গা’লিগা’লাজ, ফোন কেড়ে নেওয়া ও ধাক্কাধাক্কি, আলোচনায় পরীমনি: সাংবাদিকের পাল্টা অভিযোগ ‘ফোন কেড়ে নিয়েছিলেন তিনি’

চিত্রনায়িকা পরীমনিকে স্পর্শ করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন দৈনিক সমকালের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার রবিউল হোসাইন। বরং তাঁর দাবি, আদালত প্রাঙ্গণে পরীমনি তাঁর মুঠোফোন কেড়ে নিয়েছিলেন এবং তাঁকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও হত্যার হুমকি দিয়েছিলেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন কয়েকজন সাংবাদিক ও একজন বিচারপ্রার্থী। বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছে ডিজিটাল রিপোর্টার্স ফোরাম।
আদালত প্রাঙ্গণে তারকাদের উপস্থিতি মানেই সাংবাদিকদের বাড়তি ব্যস্ততা। ছবি তোলা, ভিডিও ধারণ এবং প্রয়োজনীয় বক্তব্য সংগ্রহের জন্য সংবাদকর্মীদের ভিড়ও থাকে চোখে পড়ার মতো। তবে গত বৃহস্পতিবার ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে চিত্রনায়িকা পরীমনিকে ঘিরে তৈরি হয় অপ্রীতিকর পরিস্থিতি। সাংবাদিকদের সঙ্গে তাঁর বাগ্বিতণ্ডা, ধাক্কাধাক্কি এবং একাধিক ব্যক্তির আহত হওয়ার ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে বিষয়টি।
ঘটনার পর পরীমনির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের জবাব দিয়েছেন দৈনিক সমকালের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার রবিউল হোসাইন। তাঁর দাবি, তিনি পরীমনিকে স্পর্শ করেননি। বরং পরীমনিই তাঁর মুঠোফোন কেড়ে নিয়েছিলেন। এ ছাড়া তাঁকে গালিগালাজ ও হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগও করেছেন এই সাংবাদিক।
আদালতে কেন গিয়েছিলেন পরীমনি?
ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদের করা একটি মামলায় আত্মসমর্পণ করে জামিন নিতে বৃহস্পতিবার সকালে আদালতে যান পরীমনি। তাঁর উপস্থিতির খবর পেয়ে সেখানে জড়ো হন বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকেরা।
মামলাটি ২০২২ সালের ৬ জুলাই ঢাকার আদালতে করেছিলেন নাসির উদ্দিন মাহমুদ। অভিযোগে তিনি দাবি করেন, ২০২১ সালের ৯ জুন রাতে পরীমনি ও তাঁর সহযোগীরা সাভারের বোট ক্লাবে ভাঙচুর করেন এবং তাঁকে মারধর ও হত্যার হুমকি দেন। অন্যদিকে, ওই ঘটনার পর নাসির উদ্দিনসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে সাভার থানায় মামলা করেছিলেন পরীমনি। সেই মামলায় বর্তমানে সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে। নাসির উদ্দিন জামিনে রয়েছেন।
ক্যামেরা সামনে আসতেই শুরু ধাক্কাধাক্কি
বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে গাড়ি থেকে নেমে এজলাসের দিকে যাচ্ছিলেন পরীমনি। এ সময় তাঁর ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে এগিয়ে যান সাংবাদিকেরা। তখন পরীমনির সঙ্গে থাকা নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে সংবাদকর্মীদের ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে সমকালের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার রবিউল হোসাইনের মুঠোফোন কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে পরীমনির বিরুদ্ধে। রবিউলের দাবি, ভিডিও ধারণের সময় পরীমনি তাঁর ফোন নিয়ে নেন। এ ছাড়া তাঁর ভিডিও ধারণের কাজে ব্যবহৃত ট্রাইপডও পরীমনির সঙ্গে থাকা নিরাপত্তারক্ষীরা ভেঙে ফেলেন। পরে পরীমনির হাত থেকে নিজের ফোনটি ফিরিয়ে নেন বলে জানান রবিউল।
‘গালিগালাজ ও হত্যার হুমকি দিয়েছেন’
