পুরো বাসাটা আঁধার হয়ে আছে। ও লাইট দিলো। সকালে বালতিতে তোলা যে পানিটুকু ছিল, সেটা দিয়ে হাত মুখ ধুয়ে নিলো। আবার কিছু পানি বাঁচিয়ে রাখল ভাইয়ার ব্যবহারের জন্য। ফ্রিজে দেখে নিলো কিছু খাবারদাবার আছে কিনা! বাসি ভাত আর তরকারি ছিল। এক থালাতে সব নিয়ে ওভেনে গরম করে খেয়েই ভাইয়াকে ফোন দিলো..

-হ্যালো
-ভাইয়া আসার সময় খাবার এনো! তোমার খাবার কিন্তু কিছু নেই..
– বেশ রে! তুই ভয় পাচ্ছিস? একা
-না ভাইয়া কি যে বলো। চারিদিকের আওয়াজেই বাঁচি না!
-এই তো আমি এসে পড়বো! ভাবিস না
-আচ্ছা আসো ধীরে সুস্থে! রাখলাম
-ওকে!
 যদিও ফোনে কথোপকথন হল রাত প্রায় ৮টায় আলীমের বাসায় ফিরতে হল ১১টা। কাজ শেষ করে খাবার নিয়ে জ্যাম ঠেলে আসতেই রাত পোহায়! আলীমের কাছে লকের চাবি থাকে নিঃশব্দেই ঢুকেছে সে। খেয়াল করেনি লিপি। মন দিয়ে টিভি দেখছিল চাচা চাচীর ঘরে। ঘরে ঢুকেই আলীম বলল,
-কি রে?
-ওহ ভাইয়া এসেছ?
-হ্যাঁ যা দেখ চাইনিজ এনেছি। এদের বললাম বুঝলি দিতে ওয়ান ইস্টু টু করে সব আইটেম। বলে স্যার সব ওয়ান ইস্টু থ্রি! চল পেট ভরে খাই দুজন….
শার্টের ইন খুলতে খুলতে কথাগুলো বলছিল আলীম। হাসতে হাসতে লিপি বলল,
-আহা রে ভাইয়া আমি তো বলেছি তোমার খাবার আনতে। আমি তো রাতে খেয়েছি। আচ্ছা আমি সব গুছাই, তুমি ফ্রেশ হয়ে আসো। পানি তোলা আছে।
-আচ্ছা!
 খাবার গুছিয়ে এসে লিপি ওর ঘরে কম্পিউটারে বসলো। কিছু এসাইনমেন্টের কাজ আছে। এগুলো করে ফেলা দরকার। ভাইয়া খেলে পরে সব গুছিয়ে রাখবে। একটু পরই আলীম ঘরে এলো।
-কি ব্যাপার ভাইয়া খেয়েছ?
– না রে খাবো! তোর ঘরে এতো মশা কেন?
-আর বলো না ভাইয়া। সারা দুনিয়ার মশা ঘর জুড়ে। ইলেকট্রিক কয়েল জ্বলছে দেখো এদের কোনই বিকার নেই।
-হুম! আরে গাধী জানালাগুলো খোলা রেখেছিস কেন? লাগা সব! বলতে বলতে আলীম নিজেই সব লাগাতে লাগলো আর বলছিল,
-শোন ওইসবে কিছু হবে না। সোজা কয়েল ধরাবি সন্ধ্যেতে। সব দরজা জানালা আটকে। একদম ধোয়া ধোয়া হলে সব খুলে ফ্যান জোরে ছেড়ে দিবি! দেখবি খানিক বাদে মশা আল গায়েব!

হঠাৎই খুব লিপির খুব কাছে ঘেঁষে দাঁড়ালো আলীম। ওর কাঁধে হাত রাখল। লিপি তাকালো না বা কম্পিউটারে টাইপটাও অফ করলো না। কেমন জানি অস্বস্তি হচ্ছে। আলীম ডান হাতে মাউস নিয়ে কার্সর নাড়াচাড়া করছে অযথাই। সেও কিছু বলছে না। তবে বাম হাতটা লিপির কাঁধ গলা ছুঁয়ে চলেছে একটু দ্রুতই হচ্ছে গতিটা!

