Skip to content

২৭শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | মঙ্গলবার | ১২ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

বিশ্বব্যাপী হঠাৎ ধ্বস নেমেছে নারী শিক্ষায়

করোনা ভাইরাসের বিস্তার শুরু হয়েছিল চলতি বছরের শুরুতে। তবে বিশ্বব্যাপী এ ভাইরাস আতঙ্কের হয়ে উঠে ফেব্রুয়ারীর শেষ এবং মার্চের শুরুতে। তখন থেকেই পুরো সময় পার করছে অন্যরকম। বিশ্বব্যাপি  লকডাউন, কোয়ারেন্টাইন ও এ সংক্রান্ত আরো কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ ঝুঁকি এবং হুমকির মুখে ফেলে দেয় অনেক কিছুকে। তার মধ্যে নারী শিক্ষা একটি। এ মহামারীতে বিশ্বব্যাপী হঠাৎ ধ্বস দেখা যাচ্ছে নারী শিক্ষায়। এ মহামারী সম্পূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থাকে বিশেষ করে নারী শিক্ষাব্যবস্থাকে অনেকটা হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে।

 

চলতি বছর জাতিসংঘের সহযোগী সংগঠন ইউনেস্কো নারী শিক্ষা বিষয়ে একটি জরিপ পরিচালনা করে। জরিপ অনুযায়ী, ২০২০ সালের মার্চ মাসের শেষ দিকে প্রায় ৭৪৩ মিলিয়ন (৭৪ কোটি ২০ লাখ) ছেলেমেয়ে লকডাউনের জন্য স্কুলে যেতে পারেনি।  শুধু মহামারীর এ সময়েই নয় এরমধ্যে স্বল্প উন্নত দেশগুলোতে  বসবাসকারী ১১ কোটি ১০ লাখ শিক্ষার্থীর স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেও স্কুলে যাওয়া ছিলো বড় একটি চ্যালেঞ্জের ব্যাপার। মালি, নাইজার এবং দক্ষিন সুদানে স্কুল বন্ধ থাকায় ৪০ লাখের বেশি মেয়ের পড়াশোনা পুরোপুরিভাবে বন্ধ  হয়ে গিয়েছে ।

 

প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ মেয়ে ২০২০ সালে  প্রাথমিক পর্যায় থেকে উচ্চপর্যায়ে না পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এমনকি  করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের আগেও দুর্বল দেশগুলোতে প্রায় ১৩ কোটি মেয়ে শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

 

দেশ ভেদে মেয়ে শিশুর ঝরে পড়ার হার

সম্প্রতি সেভ দ্যা চিলড্রেনের একটি সূচকে বলা হয়, অনেক মধ্য ও স্বল্প আয়ের দেশগুলোতে করোনার কারনে স্কুল বন্ধ হওয়ার পর অনেক শিশুর স্কুলে পুনরায় না ফেরার প্রবনতা লক্ষ্য করা  গেছে।  সুচকটি স্কুল ছাড়ার হার, লিঙ্গ এবং আয় এর বৈষম্য তুলে ধরে। 

 

সূচকটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় নাইজার, মালি, চাদ, লাইবেরিয়া, আফগানিস্তান, গিনি, মৌরিতানিয়া, ইয়েমেন, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, সেনেগাল এবং আইভরি কোস্ট  এই ১২ দেশের স্কুল ছেড়ে যাওয়ার হারের দিক থেকে অধিক ঝুঁকিতে রয়েছে। 

 

নাইজারে স্কুল ছেড়ে যাওয়ার হার ৬৩ শতাংশ। এদের মধ্যে দারিদ্র্যতার কারনে ৭৭ শতাংশ এবং যার মধ্যে মেয়ে শিক্ষার্থেই রয়েছে ৬৮ ভাগ। মালি এ হার একটু কমে ৫৩ ভাগ। যাদের মধ্যে আর্থিক অস্বচ্ছলতার দায়ে ৭৮ ভাগ। এদের মধ্যে মেয়ে শিক্ষার্থী স্কুল ছেড়েছে ৫৬ ভাগ।

 

চাদে স্কুল ছেড়েছে ৪৫ ভাগ শিক্ষার্থী।  দারিদ্র্যতা মাথায় নিয়ে ৫৭ ভাগ,যাদের মধ্যে মেয়ে শিক্ষার্থী ৫৫ ভাগ।  লাইবেরিয়ায় মোট স্কুল ছেড়ে যাওয়ার হার ৪২ ভাগ। দারিদ্র্যতার কারনে ৬২ ভাগ, যাদের মধ্যে মেয়ে শিক্ষার্থীর হার ৪৩ ভাগ। 

 

আফগানিস্তানে মোট স্কুল ছেড়েছে ৪২ ভাগ শিক্ষার্থী। এদের মধ্যে ৫৫ ভাগ মেয়ে শিক্ষার্থী এবং ৪৯ ভাগ দারিদ্র্যতার শিকার হয়ে স্কুলে ছেড়েছে।  গিনিতে  স্কুল ছেড়েছে ৪৭ ভাগ, শিক্ষার্থী। যাদের মধ্যে দারিদ্র্যতার দায় কাঁধে নিয়ে ৭৩ ভাগ আর এদের মধ্যে মেয়ের শিক্ষার্থী ৫৫ ভাগ।

 