প্রথম আলোকে দেওয়া বক্তব্যে রবিউল হোসাইন পরীমনির বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ করেন। তাঁর ভাষ্য, পরীমনি তাঁকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেছেন এবং মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছেন। এসব ঘটনার ভিডিও ফুটেজও রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে, আদালত প্রাঙ্গণে পরীমনি সাংবাদিকদের সামনে রবিউলের বিরুদ্ধে তাঁকে স্পর্শ করার অভিযোগ তুলেছিলেন। পরে তাঁকে উদ্দেশ করে গালিগালাজও করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনার দুই পক্ষের বক্তব্যে তৈরি হয়েছে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। তবে কে কীভাবে পরিস্থিতির সূত্রপাত করেছিলেন, তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
সাংবাদিকদের পাশাপাশি আহত বিচারপ্রার্থীও
আদালত প্রাঙ্গণে ওই দিনের ধাক্কাধাক্কির ঘটনায় শুধু সাংবাদিকেরাই ভোগান্তিতে পড়েননি, আহত হয়েছেন একজন সাধারণ বিচারপ্রার্থীও। সুজন চন্দ্র মণি দাস নামের ওই ব্যক্তির মাথা ফেটে রক্ত বের হয়। তাঁর ভাইয়ের অভিযোগ, পরীমনির নিরাপত্তারক্ষীদের ধাক্কায় তিনি আহত হয়েছেন। এ ছাড়া জাগো নিউজের প্রতিবেদক আশিকুজ্জামান, মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার আব্দুল্লাহ আল কাউছার, আগামীর সময়ের প্রতিবেদক সিয়াম হোসেন এবং টাইমস টুডের শাহ রিয়াজ আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনকে হাসপাতালে চিকিৎসাও নিতে হয়েছে।
সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিবাদ, তদন্তের দাবি
ঘটনাটির প্রতিবাদ জানিয়েছে ডিজিটাল রিপোর্টার্স ফোরাম (ডিআরএফ)। বৃহস্পতিবার পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটি জানায়, আদালত প্রাঙ্গণে পরীমনির বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ, অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে।
পরে তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মীদের বিরুদ্ধেও সাংবাদিক ও সাধারণ বিচারপ্রার্থীদের ওপর হামলা, ধাক্কাধাক্কি ও মারধরের অভিযোগ পাওয়া গেছে। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অন্তত পাঁচ সাংবাদিক আহত ও লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে সংগঠনটি।
ডিআরএফের মতে, আদালতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল স্থানে সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া কিংবা নিরাপত্তাকর্মীদের মাধ্যমে তাঁদের হেনস্তা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একই সঙ্গে একজন সাধারণ বিচারপ্রার্থীর আহত হওয়ার ঘটনাও উদ্বেগজনক।
সংগঠনটি আরও বলেছে, এ ধরনের ঘটনা সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদার পাশাপাশি স্বাধীন সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের দায়িত্ব পালনের পরিবেশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
পরীমনি ও তাঁর নিরাপত্তাকর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে ডিআরএফ।
ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তই এখন গুরুত্বপূর্ণ
একজন জনপ্রিয় অভিনেত্রী এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকদের মধ্যে এমন অপ্রীতিকর পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে অনাকাঙ্ক্ষিত। আদালত প্রাঙ্গণ যেখানে বিচারপ্রার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা, সেখানে এ ধরনের ধাক্কাধাক্কি ও আহত হওয়ার ঘটনা আরও উদ্বেগজনক। পরীমনির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ, সাংবাদিকের পাল্টা বক্তব্য এবং নিরাপত্তারক্ষীদের ভূমিকা—সবকিছুই নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালন এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
আপাতত ঘটনাটি ঘিরে দুই পক্ষের বক্তব্য ও সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিবাদ সামনে এসেছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে প্রয়োজন যথাযথ তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য।