 

লিপি উঠতে চাইলো। দুহাতে ধরে ফেললো আলীম!
-বসো!

চমকে গেলো লিপি! জ্ঞান হবার পর থেকে বড় ভাইয়াকে সে তুমি বলতে শোনে নি! আর তার এই চাচাতো ভাইটা অনেক বড় তার থেকে অনেক স্নেহ করে, সেই ছোটকাল থেকেই। তার আচরণটা অবাক লাগছে ওর।
হঠাৎ আলীম কম্পিউটারে একটা বাজে সাইটে ঢুকে নোংরা ভিডিও ছেড়ে দিলো। এরপর ওর মুখটা ঠিক লিপির কানের কাছে। লিপির ঠেলে বমি আসছিলো। ও সরতে চাইলো কিন্তু পারলো না। আলীমের হাত ততক্ষণে লিপির বুকে চুরমার নৃত্য এ মেতেছে। ওড়না উড়ে দিয়েছে। জামাও খানিক ছিঁড়েছে ধস্তাধস্তিতে। আলীম টেনে হিঁচড়ে ওকে বিছানাতে নিতে চাইলো সেটা না পেরে লিপিকে লাথি দিয়ে মাটিতেই ফেলে দিয়ে হিংস্র সিংহের মতো ঝাঁপিয়ে পড়লো, নিষ্পাপ নরম শরীরটাকে কুড়বার জন্য। ঘন্টা খানিক তান্ডবলীলা চলল।
চিৎকার কান্না মাফ চাওয়া লিপির কোন কিছুতেই আর আলীমের মন গলল না! শুধু কটা নোংরা কথা আলীমের মুখে লিপি শুনছিল…
-কুত্তার বাচ্চা তরে করতে কি সুখ আহা কি সুখ! কতদিন খালি দেখছি! চোখ দিয়ে করছি! আজ শরীর দিয়া…ইশশশ কি শান্তি, কি সুখ….

একটা অবলা মেয়ে পশুর আঁচড়ে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে…বিনয়ের সাথে ভাইয়া ভাইয়া বলে ছাড় চাচ্ছে কোনো মাফ নেই তার। সব কিছুরই শেষ আছে তাই এই পাপলীলার ও শেষ হল। রক্তাক্ত লিপির আর উঠে বসার ক্ষমতা ছিল না! আলীম ওয়াশরুমে চলে গেলো। ফিরে এসে বলল..
-এটা খালি তোর আর আমার ব্যাপার! বুঝে নিস! ওকে?
লিপি চুপ করে রইলো। কি করবে সে। শরীর মন কিছুই কাজ করছে না তার। শুধু অস্ফুট ভাবে বলল,
-সব বলবো আমি সব বলবো!
মাথায় রক্তের ছলকানি দিলো আলীমের। ঘর থেকে ছুটে বের হয়ে সে রান্নাঘরে শিল খুঁজতে শুরু করে। পেয়েও গেলো। এনেই লিপির মাথায় সজোরে আঘাত করে বসলো। সাথে সাথে লিপি নামের লাশটা অজ্ঞান হয়ে পড়ে রইলো যদিও জানটা তার তখনো ছিল। এরপর আলীম মিষ্টির প্লাস্টিকের দড়ি এনে লিপির গলায় পেঁচিয়ে ফেললো! এরপর সত্যিকারেই লাশ হয়ে গেলো মেয়েটি চিরতরে!

আলীম এই লাশ নিয়ে ভাবনায় পড়লো! রাত প্রায় তিনটা করবেটা কি সে…কোথাও নিয়ে বের হওয়া যাবে না রাতে বিপদ! চালের বস্তাগুলো থেকে দুটো বস্তা নিয়ে লিপির লাশটা ঢুকিয়ে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেললো মুখটা। এরপর ওয়াশরুমে রেখে বস্তাটা…হাতমুখ ধুয়ে আরাম করে লিপির গুছানো চাইনিজটা একাই গোগ্রাসে খেলো। সারাটা রাত তার বেদম চিন্তায় কাটল। ঠিক করলো কাল আর অফিস যাবে না। বাবা মাও কাল আসবার কথা তার আগেই লাশ গায়েব করা দরকার। সাতপাঁচ চিন্তায় ভোরের  দিকে বারান্দায় বসেই ঘুম ঘুম আসলো। আযানের শব্দে জেগে তাড়াতাড়ি লিপির ঘর গুছিয়ে নিলো। রক্ত যা ছিল মুছে ফেললো। লিপির মোবাইল অফ করে নিজের কাছে রাখল। এরপর সকালে অপেক্ষা করতে লাগলো। আজব ব্যাপার বাসার সামনে একটা সিএনজি প্রায় সকাল ৬টায় এসে দাঁড়িয়েছে। দরজা খুলে আলীম দেখে বাবা মা! তারা ঢুকেই জিজ্ঞেস করলো

