‘আমি ছাড়া তাঁকে কেউ নির্দেশ দিতে পারে না’: আলোচনায় সারাহ, যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সিনেটরের স্ত্রী

রাজনীতির মঞ্চে আবদুল আল-সাইদের ঐতিহাসিক সাফল্য যেমন আলোচনার জন্ম দিয়েছে, তেমনি মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রে উঠে এসেছেন তাঁর স্ত্রী সারাহ জুকাকু। দীর্ঘ দুই দশকের দাম্পত্য, পারস্পরিক বিশ্বাস, ভালোবাসা ও একসঙ্গে বেড়ে ওঠার গল্পে গড়ে উঠেছে তাঁদের জীবন।
রাজনীতিতে একজন নেতার সাফল্যের পেছনে অনেক সময় এমন একজন মানুষের অবদান থাকে, যিনি নিজে প্রচারের আলোয় থাকতে চান না। যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান থেকে সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল আল-সাইদের ঐতিহাসিক বিজয়ের গল্পেও রয়েছেন তেমনই একজন—তাঁর স্ত্রী সারাহ জুকাকু। পেশায় চিকিৎসক এই নারী শুধু আবদুলের জীবনসঙ্গী নন, তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত পথচলার অন্যতম নির্ভরতার জায়গা।
২০২৬ সালের ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী ও সাবেক কংগ্রেস সদস্য মাইক রজার্সকে পরাজিত করে আলোচনায় আসেন ৪২ বছর বয়সী আবদুল। তাঁর এই বিজয় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। ২০২৭ সালের ৩ জানুয়ারি শপথ গ্রহণের পর তিনি দেশটির ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হওয়ার কথা। আর এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে স্বামীর পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আলোচনায় এসেছেন সারাহও।
ভালোবাসার গল্প শুরু বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায়
আবদুল ও সারাহ—দুজনেরই জন্ম এবং বেড়ে ওঠা মিশিগানে। তাঁদের পরিচয় ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে পড়াশোনার সময়। দুজনই বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেখান থেকেই পরিচয়, বন্ধুত্ব এবং ধীরে ধীরে ভালো লাগার সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
সারাহ তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। সম্পর্কের শুরুতেই আবদুল তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। ২০০৬ সালের অক্টোবরে দ্য মিশিগান ডেইলিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সেই স্মৃতি তুলে ধরেছিলেন সারাহ। তাঁর স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, আবদুল তাঁকে বলেছিলেন, ‘আমরা এখনো বেড়ে উঠছি, এবার আমরা একসঙ্গে বেড়ে উঠতে পারব।’ বয়সে তরুণ হলেও সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁদের ভাবনা ছিল বেশ পরিণত।
বিয়ের বিষয়ে আবদুলের দৃষ্টিভঙ্গিও ছিল স্পষ্ট। তিনি বলেছিলেন, একজন মানুষের সঙ্গেই পরিচিত হয়ে তাঁকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিতে চান। সেই ভাবনার বাস্তব রূপ পায় ২০০৬ সালের মে মাসে। বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তাঁরা। এরপর শুরু হয় তাঁদের যৌথ জীবনের নতুন অধ্যায়। উচ্চশিক্ষা, পেশাগত প্রতিষ্ঠা, পরিবার গঠন এবং পরবর্তী সময়ে রাজনীতির ব্যস্ততা—প্রতিটি পর্যায়েই একে অপরের সঙ্গী হয়েছেন তাঁরা।
‘আমার জীবনের ভালোবাসা’
নির্বাচনী প্রচারণার শেষ পর্যায়ে ডেট্রয়েটে আয়োজিত এক সমাবেশে স্বামীর প্রতি ভালোবাসা ও আস্থার কথা প্রকাশ্যে তুলে ধরেন সারাহ। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে আবদুলের ব্যক্তিগত চরিত্রের এমন এক দিক, যা রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরেও তাঁকে আলাদা করে চেনায়। সারাহর ভাষায়, আবদুল বাড়িতে যেমন, জনসম্মুখেও ঠিক তেমনই। তিনি যেখানেই থাকুন কিংবা যার সঙ্গেই কথা বলুন, নিজের বিশ্বাস ও বক্তব্যে পরিবর্তন আনেন না। কারণ, তিনি যা বলেন, তা মন থেকেই বিশ্বাস করেন।
তাঁর মতে, এই অকৃত্রিমতাই আবদুলকে অন্য রাজনীতিকদের থেকে আলাদা করেছে। স্বামীর রাজনৈতিক স্বাধীনতা প্রসঙ্গে সারাহর একটি মন্তব্য বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। তিনি বলেন, কোনো করপোরেশন, বিলিয়নিয়ার কিংবা বিশেষ স্বার্থগোষ্ঠী আবদুলকে কী করতে হবে বা কী বলতে হবে, তা নির্দেশ দিতে পারে না। এরপর হাস্যরসের সুরে যোগ করেন, ‘হয়তো কখনো কখনো আমি ছাড়া!’