মৌরিতানিয়ায় স্কুল ছেড়ে যাওয়ার হার ৪৫ শতাংশ। দারিদ্র্যতার কারনে স্কুল ছাড়ে ৬৩ ভাগ শিক্ষার্থী, যাদের ৪৪ ভাগই মেয়ে। ইয়েমেনে স্কুল থেকে ঝরে পড়ে ২৮ ভাগ শিক্ষার্থী৷ এদের মধ্যে দারিদ্র্যতার দায়ে ৪৯ শতাংশ, আর এই ৪৯ শতাংশের ৩৫ ভাগ মেয়ে।

 

আবার নাইজেরিয়া ও পাকিস্তানে স্কুল ছেড়ে যাওয়ার হার একই। যার হার ৩৮ ভাগ। কিন্তু নাইজেরিয়া ও পাকিস্তানে মেয়েদের স্কুল ছেড়ে যাওয়ার হার যথাক্রমে ৪০ ভাগ এবং ৪৪ ভাগ। এদের মধ্যে দারিদ্র্যতার কারনে স্কুল ছেড়ে যাওয়ার হার যথাক্রমে ৭৪ ভাগ ও ৬৬ ভাগ।

 

সেনেগালে স্কুল ছেড়ে যাওয়ার হার ৪৪ শতাংশ, আর দারিদ্র্যতার কারনে ৬৫ ভাগ। এদের মধ্যে মেয়ে শিক্ষার্থী স্কুল ছেড়েছে ৪৪%। আইভরি কোস্টে স্কুল ছেড়ে যাওয়ার হার ৩৩ ভাগ, যার মধ্যে  মেয়ে শিক্ষার্থী ৩৮ ভাগ এবং দারিদ্র্যতার কারনে  ৪৯ ভাগ শিক্ষার্থী স্কুল ছাড়ে। শুধু উল্লেখিত এ কয়েকটি দেশে নয়, আরও ২৮ টি দেশে  এ ঝুঁকি বেশি বা মাঝারি । 

 

পরিস্থিতি পরিবর্তনে সুপারিশ

এমন দুঃসহ পরিস্থিতি থেকে নিজেদের বের করে নিয়ে আসতে সুপারিশ করেছে সেভ দ্য চিলড্রেন। সুপারিশে বলা হয়, ঝরে পড়ার পরিমাণ কমিয়ে আনতে সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে শিক্ষা তহবিল বাড়াতে হবে,  বিশেষ করে মেয়েদের জন্য। কারন পরিবারগুলো ভাবতে শুরু করেছে মেয়েদের শিক্ষার খরচ একটি অপ্রয়োজনীয় খরচ যা  তাদের বহন করা উচিত না। 

 

উন্নত বিশ্বেও বৈষম্য প্রবল হচ্ছে

ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র  শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনলাইনে চালু করার সিদ্ধান্ত নেয় যেখানে স্কুলের চেয়ার টেবিলের ভুমিকা রাখবে ল্যালপটপ, ট্যাব, কম্পিউটার। ভার্চুয়াল শ্রেনীকক্ষ তৈরী হবে ইন্টারনেট এর মাধ্যমে।  এটি একটি অস্থায়ী সমাধান ছিলো যা সবার সমানভাবে সুযোগ না পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি ।  স্বল্প উন্নত দেশগুলোতে ৭০% তরুন ইন্টারনেট ব্যবহারে অক্ষম।  এছাড়াও লিঙ্গভেদে ইন্টারনেট ব্যবহারের একটা ব্যবধানতো রয়েছে।  এমন কিছু প্রান্তিক অঞ্চল রয়েছে যারা ইন্টারনেট এর ব্যাপারে একেবারেই অজ্ঞ। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে শিক্ষা প্রদান করছে। কিন্তু অনলাইন ক্লাসের সে সুবিধা ভোগ করতে পারছেনা অনেক শিক্ষার্থী। তারমধ্যে অনেকটাই পিছিয়ে আছে মেয়েরা।

 

ইউএন ওমেন এর নির্বাহী পরিচালক ফুমজিল মেলাম্বো জানান – ‘মেয়েদের এবং অনেক প্রান্তিক গোষ্ঠীগুলোর প্রযুক্তি ব্যবহার এর সুযোগ তেমন নেই।  বর্তমানে করোনা ভাইরাস মহামারীর কারনে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে।  তাই এই অক্ষমতা দূর করা আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাড়িয়েছে। অনলাইন শিক্ষার সুযোগ না থাকায় মেয়েরা একটি বিপদজনক অবস্থায় রয়েছে।’

 

শরণার্থী শিবির

এছাড়াও শরনার্থী শিবিরে থাকা মেয়েরা রয়েছে আরও ঝুঁকিতে । স্কুল বন্ধের ফলে তাদের উপর বিধ্বংসী প্রভাব পড়ছে।  শরনার্থী মাধ্যমিক স্কুলে পড়া মেয়েদের কেবল মাত্র অর্ধেক সম্ভাবনা রয়েছে পরবর্তী পর্যায়ে উত্তরনের।  স্কুল বন্ধ থাকার কারনে ছেলেমেয়েদের শারীরিক ও যৌন সহিংসতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।  পাশাপাশি অনেক গরীব ঘরের মেয়েদের প্রস্টিটিউশনের খাতায় নাম লেখাতে হচ্ছে পরিবারের আর্থিক অবস্থার জন্য। আবার অনেকেই শিকার হচ্ছেন বাল্যবিবাহের। 

 

বিশ্বজুড়ে এই করোনা মহামারীর জন্য এক বিশাল হুমকির সম্মুখীন হয়েছে নারীদের  শিক্ষাব্যবস্থা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পুনরায় ফিরবে না অনেক মেয়ে।  যা শিক্ষব্যবস্থায় তৈরী করতে পারে  চরম এক বৈষম্য।