-লিপি ঘুমায়?
-না বাবা ও তো বাসায় নেই!
-কি বলোস কই?
-ও তো কাল হোস্টেলে ওর বান্ধুবির কাছে গিয়ে থেকে গিয়েছে!
-কি বলোস? রাত ৯টায় ও তো কথা হল বলল বাসায়!
 আলীম অস্বস্তিবোধ করছে কি দিয়ে কি ঢাকবে!
 পরে বলে,
-আরে আমি এসেই ওকে দিয়ে আসলাম! একা আছে ভাল লাগছে না বলল। পরে ফোন দিলো ওর বান্ধুবিকে আমি গিয়ে দিয়ে আসলাম!
-ওহো ভাল করেছিস! আজ অফিস থেকে ফিরার সময় না হয় নিয়ে আসিস…কতদিন দেখি না মেয়েটাকে। আবার অন্য কোথাও নিরাপদ ও লাগে না। বাবা মা এদেশে নাই। আমরাই তো জিম্মাদার বল!
-হুম!
 সকাল প্রায় ১০টার দিকে আলীম লিপির লাশের বস্তাটা টেনে দু'তালা থেকে নিচে নামাবার সময় ওর মা দেখে ফেললো!
-কি রে?
-বাবা! পুরান কাপড় আর ভাঙ্গারি জিনিসপাতি! ঘর এতো জঞ্জাল! ফেলতে যাই!
-আরে তোর অফিস নাই? বাদ দে! বুয়া আসলে আমিই ফেলে দিবোনে। তুই রেডি হ।
-মা জ্বর জ্বর লাগছে আজ অফিসে দেরি করে যাবো! আমি এটা ফেলে আসি!

হুড়াহুড়ি করে আলীম বস্তাটা নিয়ে একটা রিক্সা ডেকে রেললাইন এর কাছাকাছি চলে যায়। সেখানের এক ময়লার ডিপোতে লিপিকে ফেলে এসে পড়ে বাসায়..
এরপর সবই ঠিক চলছিলো….কিন্তু লিপিকে পাওয়া যাচ্ছে না! লিপির সেই বান্ধুবি বলেছে তার কাছে লিপি যায় নি! আলীম বলছে হোস্টেলের সামনেই লিপিকে রেখে গিয়েছিলো। আলীম আর তার বাবা একটা মামলাও ঠুকেছে! লিপির বাবা মা এসেছেন ঢাকাতে। তবে ইতিমধ্যে লিপির লাশ পাওয়া গিয়েছে। তার জানাজা কবর হয়েছে যার সবটাতেই আলীম লক্ষণীয় ভাবে উপস্থিত থেকেছে আর তুলকালাম কান্নাকাটিও করেছে।

তবে অবশেষে মানুষই পশু আর পশুই তো মানুষ! বিবেকটা এমন ভাবে উল্টো কাজ করে যে, আজীবন পশুত্বের আত্মা বহন হয় তো আর অমানুষদের জন্য বিরাট অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। সেই অভিশপ্ত জীবন থেকে মুক্তির জন্য হাঁসফাঁস করে…আর সবটাই দোষ স্বীকার করে নেয়! মান সম্মান সব ভুলে শুধু বাঁচতে চায়! হোক সেটা ফাঁসের দড়িতে ঝুলেই বাঁচা! আলীমও স্বীকার করলো পরিবার আর আইনের কাছে কিন্তু তাতে লাভ কি! সেই নিষ্পাপ অবলা মেয়েটি কি আর ফিরবে…