মজার এই মন্তব্যের মধ্যেও ছিল তাঁদের সম্পর্কের আন্তরিকতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার প্রতিফলন। একই বক্তব্যে সারাহ আবদুলকে অভিহিত করেন তাঁর ‘জীবনের ভালোবাসা’ হিসেবে।
চিকিৎসক সারাহর নিজস্ব পরিচয়
আবদুলের স্ত্রী হিসেবে পরিচিত হলেও সারাহর নিজের জীবন ও পেশাগত অর্জনও যথেষ্ট সমৃদ্ধ। তিনি একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ের পড়াশোনা শেষ করার পর উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভ্যাগেলোস কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনস থেকে ২০১৫ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ডিগ্রি নেন। এরপর কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় ও মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যান আরবার ক্যাম্পাসে মনোরোগবিদ্যায় রেসিডেন্সি সম্পন্ন করেন।
বর্তমানে মিশিগানের অ্যান আরবারে ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী দেখেন তিনি। পাশাপাশি ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান হেলথেও নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করছেন। চিকিৎসা পেশার ব্যস্ততার পাশাপাশি পরিবার ও স্বামীর রাজনৈতিক জীবনেও সময় দিয়ে চলেছেন এই চিকিৎসক।
দক্ষিণ ভারতের শিকড়, মিশিগানে বেড়ে ওঠা
সারাহর পারিবারিক শিকড় ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য কর্ণাটকে। ভারতীয় অভিবাসী পরিবারে জন্ম ও বেড়ে ওঠা তাঁর। পরিবারের আদি নিবাস কর্ণাটকের উত্তর কন্নড় জেলার উপকূলীয় শহর ভাটকাল। শহরটি ম্যাঙ্গালুরু থেকে প্রায় ১৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
সারাহর বাবা ডা. তাইয়েব জুকাকু একজন কিডনি বিশেষজ্ঞ। তাঁর পারিবারিক ইতিহাসেও রয়েছে শিক্ষা, আইন ও রাজনীতির সংযোগ। দাদা জুকাকু শামসুদ্দিন ছিলেন পরিচিত আইনজীবী, শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিক। তিনি একসময় মুখ্যমন্ত্রী বি ডি জাট্টির অধীনে সাবেক মহীশূর রাজ্যের অর্থ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
দুই মেয়েকে নিয়ে তাঁদের ছোট্ট পৃথিবী
দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনে আবদুল ও সারাহর সংসারে এসেছে দুই সন্তান। তাঁদের প্রথম মেয়ে এমালির জন্ম ২০০৬ সালের বিয়ের পর। দ্বিতীয় মেয়ে সেরিনের জন্ম ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে। দুই মেয়েকে নিয়ে বর্তমানে মিশিগানের অ্যান আরবারে বসবাস করছেন তাঁরা।
রাজনৈতিক ব্যস্ততা ও জনসম্মুখের পরিচিতি সত্ত্বেও পরিবারকে ব্যক্তিগত পরিসরে রাখতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন আবদুল ও সারাহ। বিশেষ করে তাঁদের দুই মেয়েকে সাধারণত প্রচারের আলো থেকে দূরে রাখা হয়। তবে ২০২৬ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় কয়েকবার স্বামীর পাশে প্রকাশ্যে উপস্থিত হয়েছেন সারাহ। নির্বাচনী সমাবেশে সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, মিশিগানের মানুষ আবদুলের মতো একজন লড়াকু ও দায়িত্বশীল নেতার যোগ্য। তিনি যেভাবে নিজের স্ত্রী ও পরিবারের পাশে থাকেন, নির্বাচিত হলে একইভাবে মিশিগানের মানুষের পাশেও থাকবেন।
রাজনৈতিক সাফল্যের আড়ালে একসঙ্গে বেড়ে ওঠার গল্প
আবদুল আল-সাইদের রাজনৈতিক পরিচয় এখন আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয়। কিন্তু তাঁর জীবনের গল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জুড়ে রয়েছেন সারাহ। বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুত্ব থেকে দাম্পত্য, ব্যক্তিগত জীবন থেকে রাজনৈতিক পথচলা—দীর্ঘ সময় ধরে তাঁরা একে অপরের পাশে থেকেছেন।
সারাহর বক্তব্যে বারবার ফিরে এসেছে একটি বিষয়—আবদুলের সততা ও বিশ্বাসের প্রতি অবিচল থাকা। তাঁর কাছে স্বামী শুধু একজন রাজনীতিক নন; তিনি সেই মানুষ, যাঁকে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়জীবন থেকে চেনেন, যাঁর সঙ্গে জীবন গড়েছেন এবং যাঁর স্বপ্নের যাত্রায় পাশে থেকেছেন। আবদুলের ঐতিহাসিক বিজয় হয়তো তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন পরিচিতি এনে দিয়েছে। তবে এই সাফল্যের উদ্যাপনে সারাহর উপস্থিতি মনে করিয়ে দেয়, বড় কোনো অর্জনের পেছনে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, পারস্পরিক আস্থা ও দীর্ঘদিনের সহযোগিতার গুরুত্ব কতটা গভীর হতে পারে।
দুজনের জীবনকাহিনি তাই কেবল একজন রাজনীতিক ও তাঁর স্ত্রীর গল্প নয়; এটি একসঙ্গে স্বপ্ন দেখা, প্রতিশ্রুতিতে অটল থাকা এবং সময়ের সঙ্গে হাতে হাত রেখে এগিয়ে যাওয়ার গল্প।



